যে কারণে ভয়াবহ হলো চট্টগ্রামের বাঁশখালী-চকরিয়ার এবারের বন্যা, আবার বন্যা হলে কী হবে
· Prothom Alo

গত ৫ জুলাই থেকে চট্টগ্রাম অঞ্চলে টানা আট দিন বৃষ্টি হয়েছে। চট্টগ্রামে ১ হাজার ১৬৯ মিলিমিটার এবং কক্সবাজারে ৭০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হয়। এতে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলায় বন্যা দেখা দেয়। বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে মারা যান ৪১ জন। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১৪ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি।
বন্যার পানি নেমেছে বেশ কিছুদিন আগে। কিন্তু চট্টগ্রামের বাঁশখালীর কাঁথারিয়া ইউনিয়নের বাঘমারা গ্রামের কৃষক আবুল খায়েরের (৬৫) ঘর থেকে বন্যার চিহ্ন এখনো মুছে যায়নি। টিনের দেয়ালে লেগে আছে পানির দাগ। নষ্ট হয়েছে ঘরের আসবাব, ধান ও চাল। পানি সরে যাওয়ার পর নতুন করে সংসার গোছানোর চেষ্টা করছেন তিনি।
Visit saltysenoritaaz.com for more information.
জীবনে অনেক বর্ষা দেখেছেন আবুল খায়ের। কিন্তু এবারের মতো বন্যা দেখেননি। তাঁর ধারণা, শুধু অতি ভারী বৃষ্টিই এই বিপর্যয়ের কারণ নয়। বাড়ির পাশের সোনাইমুড়ি খালে মাছ চাষের জন্য একটি কালভার্টের নিচে ইটের দেয়াল তুলে পানিপ্রবাহ সংকুচিত করে দেওয়া হয়েছিল। পাহাড়ি ঢল আর টানা বৃষ্টির পানি সেই বাধা পেরোতে না পেরে কয়েক দিন ধরে লোকালয়ে আটকে ছিল। পরে সেটিই ভয়াবহ বন্যার রূপ নেয়।
পানির স্বাভাবিক প্রবাহে প্রতিবন্ধকতার চিত্র শুধু সাম্প্রতিক বন্যায় নয়, আগের জরিপেও উঠে এসেছিল। ২০১৭ সালে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম) মাঠপর্যায়ে জরিপ চালিয়ে বাঁশখালীতে পাউবোর ৮৯টি স্লুইসগেট শনাক্ত করে। একই সঙ্গে খাল, বিল ও জলাশয়ে পানি আটকে রাখতে অন্তত ১৫৭টি অবৈধ প্রতিবন্ধকতার অস্তিত্বও চিহ্নিত করা হয়।
আবুল খায়েরের এই অভিযোগ একেবারে বিচ্ছিন্ন নয়। বাঁশখালী ও কক্সবাজারের চকরিয়ার বন্যাকবলিত এলাকা ঘুরে একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোথাও মাছ চাষের জন্য খালের মুখে স্লুইসগেট বন্ধ রাখা হয়েছে, কোথাও তৈরি করা হয়েছে ইটের দেয়াল, মাটির বাঁধ, বাঁশের বেড়া বা বালুর বস্তার প্রতিবন্ধকতা। আবার কোথাও লবণাক্ত পানি ঠেকাতে বছরের পর বছর বন্ধ রাখা হয়েছে সরকারি স্লুইসগেট। বন্যার সময়ও এসব বাধা পুরোপুরি সরানো হয়নি।
ফলে পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টির পানি স্বাভাবিক পথে নদী বা সাগরে নামতে পারেনি। দিনের পর দিন আটকে থেকেছে জনপদে। কোথাও ঘরবাড়ি ডুবেছে, কোথাও ভেঙে পড়েছে মাটির ঘর। ক্ষয়ক্ষতি বেড়েছে কয়েক গুণ। শুধু স্থানীয়ভাবে তৈরি এসব প্রতিবন্ধকতা নয়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) পুরোনো ও অকার্যকর স্লুইসগেট এবং রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতিও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
এই প্রতিবেদনের জন্য বাঁশখালী ও চকরিয়ার বন্যাকবলিত এলাকা ঘুরে ভুক্তভোগী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পরিবেশকর্মী, প্রশাসন ও পাউবোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। পাশাপাশি পর্যালোচনা করা হয়েছে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের (আইডব্লিউএম) জরিপ এবং বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পাউবোর করা গবেষণা প্রতিবেদন।
