ব্যবসায় শিক্ষায় ভাটা, খালি ৫ শতাধিক আসন

· Prothom Alo

একসময় প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থীর পদচারণে মুখর ছিল খুলনার আযম খান সরকারি কমার্স কলেজ। এখন শিক্ষার্থী কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ছয় হাজারে। শুধু শিক্ষার্থী কমেনি, প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক আসনও খালি থাকছে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে কলেজটির স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ে ৪টি বিষয়ে ১ হাজার ১৩০টি আসনের বিপরীতে ভর্তি হয়েছেন ৫৫২ জন। খালি আছে ৫৭৮টি আসন, যা মোট আসনের ৫১ শতাংশের বেশি। এর আগের শিক্ষাবর্ষে খালি ছিল ১৯২টি আসন। স্নাতক পর্যায়ে আসনসংখ্যা ১ হাজার ১৩০টি।

১৯৫৩ সালের ১৪ আগস্ট খুলনা কমার্স কলেজ নামে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। খুলনা মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় ভবনে উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির নৈশকালীন পাঠদানের মধ্য দিয়ে কলেজটির কার্যক্রম চালু হয়। পরে ১৯৬১ সাল থেকে দিনে পাঠদান শুরু হয়। ওই বছর কলেজটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় আযম খান কমার্স কলেজ। ১৯৬৩ সাল থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বাণিজ্য বিষয়ে স্নাতক পড়ানো শুরু হয়। ১৯৭২ সালে খুলনা অঞ্চলের প্রথম কলেজ হিসেবে হিসাববিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে স্নাতকোত্তর চালু করা হয়। কলেজটি জাতীয়করণ হয় ১৯৭৯ সালে। এখানে ডিগ্রি পাস কোর্সও চালু আছে।

Visit newsbetsport.bond for more information.

অধ্যাপক মো. রফিকুল ইসলাম, অধ্যক্ষ, আযম খান সরকারি কমার্স কলেজকরোনা মহামারির আগেও কলেজটিতে ১০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ছিল। করোনার পর থেকে শিক্ষার্থী কমতে শুরু করেছে। গত ৩ বছরে শিক্ষার্থী কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ এবং ৬ বছরে কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ।

শুধু আযম খান সরকারি কমার্স কলেজে নয়, বৃহত্তর পরিসরে ব্যবসায় শিক্ষায় ভাটা পড়েছে। যশোর শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের পরিসংখ্যানেও একই চিত্র পাওয়া গেছে। যশোর বোর্ডে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া মোট পরীক্ষার্থীর মধ্যে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থীদের হার ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২৩ সালে মোট পরীক্ষার্থীর মধ্যে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল ১৩ দশমিক ১৮ শতাংশ। ২০২৪ সালে এ হার কমে দাঁড়ায় ১২ দশমিক ২৩ শতাংশে। ২০২৫ সালে তা আরও কমে ১০ দশমিক ৯৭ শতাংশ এবং ২০২৬ সালে নেমে এসেছে ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশে। শুধু অনুপাতেই নয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের পরীক্ষার্থীর সংখ্যাতেও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ২০২৪ সালে যশোর শিক্ষা বোর্ডে এইচএসসি পরীক্ষায় ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের পরীক্ষার্থী ছিল ১৫ হাজার ১৮০ জন। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা কমে ১২ হাজার ৭৬৪ জনে দাঁড়ায়। ২০২৬ সালে তা আরও কমে হয়েছে ১২ হাজার ৪৯৪ জন।

কলেজটির অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, করোনা মহামারির আগেও কলেজটিতে ১০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ছিল। করোনার পর থেকে শিক্ষার্থী কমতে শুরু করেছে। গত ৩ বছরে শিক্ষার্থী কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ এবং ৬ বছরে কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ। সারা দেশের সব ধরনের কলেজেই বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষার্থী কমছে, তবে যেসব কলেজে শুধু বাণিজ্য বিষয়ে পড়ানো হয়, সেখানে এর প্রভাব বেশি স্পষ্ট।

৪টি বিষয়ে অর্ধেকের বেশি আসন খালি

কলেজ প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ে হিসাববিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগে ৩৭৫টি করে এবং ফিন্যান্স ও ব্যাংকিংসহ মার্কেটিং বিভাগে ১৯০টি করে আসন আছে। মোট আসন ১ হাজার ১৩০টি। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে এসব আসনের বিপরীতে হিসাববিজ্ঞানে ১৩৬ জন, ফিন্যান্স ও ব্যাংকিংয়ে ৭০, ব্যবস্থাপনায় ২২৬ ও মার্কেটিংয়ে ১২০ জন ভর্তি হন। ৪টি বিভাগে মোট ভর্তি হয়েছেন ৫৫২ জন। খালি আছে ৫৭৮টি আসন।

এর আগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে হিসাববিজ্ঞানে ২৯৬ জন, ফিন্যান্স ও ব্যাংকিংয়ে ১৩৯, ব্যবস্থাপনায় ৩৪৪ এবং মার্কেটিংয়ে ১৫৯ জন ভর্তি হয়েছিলেন। ৪টি বিষয়ে মোট ভর্তি হয়েছিলেন ৯৩৮ জন। ফলে ওই বছর ১৯২টি আসন খালি ছিল। অর্থাৎ ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে প্রায় ১৭ শতাংশ আসন খালি ছিল। পরের শিক্ষাবর্ষে খালি ছিল মোট আসনের ৫১ শতাংশের বেশি। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক (পাস) কোর্সে ৩০০ আসনের মধ্যে ভর্তি হয়েছেন মাত্র ৩১ জন।

