নেত্রকোনায় মিলনায়তনের অভাবে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ভাটা
· Prothom Alo

একসময় নেত্রকোনার সাংস্কৃতিক অঙ্গন ছিল প্রাণচঞ্চল। নিয়মিত নাটক, গান, নৃত্য, আবৃত্তি ও সাহিত্য আয়োজন হতো। জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মীরা এসব আয়োজনে অংশ নিতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। এখন জেলার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে স্পষ্ট ভাটা পড়েছে।
সংস্কৃতিকর্মীরা বলছেন, এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ নিয়মিত অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য উপযোগী আধুনিক কোনো মিলনায়তনের অভাব। জেলা শিল্পকলা একাডেমিরও নিজস্ব মিলনায়তন নেই। ফলে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর একমাত্র ভরসা শহরের পুরোনো জেলা পাবলিক হল। আধা পাকা ও জরাজীর্ণ এই ভবনে আধুনিক কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই। এর ওপর প্রতিটি অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া গুনতে হয়। এতে সীমিত সামর্থ্যের অনেক সংগঠন নিয়মিত অনুষ্ঠান আয়োজন থেকে সরে আসছে।
Visit casino-promo.biz for more information.
এ বিষয়ে নেত্রকোনা সাহিত্য সমাজের সাধারণ সম্পাদক ও কবি তানভীর জাহান চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘লোকসংস্কৃতির তীর্থভূমি হিসেবে পরিচিত নেত্রকোনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করার মতো একটি আধুনিক অডিটোরিয়াম নেই—এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। জরাজীর্ণ পাবলিক হল থাকলেও ভাড়া বেশি হওয়ায় সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো সেখানে নিয়মিত অনুষ্ঠান করতে পারে না। এতে জেলার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’
শহরের সংস্কৃতিকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাংস্কৃতিক চর্চায় নেত্রকোনার দীর্ঘ ঐতিহ্য আছে। ১৯৩২ সালে শান্তিনিকেতনের বাইরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রথম জন্মদিন উদ্যাপন করা হয় নেত্রকোনায়। আবার ১৯৬৯ সালে ঢাকার বাইরে সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর প্রথম শাখাও গড়ে ওঠে এই জেলায়।
খন্দকার মুশফিকুর রহমান, জেলা প্রশাসক, নেত্রকোনা মোক্তারপাড়ায় জেলা শিল্পকলা একাডেমি-সংলগ্ন জায়গায় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি আধুনিক মিলনায়তন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। জায়গার বিষয়টি সমাধানের কাজ চলছে।বর্তমানে জেলায় নাটক, সংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তির চর্চা এবং প্রশিক্ষণ দেয়—এমন সক্রিয় সংগঠনের সংখ্যা ২০টির বেশি। যাত্রা ও নাট্যচর্চায়ও নেত্রকোনার রয়েছে স্বতন্ত্র পরিচিতি। শহরের রেলক্রসিং এলাকায় প্রিন্সেস বিউটি সাজঘর, আনোয়ারা সাজঘরসহ কয়েকটি অপেরা এখনো যাত্রাচর্চা করছে। নাট্যচর্চা করছে উদীচী, প্রত্যাশা, কচিকাঁচা থিয়েটার, সৎসঙ্গ থিয়েটার, রংধনু ও নবনাট্য পরিষদ। এ ছাড়া উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, হায়দার-শেলী স্মৃতি সংগীত বিদ্যালয়, রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ, ঝংকার, অগ্রান, তৃণযোগ, নেত্রকোনা বাউল সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠন সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি ও সাহিত্যচর্চা করছে। তরুণ শিল্পীদের কয়েকটি ব্যান্ডও আছে। তবে উপযুক্ত মিলনায়তনের অভাবে এসব সংগঠনের নিয়মিত কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
১৪ বছর ধরে নেই মিলনায়তন
শহরের মোক্তারপাড়া এলাকায় জেলা শিল্পকলা একাডেমির পাশে একসময় ছিল ‘মহুয়া অডিটোরিয়াম’। ১৯৭৯ সালে পৌরসভার জায়গায় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এটি নির্মাণ করে। পরে জায়গাটির মালিকানা নিয়ে শিল্পকলা একাডেমি ও পৌরসভার মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে আদালতে মামলাও হয়। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়লে প্রায় ১৫ বছর আগে সেটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। ছয় বছর আগে ভবনটি ভেঙে ফেলে পৌরসভা। এরপর সেখানে আর নতুন কোনো মিলনায়তন নির্মাণ করা হয়নি।
আধুনিক মিলনায়তনের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকেরা মানববন্ধন, স্মারকলিপিসহ নানা কর্মসূচি পালন করে আসছেন।
শহরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের মতো বড় স্থান বলতে এখন জেলা পাবলিক হলই একমাত্র। ১৯৬০ সালে নির্মিত জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণাধীন এই আধা পাকা ভবনটির ধারণক্ষমতা চার শতাধিক। কিন্তু পর্যাপ্ত চেয়ার, ফ্যান ও আলোর ব্যবস্থা নেই। শীতাতপনিয়ন্ত্রণের সুবিধাও নেই। পুরুষ ও নারী শিল্পীদের জন্য আলাদা প্রসাধনকক্ষের ব্যবস্থাও করা হয়নি। একটি ছোট মঞ্চেই আয়োজন করতে হয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান।
আধুনিক মিলনায়তনের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকেরা মানববন্ধন, স্মারকলিপিসহ নানা কর্মসূচি পালন করে আসছেন। জনপ্রতিনিধিরাও বিভিন্ন সময়ে আধুনিক মিলনায়তন নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।
নেত্রকোনা-২ (সদর-বারহাট্টা) আসনের সংসদ সদস্য মো. আনোয়ারুল হক প্রথম আলোকে বলেন, জেলায় একটি আধুনিক মিলনায়তন নির্মাণের জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। এ বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হবে বলে আশা করছেন তিনি। আর জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, মোক্তারপাড়ায় জেলা শিল্পকলা একাডেমি-সংলগ্ন জায়গায় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি আধুনিক মিলনায়তন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। জায়গার বিষয়টি সমাধানের কাজ চলছে। এ নিয়ে পৌর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।