এবারের বন্যায় ঘরবাড়ি ডুবে ছিল কৃষক আবুল খায়েরের। খালে ইটের দেয়ালে পানি আটকে যাওয়ায় বন্যা ভয়াবহ রূপ নেয় বলে দাবি তাঁর। খালের সেই বাঁধ দেখাচ্ছিলেন তিনি। সম্প্রতি চট্টগ্রামের বাঁশখালী কাথারিয়া ইউনিয়নের বাঘমারা গ্রামেমৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ সৃষ্টি হলে গত ৫ জুলাই থেকে চট্টগ্রাম অঞ্চলে বৃষ্টি শুরু হয়। টানা আট দিনের বৃষ্টিতে চট্টগ্রামে ১ হাজার ১৬৯ মিলিমিটার এবং কক্সবাজারে ৭০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হয়। এতে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলায় বন্যা দেখা দেয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালী, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া এবং কক্সবাজারের চকরিয়া ও মাতামুহুরী। বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে মারা যান ৪১ জন। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১৪ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি।
মাছের জন্য বাঁধ, ডুবল গ্রাম
কাঁথারিয়া ইউনিয়নের সোনাইমুড়ি খাল একসময় পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির পানি জলকদর খাল হয়ে সমুদ্রে নিয়ে যেত। প্রায় ২০ ফুট প্রশস্ত এই খালের ভেতরে মাছ চাষের জন্য দুই ধাপে ইটের দেয়াল তুলে পানিপ্রবাহ সংকুচিত করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, ২০ ফুটের বেশি প্রশস্ত খালে পানি চলাচলের জন্য রাখা হয়েছিল মাত্র ৩ ফুট জায়গা।
স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তৎকালীন ইউপি সদস্য মো. আনসার এই প্রতিবন্ধকতা নির্মাণ করেন। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তখন কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পাননি। ক্ষমতার পালাবদলের পরও কাঠামোটি থেকে যায়, চলতে থাকে মাছ চাষ।
এবারের বন্যায় সেটিই হয়ে ওঠে পানিনিষ্কাশনের বড় বাধা। পাহাড়ি ঢল খাল দিয়ে নামতে না পেরে আশপাশের বিল, বসতঘর ও সড়কে ছড়িয়ে পড়ে। পাঁচ থেকে ছয় দিন পানি আটকে থাকার পর উপজেলা প্রশাসন খননযন্ত্র দিয়ে বাঁধের একাংশ কেটে দেয়। তবে পুরো কাঠামো অপসারণ করা সম্ভব হয়নি।
গত ২৬ জুলাই সরেজমিনে দেখা যায়, খালের ভেতরে ইটের দেয়ালের বড় অংশ এখনো রয়ে গেছে। ভাঙা অংশ দিয়ে অল্প অল্প করে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। মাত্র ৫০ মিটার দূরে পাউবোর একটি স্লুইসগেট। কিন্তু খালের ভেতরের এই কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতার কারণে স্লুইসগেটটির কার্যকারিতাও অনেকটা নষ্ট হয়ে গেছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাবেক ইউপি সদস্য মো. আনসার। তাঁর দাবি, লবণাক্ত পানি ঠেকিয়ে ধান ও সবজি চাষের সুবিধার জন্য আগেই সেখানে দেয়াল ছিল। মাছ চাষও আগে থেকে হতো। তিনি ২০১৯ সালে ইজারা নিয়ে মাছ চাষ শুরু করেন। এখন মাছ চাষের কারণে তাঁকেই দায়ী করা হচ্ছে।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি ঘর। সম্প্রতি বাঁশখালীর কাথারিয়া ইউনিয়নের বাঘমারা গ্রামের জানবাপের বাড়ি এলাকায় ড. আইনুন নিশাত, পরিবেশ ও পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপকপানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করা অবৈধ বাঁধ ও প্রতিবন্ধকতা অপসারণ করতে হবে। এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ রকম করতে না পারেন। একই সঙ্গে বিদ্যমান স্লুইসগেটগুলোর কার্যকারিতা নতুন করে মূল্যায়ন করে প্রয়োজন হলে পুনর্নির্মাণ করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পানি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থের বাইরে এনে জনস্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালনা নিশ্চিত করা।গেটের নিয়ন্ত্রণ বদলায়, দুর্ভোগ থেকে যায়
