হাঙর, শাপলাপাতা আর পীতাম্বরী মাছ যেভাবে সমুদ্র রক্ষা করে

· Prothom Alo

সমুদ্রের গভীরে যদি হঠাৎ বড় একটা পাখনা পানির ওপর ভেসে ওঠে, তোমার মাথায় প্রথম কী আসবে? অনেকেই হয়তো ভাববে, ‘হাঙর! বিপদ!’

সিনেমা আর গল্পের কারণে আমরা হাঙরকে প্রায়ই সমুদ্রের মহাশক্তিধর প্রাণী মনে করি। কিন্তু বাস্তবের গল্পটা একেবারেই অন্য রকম।

Visit sportnewz.click for more information.

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টার্স করার সময় আমি বেঙ্গল এলাসমো ল্যাবের (Bengal Elasmo Lab) হয়ে হাঙর আর শাপলাপাতা মাছ নিয়ে গবেষণার কাজ করেছি। একবার কক্সবাজারে কয়েক সপ্তাহের জন্য ফিল্ডওয়ার্কে গিয়েছিলাম। প্রতিদিন ভোরে মাছঘাটে যেতাম। চারপাশে ব্যস্ত জেলে, বরফের বাক্স, মাছের গন্ধ আর মানুষের ভিড়। সেখানেই আমি খুঁজছিলাম এক অদ্ভুত প্রাণীকে, যার নাম গিটারফিশ। বাংলায় একে বলে পীতাম্বরী।

প্রথমবার যখন সেটাকে দেখলাম, আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম।

প্রাণীটা যেন দুই জগতের মিশ্রণ! মাথার অংশটা দেখতে অনেকটা গিটারের মতো চওড়া, কিন্তু শরীরটা আবার হাঙরের মতো লম্বা। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি যেন নিজের খেয়ালে নতুন একটা ডিজাইন বানিয়ে ফেলেছে।

আসলে পীতাম্বরী, শাপলাপাতা মাছ আর হাঙর অনেকটা একই পরিবারের আত্মীয়। বিজ্ঞানীরা এদের বলেন কার্টিলাজিনাস মাছ বা তরুণাস্থিযুক্ত মাছ।

এখানেই আছে আরেকটি মজার তথ্য। তুমি হয়তো ভাবছ, হাঙর বা শাপলাপাতা মাছের শরীরে নিশ্চয়ই হাড় আছে? আসলে না। এদের দেহগঠন মানুষ বা অন্য মাছের মতো শক্ত হাড় দিয়ে তৈরি নয়। তাদের শারীরিক কাঠামো তৈরি হয়েছে বিশেষ ধরনের নমনীয় তরুণাস্থি বা কার্টিলেজ দিয়ে। আমাদের নাক বা কানের যে অংশটা একটু নরম, সেটাও কার্টিলেজ দিয়ে তৈরি। এ কারণে এরা তুলনামূলক হালকা হয় এবং দ্রুত সাঁতার কাটতে পারে।

চিতল মাছের কালো দাগ কী সুবিধা দেয়

আরেকটি অবাক করা তথ্য হলো, হাঙর পৃথিবীতে এসেছে ডাইনোসরেরও অনেক আগে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, হাঙরের পূর্বপুরুষেরা প্রায় ৪০ কোটি বছর আগে পৃথিবীর সমুদ্রে সাঁতার কাটত। অর্থাৎ ডাইনোসর পৃথিবীতে আসার অনেক আগেই হাঙর ছিল। এমনকি ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়ে গেলেও হাঙর টিকে আছে আজও।

সমুদ্রের ঘোলা পানিতে শুধু চোখ দিয়ে শিকার খুঁজে পাওয়া সহজ নয়। তাই হাঙরের আছে একধরনের ‘সুপারপাওয়ার’। জীবন্ত প্রাণীর শরীর থেকে বের হওয়া ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক সংকেত এরা অনুভব করতে পারে। বিজ্ঞানীরা একে বলেন ইলেকট্রোরিসেপশন (Electroreception)। এই বিশেষ ইন্দ্রিয় অনেক সময় এদের শিকার খুঁজে পেতে সহায়তা করে।

