নির্বাচিত শিক্ষক প্রতিনিধিদের ছাড়াই হলো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট অধিবেশন

· Prothom Alo

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রতিনিধি ছাড়াই সিনেটের অধিবেশন হয়েছে। ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তির বিক্ষোভের কারণে শিক্ষক প্রতিনিধিদের কেউ সিনেটে যাননি। তাঁরা নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়েছেন।

আজ শনিবার বেলা ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে এ অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশন চলে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত। তবে অধিবেশনে নির্বাচিত শিক্ষক প্রতিনিধিদের দেখা যায়নি। সিনেটে বর্তমানে নির্বাচিত শিক্ষক প্রতিনিধি রয়েছেন ২৪ জন। তাঁরা কেউ প্রশাসনিক ভবনে যাননি। তাঁদের বেশির ভাগই আওয়ামী ও বামপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন মুক্তিযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের (হলুদ দল) রাজনীতিতে যুক্ত।

Visit freshyourfeel.com for more information.

ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তি ও চাকসুর নেতা-কর্মীদের দাবি, এ শিক্ষকেরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত। আওয়ামীপন্থী কোনো শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটে আর যুক্ত হতে পারবেন না। যদি কেউ সিনেটে যোগ দেন, তাহলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে। এ দাবিতেই তাঁরা কর্মসূচি পালন করেছেন।

সিনেট হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পর্ষদ। এতে বার্ষিক প্রতিবেদন, বার্ষিক হিসাব-নিকাশ,আর্থিক প্রাক্কলন বিবেচনা, অনুমোদনসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন কাজ হয়। প্রতিবছর অন্তত একবার সিনেট সদস্যরা অধিবেশন করেন। তবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরে গত দুই বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো সিনেট অধিবেশন হয়নি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটে ১২টি ক্যাটাগরিতে মোট ১০২ জন সদস্যের পদ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন উপাচার্য, দুই সহ-উপাচার্য, সরকার মনোনীত পাঁচজন সরকারি কর্মকর্তা, জাতীয় সংসদের স্পিকার মনোনীত পাঁচজন সংসদ সদস্য, আচার্য মনোনীত পাঁচজন শিক্ষাবিদ, সিন্ডিকেট মনোনীত গবেষণা সংস্থার পাঁচজন প্রতিনিধি। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দ্বারা নির্বাচিত ৩৩ জন শিক্ষক।

সিনেটে শিক্ষক প্রতিনিধির সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল ২০১৫ সালের ৩০ এপ্রিল। তবে বর্তমানে মৃত্যু ও অবসরের কারণে ৯টি পদ শূন্য রয়েছে। বাকি ২৪ জন প্রতিনিধির আজ সিনেটে থাকার কথা ছিল। তাঁদের মধ্যে অন্তত ২০ জন ক্যাম্পাসে এসেছিলেন। তবে তাঁরা সিনেট অধিবেশনে যোগ দেননি।

অধিবেশনে না আসা শিক্ষকদের একজন সমাজতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক এস এম মনিরুল হাসান। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রায় ২০ জন ক্যাম্পাসে উপস্থিত ছিলাম। একজন নির্বাচিত সদস্য কেন সিনেট সভায় যোগ দিতে পারবেন না, সেটিই আমাদের প্রশ্ন।’

বন ও পরিবেশবিদ্যা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মো. দানেশ মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা প্রায় ২০ জন শিক্ষক সিনেট অধিবেশনে যাচ্ছি না। কারণ, সিনেট সভায় অংশ নেওয়ার মতো পরিবেশ সেখানে ছিল না। সিনেট কর্তৃপক্ষ আমাদের নিরাপত্তা দিতে পারেনি। ২০১৫ সালের সিনেট নির্বাচনে নির্বাচিত শিক্ষকদের সবাই এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে আছেন।’