কাঁথারিয়ার বাঘমারা গ্রামের মতো একই চিত্র পাওয়া গেছে বাহারছড়া ইউনিয়নের রত্নপুর গ্রামেও। জলকদর খালের সঙ্গে যুক্ত একটি খালের মুখে রয়েছে এক ভেন্টের একটি স্লুইসগেট।
স্থানীয় তিন বাসিন্দার ভাষ্য, মাছ চাষের স্বার্থে দীর্ঘদিন ধরে এই গেট ব্যবহার করে পানি আটকে রাখা হচ্ছিল। আগে মাছ চাষ ও গেটের নিয়ন্ত্রণ করতেন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত মো. জামাল। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর নিয়ন্ত্রণ চলে যায় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত মৌলভি ছগির ও মনসুর নামের দুই ব্যক্তির কাছে। এবারের টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের সময়ও গেটটি পুরোপুরি খোলা হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ফলে প্লাবিত হয় পুরো গ্রাম।
রত্নপুরের বাসিন্দা মোহাম্মদ রাসেল বন্যার সময় অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে ছিলেন। সঙ্গে ছিলেন তাঁর বাবা। সেখানেই খবর পান, বাড়িতে পানি ঢুকছে। ঘরে একা ছিলেন বৃদ্ধ মা। কোমরপানিতে তলিয়ে যায় বসতঘর, নষ্ট হয়ে যায় প্রায় সব আসবাব। আরেক বাসিন্দা মোহাম্মদ আনসুর বলেন, গেট বন্ধ না থাকলে পানি আগেই নেমে যেত। পানি সময়মতো বের হতে পারলে গ্রামের ক্ষয়ক্ষতিও এতটা হতো না।
তুফান আলী তালুকদার বাড়ির চিত্র ছিল আরও ভিন্ন। এখানে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি নয়, স্থানীয় বাসিন্দারাই দীর্ঘদিন একটি স্লুইসগেট বন্ধ রেখেছিলেন। কারণ, খাল দিয়ে জোয়ারের লোনা পানি ঢুকলে ধানখেত ও মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হতো।
বছরের পর বছর বন্ধ থাকায় গেটটি একসময় অকেজো হয়ে পড়ে। অতি ভারী বৃষ্টির সময় এই গেট দিয়ে পানি বের হওয়ার কথা থাকলেও তা আর সম্ভব হয়নি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পাহাড়ি ঢলে পুরো এলাকা ডুবে যায়। পানি খালে নামতে না পেরে ঢুকে পড়ে বসতবাড়িতে। প্রশাসন পরে ক্রেন এনে গেট ভাঙলেও ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ৫০ থেকে ৬০টি মাটির ঘর ধসে পড়ে।
বাঁশখালীর বিভিন্ন ইউনিয়নে এমন আরও অনেক প্রতিবন্ধকতার সন্ধান পাওয়া গেছে। কোথাও মাছের ঘের রক্ষায়, কোথাও লবণ চাষের সুবিধায়, আবার কোথাও লোনাপানি ঠেকাতে পানি চলাচলের পথে বাধা দেওয়া হয়েছে। ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের সময় এসব বাধাই পানি আটকে দিয়েছে।
খালে বাঁধ দেওয়ার কারণে পানিপ্রবাহ আটকে যাচ্ছে। সম্প্রতি চট্টগ্রামের বাঁশখালী কাথারিয়া ইউনিয়নের বাঘমারা গ্রামেচকরিয়াতেও গেটের নিয়ন্ত্রণে প্রভাবশালীরা
বাঁশখালীর কাঁথারিয়া থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে কক্সবাজারের চকরিয়া ও মাতামুহুরীতেও প্রায় একই চিত্র। কোথাও মাছ চাষের জন্য স্লুইসগেট বন্ধ রাখা হয়েছে, কোথাও ব্যক্তিগত উদ্যোগে নতুন গেট নির্মাণ করে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের ক্ষয়ক্ষতির নথি অনুযায়ী, জুলাইয়ের বন্যায় মাতামুহুরী উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের অন্তত ৮৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়।