কক্সবাজারের টেকনাফ উপকূলে ধরা পড়া বিশাল আকৃতির শাপলাপাতা মাছ

শাপলাপাতা মাছের গল্পও কম মজার নয়। এই মাছকে দেখলে মনে হয় এরা পানির নিচে উড়ছে। এদের চওড়া পাখনার মতো শরীর ধীরে ধীরে নাড়িয়ে এরা সাঁতার কাটে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শাপলাপাতা মাছগুলোর মধ্যে ম্যান্টা রে অন্যতম। এদের ডানার বিস্তার কখনো কখনো সাত মিটারের বেশি হতে পারে। অর্থাৎ একটি ছোট গাড়ির সমান! বাংলাদেশের সমুদ্রে শুধু শাপলাপাতা মাছই নয়, এদের আরও কিছু অদ্ভুত আত্মীয়ও আছে। এর মধ্যে অন্যতম করাত মাছ ও হাতুড়ি মাছ। নামের কারণ নিশ্চয়ই এখন বুঝতে পারছ।

এদের মুখের সামনের অংশটা দেখতে বিশাল এক করাতের মতো। সেই করাতের দুই পাশে থাকে ধারালো দাঁতের সারি। এই বিশেষ অঙ্গ দিয়ে তারা বালুর নিচে লুকিয়ে থাকা শিকার খুঁজে বের করে।

বাংলাদেশের সমুদ্রে একসময় তিন প্রজাতির করাত মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমানে এরা পৃএক্সথিবীর সবচেয়ে বিপন্ন মাছগুলোর মধ্যে রয়েছে।

হাতুড়ি মাছ একধরনের হাঙর। এদের মাথা অনেকটা হাতুড়ির মতো। এদের চওড়া মাথার দুই পাশে চোখ থাকায় এরা অন্য হাঙরের তুলনায় ভালো দেখতে পায়। বাংলাদেশে তিন প্রজাতির হাতুড়ি হাঙর দেখা যায়।

কয়েক বছর আগে বাংলাদেশের সমুদ্র থেকে বিজ্ঞানীরা একটি নতুন প্রজাতির গিটারফিশ শনাক্ত করেন। এর নাম বাংলাদেশি গিটারফিশ (Glaucostegus younholeei)। পৃথিবীর অন্য কোথাও নয়, প্রথমে বাংলাদেশের উপকূল থেকেই এর তথ্য পাওয়া যায়।

অনেকেই মনে করে হাঙর শুধু অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা কিংবা হলিউডের সিনেমাতেই দেখা যায়। কিন্তু সত্যি হলো, বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরেও নানা ধরনের হাঙর ও শাপলাপাতা মাছ বাস করে। কক্সবাজার, টেকনাফ, সেন্ট মার্টিন, কুয়াকাটা এবং সুন্দরবন উপকূলের আশপাশের সমুদ্র এলাকায় নিয়মিত এদের বিভিন্ন প্রজাতি দেখা যায়। গবেষকেরা বাংলাদেশে প্রায় ১০০–এর বেশি প্রজাতির হাঙর, শাপলাপাতা, গিটারফিশ ও তাদের আত্মীয়দের তথ্য পেয়েছেন।

স্পাইডার-ম্যানের মতো দেখতে গিরগিটি এখন কেন ভাইরাল

দুঃখের বিষয় হলো, এদের অনেকেই আজ বিপদের মুখে। হলিউডের সিনেমা দেখে তোমাদের অনেকেরই মনে হতে পারে, হাঙর মানেই আক্রমণাত্মক প্রাণী। কিন্তু বাস্তবের চিত্রটা একেবারেই ভিন্ন। পৃথিবীতে ৫০০–এর বেশি প্রজাতির হাঙর রয়েছে, যার বেশির ভাগই মানুষের প্রতি কোনো আগ্রহ দেখায় না। হাতে গোনা কয়েকটি প্রজাতি তখনই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, যখন মানুষ তাদের নিজস্ব নিরাপদ আবাসস্থলে অনুপ্রবেশ করে। মূলত এটি এদের একটি সহজাত আত্মরক্ষামূলক আচরণ।