চাকসুর ১৯ দফা দাবি

সিনেট অধিবেশন প্রত্যাখ্যান করে উপাচার্যের কাছে ১৯ দফা দাবিসংবলিত খোলাচিঠি দিয়েছে চাকসু। আজ বেলা ১১টায় চাকসু ভবনের সামনে সংবাদ সম্মেলনে জিএস সাঈদ বিন হাবিবের সঞ্চালনায় চিঠিটি পাঠ করেন ভিপি মো. ইব্রাহীম।

চিঠিতে বলা হয়, সিনেটে শিক্ষার্থীদের পাঁচজন নির্বাচিত প্রতিনিধি থাকার কথা থাকলেও নির্বাচন না হওয়ায় তাঁরা গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একই সঙ্গে বর্তমান সিনেটে জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর গণহত্যার পক্ষে মৌন মিছিল করা শিক্ষক রয়েছেন। তাই তাঁরা সিনেট অধিবেশন প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দিয়েছেন।

চাকসুর ১৯ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে নতুন হল নির্মাণ, বিদ্যমান হল সংস্কার, আবাসন সক্ষমতা ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি, ৩ হাজার শিক্ষার্থীকে আবাসন ভাতা, নতুন শাটল ট্রেন ও বগি সংযোজন এবং শহরগামী অন্তত ১০টি বাস চালু ইত্যাদি।

ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ও ছাত্রশক্তির বিক্ষোভ

‘আওয়ামী লীগের ঠিকানা সিনেটে হবে না, স্বৈরাচারের ঠিকানা সিনেটে হবে না’ এই স্লোগানে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল। আজ সকাল ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে এ কর্মসূচি হয়। কর্মসূচিতে শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ইয়াসিন, সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন, সহসভাপতি আহসান হাবিব এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসান আহমেদ ও জালাল সিদ্দিকী উপস্থিত ছিলেন।

অবস্থান কর্মসূচির একপর্যায়ে শাখা ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎ শেষে শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, আওয়ামী লীগের কোনো শিক্ষক সিনেট অধিবেশনে থাকতে পারবেন না। যদি কেউ সিনেটে আমন্ত্রণ পান, তাহলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।

এদিকে একই দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন শাখা ইসলামী ছাত্রশিবির ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতা-কর্মীরা। আজ সকাল ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে ছাত্রশক্তির বিক্ষোভ শুরু হয়। অন্যদিকে বেলা একটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের সামনে ছাত্রশিবিরের বিক্ষোভ হয়।

কর্মসূচির বিষয়ে জানতে চাইলে শাখা জাতীয় ছাত্রশক্তির সাধারণ সম্পাদক মো. ইসমাইল বলেন, ‘ফ্যাসিবাদের দোসর যেন সিনেট সভায় অংশ নিতে না পারেন, সে দাবিতে আমরা প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছি। পরে জানতে পেরেছি, ওই শিক্ষকেরা ক্যাম্পাসে এসেছিলেন। প্রশাসন তাঁদের নিরাপদে বের হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। প্রশাসনকে এ ঘটনার জবাব দিতে হবে।’

যা বললেন উপাচার্য

সিনেট সভায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য মোহাম্মদ আল-ফোরকান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা তাঁদের আসতে নিষেধ করিনি। কারণ, সিনেটে আসা তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার। সিনেটের সব প্রক্রিয়া আমরা অনুসরণ করেছি। এখন না আসাটা তাঁদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হতে পারে।’

উপাচার্য মোহাম্মদ আল-ফোরকান বলেন, সিনেট সভা শান্তিপূর্ণভাবেই সম্পূর্ণ হয়েছে। সকালে কিছুটা সংশয় দেখা দিয়েছিল। বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীরা আমাদের কাছে কিছু দাবি নিয়ে এসেছিল। তবে পরে আর সংশয় দেখা দেয়নি। সিনেটে যাঁরা নির্বাচিত সদস্য রয়েছেন, তাঁরা নিজেরাই অনেকেই পদ ছেড়ে সরে যেতে চাচ্ছেন। আজকে আমরা পরিষ্কারভাবে বলেছি, ধারাবাহিকভাবে সিনেটের সব পর্যায়ের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।’

Read full story at source