এই সাত ইউনিয়নের পানিনিষ্কাশনের প্রধান পথ ঢেমুশিয়া ক্রসড্যাম স্লুইসগেট। পাঁচ ভেন্টের এই গেট দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে বিপুল পরিমাণ পানি মাতামুহুরী নদীতে নামে। স্থানীয়দের অভিযোগ, জুলাইয়ের টানা বৃষ্টির সময় গেটটি তিন দিন কার্যত বন্ধ রাখা হয়েছিল। ফলে সাত ইউনিয়নের প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, ১২ ফুট উচ্চতার গেটটির নিচের ৪ ফুট কাঠ দিয়ে আটকে রাখা হয়েছিল। ওপরের অংশও কপাট দিয়ে বন্ধ রেখে মাঝখানে জাল বসিয়ে মাছ ধরা হচ্ছিল। বন্যার পানি আটকে মাছের ঘের ও পুকুর প্লাবিত হওয়ার পর পানি নামার সময়ও গেটের সামনে-পেছনে জাল বসিয়ে মাছ ধরা হয়। এতে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ আরও ব্যাহত হয়।
৬ জুলাই রাতে স্থানীয় পরিবেশকর্মী আলাউদ্দিন আলোর ফেসবুক লাইভে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে গিয়ে গেট খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। স্থানীয় মানুষের অভিযোগ, প্রশাসনের কর্মকর্তারা চলে যাওয়ার পর আবারও গেট আটকে দেওয়া হয়। কয়েক দিন ধরে এমন খোলা-বন্ধের ঘটনা চলেছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) চকরিয়া উপজেলা সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন আলো প্রথম আলোকে বলেন, বন্যার শুরুতে তিন দিন ঢেমুশিয়া ক্রসড্যাম স্লুইসগেট বন্ধ রেখে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করা হয়। পরে তাঁর ফেসবুক লাইভে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে গিয়ে গেট সচল করার ব্যবস্থা করেন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঢেমুশিয়া ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন। তাঁর দাবি, পানি বাড়তে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গেই গেট খুলে দেওয়া হয়েছিল।
শুধু ঢেমুশিয়াই নয়, ছয়কুড়িটিক্কাপাড়া, বাংলাবাজার ও বদরখালী ১ নম্বর ব্লকের গোদারপাড়া স্লুইসগেটও বন্যার শুরুতে কয়েক দিন বন্ধ ছিল বলে স্থানীয় মানুষের অভিযোগ। গোঁয়ারফাঁড়ি খালের শেষ প্রান্তে সরকারি স্লুইসগেট থাকার পরও তার কয়েক শ ফুট আগে ব্যক্তিগত উদ্যোগে আরেকটি গেট নির্মাণ করা হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এটিও পানিনিষ্কাশনের পথে নতুন বাধা তৈরি করেছে। যদিও গেট নির্মাণকারী নেজাম উদ্দিনের দাবি, বৈধ ইজারা নেওয়া খালেই তিনি নিজের অর্থে গেটটি নির্মাণ করেছেন।
চকরিয়া ও মাতামুহুরী এলাকায় মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ৪৫ হাজার ৫০০ একর জমিতে চিংড়ি চাষ হয়। শুষ্ক মৌসুমে সেখানে লবণ এবং বর্ষাকালে মাছ চাষ করা হয়। স্থানীয় লোকজনের মতে, এই বিপুল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো অনেক ক্ষেত্রে জনস্বার্থের চেয়ে নিজেদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়।
ঘরজুড়ে কাদা আর নোংরা পানি, বন্যার পর যেভাবে বেঁচে আছেন প্রতিবন্ধী ভাই–বোনসরকারি গেটের চেয়েও বেশি অবৈধ প্রতিবন্ধকতা
পানির স্বাভাবিক প্রবাহে প্রতিবন্ধকতার চিত্র শুধু সাম্প্রতিক বন্যায় নয়, আগের জরিপেও উঠে এসেছিল। ২০১৭ সালে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম) মাঠপর্যায়ে জরিপ চালিয়ে বাঁশখালীতে পাউবোর ৮৯টি স্লুইসগেট শনাক্ত করে। একই সঙ্গে খাল, বিল ও জলাশয়ে পানি আটকে রাখতে অন্তত ১৫৭টি অবৈধ প্রতিবন্ধকতার অস্তিত্বও চিহ্নিত করা হয়।
ইটের দেয়াল, মাটির বাঁধ, বাঁশের বেড়া কিংবা বালুর বস্তা—বিভিন্নভাবে এসব প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছিল। অর্থাৎ সরকারি পানি নিয়ন্ত্রণকাঠামোর চেয়ে ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিবন্ধকতার সংখ্যাই ছিল বেশি।