সমুদ্রের এই প্রাণীদের আচরণ সম্পর্কে সঠিক সচেতনতা বজায় রাখলে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সহজেই এড়ানো সম্ভব। সত্যি বলতে কি, মানুষের জন্য হাঙর যতটা বিপজ্জনক, তার চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকিতে আছে হাঙরেরা আমাদের কারণে। হাঙর ও শাপলাপাতা মাছ খুব ধীরে বড় হয়। এরা মাছ হলেও বেশির ভাগ প্রজাতিই মানুষের মতো জীবন্ত বাচ্চা জন্ম দেয়। অনেক প্রজাতি বাচ্চা দিতে শুরু করতে কয়েক বছর সময় নেয়। এরা আবার একবারে খুব বেশি বাচ্চাও দেয় না। ফলে এদের সংখ্যা কমে গেলে আবার আগের অবস্থায় ফিরতে অনেক সময় লাগে।

শেড অ্যাকুয়ারিয়ামে জেব্রা হাঙর

অতিরিক্ত মাছ ধরা, দুর্ঘটনাবশত জালে আটকা পড়া, সমুদ্রদূষণ, উপকূলীয় পরিবেশের ক্ষতি এবং অবৈধ বাণিজ্যের কারণে আজ পৃথিবীর অনেক হাঙর ও শাপলাপাতা মাছ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ভেষজ বা প্রথাগত ব্যবহারের কারণেও এদের শরীরের অংশ সংগ্রহ করা হয়। কিছু দেশে হাঙরের পাখনার স্যুপ খাওয়ার প্রচলন রয়েছে।

এখন তুমি ভাবতে পারো, এগুলো সংরক্ষণের প্রয়োজন কী? প্রশ্নটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একটি সুস্থ বাস্তুতন্ত্রে প্রতিটি প্রাণীর ভূমিকা থাকে। সমুদ্রে হাঙর ও শাপলাপাতা মাছ অনেকটা সেই ভারসাম্য রক্ষাকারী হিসেবে কাজ করে। তারা অসুস্থ বা দুর্বল প্রাণীদের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পুরো সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলকে সুস্থ রাখে। যদি এদের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়, তবে খাদ্যজালে ভারসাম্যহীনতা দেখা দিতে পারে, যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন ‘ট্রফিক ক্যাসকেড’ (Trophic Cascade)। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত আমাদের ওপরও পড়তে পারে। কারণ, আমরা যে সামুদ্রিক মাছের ওপর নির্ভরশীল, এরা এই খাদ্যজালেরই অংশ।

অর্থাৎ হাঙরকে রক্ষা করা মানে শুধু একটি প্রাণীকে রক্ষা করা নয়; বরং পুরো সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রকে সুস্থ রাখা। কক্সবাজারের সেই মাছঘাটে দাঁড়িয়ে গিটারফিশটাকে প্রথম দেখার মুহূর্তটা আমি এখনো ভুলিনি। তখন মনে হয়েছিল, আমরা যেন পৃথিবীর এক গোপন প্রাণীর মুখোমুখি হয়েছি। অথচ এই প্রাণীগুলো আমাদের দেশের সমুদ্রেই বাস করে। ঢেউয়ের নিচে, চোখের আড়ালে তারা কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবীর সমুদ্রের গল্প বয়ে নিয়ে চলেছে।

হয়তো একদিন তোমাদের মধ্যেই কেউ হবে সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী, সমুদ্র গবেষক বা সংরক্ষণকর্মী। হয়তো বাংলাদেশের কোনো নতুন হাঙর বা রে প্রজাতির রহস্য উন্মোচন করবে সেই মানুষটিই। সমুদ্রের এই রহস্যময় পাহারাদারদের সম্পর্কে জানা আর তাদের রক্ষা করা শুধু বিজ্ঞানীদের কাজ নয়, আমাদের সবার দায়িত্ব।

শিং মাছের কাঁটায় ব্যথা লাগে কেন

Read full story at source