স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ে হিসাববিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগে ৩৭৫টি করে এবং ফিন্যান্স ও ব্যাংকিংসহ মার্কেটিং বিভাগে ১৯০টি করে আসন আছে। মোট আসন ১ হাজার ১৩০টি। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে এসব আসনের বিপরীতে হিসাববিজ্ঞানে ১৩৬ জন, ফিন্যান্স ও ব্যাংকিংয়ে ৭০, ব্যবস্থাপনায় ২২৬ ও মার্কেটিংয়ে ১২০ জন ভর্তি হন।

স্নাতকোত্তরেও আসন খালি

স্নাতকোত্তর পর্যায়েও আসন পূরণ হচ্ছে না। হিসাববিজ্ঞানে ৫০০, ব্যবস্থাপনায় ৫৫০, ফিন্যান্স ও ব্যাংকিংয়ে ১৯০ এবং মার্কেটিংয়ে ১৯০টি করে আসন আছে। ৪টি বিষয়ে মোট আসন ১ হাজার ৪৩০টি। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে এসব আসনের বিপরীতে হিসাববিজ্ঞানে ২৫০, ব্যবস্থাপনায় ২৯৭, মার্কেটিংয়ে ১৭২ এবং ফিন্যান্স ও ব্যাংকিংয়ে ১৩০ জন ভর্তি হয়েছেন। মোট ভর্তি হয়েছেন ৮৪৯ জন। ফলে ৫৮১টি আসন খালি ছিল। এর আগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে খালি ছিল ৪৭১টি আসন।

স্নাতকোত্তর প্রিলিমিনারি কোর্সেও ভর্তির চিত্র আরও হতাশাজনক। ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে হিসাববিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা মিলিয়ে ২৫০টি আসনের বিপরীতে ভর্তি হয়েছেন মাত্র ৪৮ জন। এর মধ্যে ব্যবস্থাপনায় ১৫০ আসনের বিপরীতে ৪১ জন ও হিসাববিজ্ঞানে ১০০ আসনের বিপরীতে ভর্তি হয়েছেন ৭ জন। ফলে প্রিলিমিনারি কোর্সে ২০২টি আসন খালি ছিল।

খুলনার আযম খান সরকারি কমার্স কলেজের ফটক। সম্প্রতি তোলা

উচ্চমাধ্যমিকে কমছে ভর্তি

উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়েও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কলেজটিতে বাণিজ্য বিভাগের উচ্চমাধ্যমিকে আসন ৪৭০টি। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হয়েছিল ৪৫২ জন। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হয়েছে মাত্র ৩২১ জন। এক বছরের ব্যবধানে ভর্তি কমেছে ১৩১ জন।

কলেজটির ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক তারক চাঁদ ঢালী বলেন, সারা বিশ্বে ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য ব্যবসায় শিক্ষার শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। বাংলাদেশে এর ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে। মানবিকসহ অন্য কিছু বিষয়ে তুলনামূলক কম শ্রম দিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরির প্রস্তুতিতে বেশি সময় দেওয়া সম্ভব হওয়ায় ব্যবসায় শিক্ষার শিক্ষার্থী কমছে।

ব্যাংকে চাকরির কথা মাথায় রেখেই কলেজটির মার্কেটিং বিভাগে স্নাতকে ভর্তি হয়েছিলেন দীপা বৈদ্য। প্রথম বর্ষ শেষ না করেই পড়াশোনা ছেড়ে দেন তিনি। দীপা বৈদ্য বলেন, বর্তমান চাকরির বাজার বিবেচনায় তাঁর বাবা তাঁকে নার্সিংয়েও ভর্তি করিয়ে দিয়েছেন।

আবাসনসংকট

শিক্ষার্থী কমলেও কলেজটির আবাসনসংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে প্রায় ছয় হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে ছাত্রদের জন্য আছে মাত্র একটি ছাত্রাবাস। সেখানে আসন ৯৮টি। ছাত্রীদের জন্য কোনো আবাসিকের ব্যবস্থা নেই। ছাত্রাবাসে সরকারি অনুদানও নেই। রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুৎ বিলসহ শুধু থাকার জন্য শিক্ষার্থীপ্রতি মাসে ৫৫০ টাকা দিতে হয়। খাবারের খরচ আলাদা।

ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আফরোজা আক্তার বলেন, তাঁর বাড়ি বাগেরহাটের ফকিরহাটে। কলেজে ছাত্রীনিবাস না থাকায় তাঁকে মেসে থাকতে হয়। ক্যানটিন ও পর্যাপ্ত পরিবহনের সুবিধাও নেই। বাইরে থাকায় নিরাপত্তাহীনতার পাশাপাশি বাড়ছে থাকার খরচও।

শ্রেণিকক্ষও সীমিত

শিক্ষার্থীদের পাঠদানের জন্য কলেজে আছে ২৪টি শ্রেণিকক্ষ। সর্বোচ্চ ১০০ জনের কিছু বেশি শিক্ষার্থী বসতে পারেন, এমন শ্রেণিকক্ষ নেই। কোনো কোনো কক্ষে বসার ব্যবস্থা রয়েছে মাত্র ৬০ জনের। ফলে শিক্ষার্থীদের পাঠদানে সংকট তৈরি হয়।
কলেজে প্রায় ১৮ হাজার বইয়ের একটি গ্রন্থাগার আছে। সেখানে একসঙ্গে বসতে পারেন প্রায় ৯০ জন। গ্রন্থাগারে জনবলসংকটের পাশাপাশি বই কেনার জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দও নেই বলে জানান গ্রন্থাগারিক জি এম রুহুল কুদ্দুস।

কলেজটির অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, কলেজের একটি ১০ তলা মাল্টিপারপাস ভবন নির্মাণের প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ চলছে। সেটি হলে অবকাঠামোগত সংকট অনেকটাই কেটে যাবে।

Read full story at source