এবারের বন্যার সময় বাঁশখালী উপজেলা প্রশাসন অভিযান চালিয়ে অন্তত ৪৭টি অবৈধ প্রতিবন্ধকতা অপসারণ করে। গণ্ডামারা, সরল, বৈলছড়ি, পুঁইছড়ি, চাঁপাছড়ি, খানখানাবাদ, ছনুয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে স্লুইসগেটের মুখও খুলে দিতে হয়। অনেক গেটে মাছ রক্ষার জন্য কাঠ দিয়ে কপাট আটকে রাখা হয়েছিল।
বাঁশখালীর সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ওমর সানী আকন প্রথম আলোকে বলেন, প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, মাছ চাষের উদ্দেশ্যে স্থানীয় প্রভাবশালী একটি মহল স্লুইসগেটের সামনে অবৈধ প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করছিল। বন্যার পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য উপজেলা প্রশাসন ৪৭টি অবৈধ প্রতিবন্ধকতা উচ্ছেদ করেছে। তবে অভিযানের খবর পেয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ঘটনাস্থল ছেড়ে যাওয়ায় কাউকে আটক করা যায়নি।
পাউবোর কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যক্তি উদ্যোগে তৈরি এসব বাঁধ বা প্রতিবন্ধকতা অপসারণ করা তাদের একার পক্ষে সম্ভব নয়। মাছ ও লবণ চাষের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অনেকেই স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী। স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া পানি চলাচলের পথ স্থায়ীভাবে উন্মুক্ত রাখা কঠিন।
চট্টগ্রামে পানিবন্দী আট মাসের শিশুকে পাতিলে করে উদ্ধার, ফেসবুকে ভিডিও৮৯ গেটের ১৯টির অস্তিত্বই নেই
অবৈধ প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি সরকারি পানি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার দুর্বলতাও কম নয়। একসময় বাঁশখালীতে পাউবোর ৮৯টি স্লুইসগেট ছিল। এখন এর মধ্যে টিকে আছে ৭০টি। বিভিন্ন সময়ে বাঁধ নির্মাণ, নদী-খালের গতিপথ পরিবর্তন এবং দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ১৯টি স্লুইসগেট হারিয়ে গেছে। বিদ্যমান ৭০টির মধ্যে ১৪টিও অকার্যকর। অর্থাৎ কার্যকর অবস্থায় আছে মাত্র ৫৬টি। আইডব্লিউএম ও পাউবোর জরিপে এই তথ্য পাওয়া গেছে।
পাউবোর একাধিক প্রকৌশলী জানান, বাঁশখালীর অধিকাংশ স্লুইসগেট নির্মিত হয়েছিল পাকিস্তান আমলে। তখনকার নদী ও খালের প্রবাহ, বৃষ্টিপাত এবং জনবসতির ধরন এখন আর নেই। কয়েক দশকে নদীর গতিপথ বদলেছে, অনেক খাল ভরাট ও দখল হয়েছে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্লুইসগেটগুলোর আধুনিকায়ন হয়নি। অধিকাংশই ছোট এক ভেন্টের গেট। স্বাভাবিক সময়ে এগুলো কাজ করলেও অতি ভারী বর্ষণ বা পাহাড়ি ঢলের বিপুল চাপ সামাল দেওয়ার সক্ষমতা নেই।
বন্যার পানিতে ডুবে রয়েছে সড়ক। চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বাহারছড়ায়সরেজমিনে দেখা গেছে, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক সরকারি স্লুইসগেট কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। বাহারছড়ার মোশাররফ আলী মিয়ার বাজার এলাকায় জলকদর খালের পাশের একটি স্লুইসগেট ঘিরে গড়ে উঠেছে দোকানপাট। খানখানাবাদের ডোংরা গ্রামের খলিফাপাড়ায় আরেকটি স্লুইসগেট বছরের পর বছর প্রায় অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, এসব অবকাঠামো সচল রাখার উদ্যোগ অনেক দিন ধরেই নেই।
পাউবোর চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী তানজীর সাইফ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, বিদ্যমান স্লুইসগেটগুলোর বেশির ভাগই আকারে ছোট। তাই বন্যার সময় পানি নামতে ধীরগতি হয়েছে। ভবিষ্যতে জলকদর খাল ও এর সঙ্গে যুক্ত খাল পুনঃখনন, অকার্যকর স্লুইসগেট প্রতিস্থাপন এবং খালের দুই পাশে বাঁধ নির্মাণের জন্য নতুন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।
ভাঙা ঘর, অনিশ্চিত জীবন—বাঁশখালীতে বন্যার দুর্দশার চিত্রসতর্কবার্তা ছিল আগেই
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় পাঁচটি উপকূলীয় পোল্ডারের পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা নিয়ে একটি কারিগরি গবেষণা করা হয়। গবেষণায় বলা হয়েছিল, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার উপকূলের বিদ্যমান স্লুইসগেট, বাঁধ ও খালনির্ভর পানিনিষ্কাশনব্যবস্থা বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে আর সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি, আকস্মিক পাহাড়ি ঢল ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ছে। অথচ অধিকাংশ অবকাঠামো নির্মিত হয়েছিল কয়েক দশক আগের বাস্তবতা বিবেচনায়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছিল, শুধু নতুন স্লুইসগেট নির্মাণ করে সমস্যার সমাধান হবে না। খাল পুনঃখনন, পানি প্রবাহের পথ দখলমুক্ত করা, পুরোনো অবকাঠামোর আধুনিকায়ন এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা না গেলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি তৈরি হবে।
আইডব্লিউএমের মূল্যায়নেও বহু স্লুইসগেটকে আংশিক কার্যকর, অকার্যকর কিংবা অপ্রতুল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। একই সঙ্গে খালের নাব্যতা হ্রাস, পলি জমা এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন পানি নিয়ন্ত্রণকাঠামোকে বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
পরিবেশ ও পানিসম্পদবিশেষজ্ঞ এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত প্রথম আলোকে বলেন, উপকূলে যে বাঁধগুলো নির্মাণ করা হয়েছে, সেগুলো মূলত সমুদ্রের জোয়ার ঠেকানোর জন্য। কিন্তু ভেতরের বৃষ্টির পানি দ্রুত বের করে দেওয়ার বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। তার ওপর স্লুইসগেটগুলো সময়মতো পরিচালিত হয় না, আবার অনেক জায়গায় ব্যক্তি উদ্যোগে পানিপ্রবাহ আটকে দেওয়া হয়েছে। ফলে পানিনিষ্কাশনব্যবস্থা বন্যা কমানোর পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে বন্যার তীব্রতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ড. আইনুন নিশাত বলেন, পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করা অবৈধ বাঁধ ও প্রতিবন্ধকতা অপসারণ করতে হবে। এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ রকম করতে না পারেন। একই সঙ্গে বিদ্যমান স্লুইসগেটগুলোর কার্যকারিতা নতুন করে মূল্যায়ন করে প্রয়োজন হলে পুনর্নির্মাণ করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পানি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থের বাইরে এনে জনস্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালনা নিশ্চিত করা।
বাঁশখালীর বাঘমারা গ্রামের আবুল খায়েরের ঘরের টিনের দেয়ালে বন্যার পানির দাগ হয়তো একসময় মুছে যাবে। কিন্তু যে প্রশ্নটি থেকে যাবে, তা হলো—অতি ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলকে দুর্যোগে রূপ নেওয়ার আগেই পানি নামার স্বাভাবিক পথগুলো কি এবার খোলা রাখা হবে?
‘ও বাপ, আঁর ঘর আর নাই, কিছু বাঁচাইত ন পারি’