প্রবাসীর জীবনবোধ

· Prothom Alo

জীবনের ৪০ বছর পেরিয়ে এসে মনে হয় এক–একটা দিন বেঁচে থাকাটাই বোনাস। কোভিডের সময় কত বন্ধুবান্ধব মারা গেল। এরপরও মৃত্যুর মিছিল থেমে নেই। সমবয়সী থেকে শুরু করে জুনিয়র অনেকেই অনেক কারণে মারা যাচ্ছে। এগুলো যখন শুনি তখন ওদের জন্য খারাপ লাগার পাশাপাশি নিজেকে অনেক সৌভাগবানও মনে হয়। জীবনের লক্ষ্যই হচ্ছে মৃত্যু। মৃত্যুতেই জীবনের পূর্ণতা। আমি একদিন ছিলাম না আবার একদিন নাই হয়ে যাব; কিন্তু এই মহাবিশ্ব এবং পৃথিবী ঠিকই থেকে যাবে। এমনকি শখ করে মানুষ তার বিলাসব্যসনের জন্য যেসব সুযোগ–সুবিধা তৈরি করে, সেগুলোও থেকে যাবে; কিন্তু সেই মানুষটা থাকবে না।

Visit freshyourfeel.org for more information.

আমি তাই যখনই কোনো পুরোনো ইমারতের পাশ দিয়ে হেঁটে যায় সেটাকে ছুঁয়ে দেখি। অস্ট্রেলিয়াতে অনেক পুরোনো ইমারতকে ‘হেরিটেজ’ হিসেবে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। এক শ, দেড় শ বছরের পুরোনো সেগুলো। এগুলোর দিকে তাকালেই মনে হয় কত মানুষ ছিলেন, যাঁরা এটার সুবিধাভোগী ছিলেন। এখন তাঁদের কেউ নেই। আমিও একদিন থাকব না। আর আছে অনেক বয়সী গাছ। সেই গাছগুলোকেও আমি ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখি আর ভাবি পৃথিবীর কত উত্থান–পতনের সাক্ষী এরা। একটা কচ্ছপও নাকি কয়েক শ বছর বাঁচে; কিন্তু মানুষের আয়ু সর্বসাকল্যে শ খানেক বছর। হাজার বছর বয়সী এই পৃথিবীর কতটুকু ইতিহাসেরই–বা আমরা অংশ হতে পারি। মানবসভ্যতার লেখাপড়ার ইতিহাসও তো খুব বেশি পুরোনো না।

জীবনকে কতজন কতভাবেই না ব্যাখ্যা করেন। আমি কারোটাকেই খাটো করে দেখি না বা একেবারে ফেলে দিই না। কারণ প্রত্যেকেরই জীবন অভিজ্ঞতা আলাদা। তিনি যেই জীবন যাপন করেছেন, সেই জীবন তো অন্য একজন যাপন করেননি। তাই জীবন নিয়ে সবার মতবাদ এক হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। একজনের জীবনে দোষ থাকবে, গুণ থাকবে, হাসি থাকবে, কান্না থাকবে। থাকবে অনেক নেগেটিভিটিও। সেই মানুষটার গালাগাল করার যেমন স্বাধীনতা থাকবে, তেমনি থাকবে সংগীত সৃষ্টির স্বাধীনতাও। আর অবশ্যম্ভাবী হিসেবে থাকবে অজ্ঞতা বা অপূর্ণতা। যখনই কোনো মানুষ চিন্তা করবেন তিনি জীবনের সবকিছু জেনে ফেলেছেন বা পেয়ে গেছেন, তখনই তাঁর কাছে জীবন হয়ে যাবে একঘেয়ে, বিরক্তির এবং জটিল বোঝার মতো।

প্রবাসে এসে এটা আরও হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। এখানে তো এসেছিলাম আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তার আশায়। এখন যখন এগুলোর নিশ্চয়তা পেয়ে গেছি, তখন পেছন ফিরে দেখলে টের পাওয়া যায় কী কী হারিয়েছি। হারিয়েছি ছোটবেলার আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের। পরবর্তী প্রজন্ম হারাচ্ছে পূর্ববর্তী প্রজন্মের স্নেহ এবং আদর। এখন যোগাযোগ তো হাতের মুঠোয় কিন্তু চাইলেই আমি আমার মা–বাবাকে জড়িয়ে ধরতে পারি না। পারি না বন্ধুদের সঙ্গে খুনসুটিতে মেতে উঠতে। সংসারের ঝগড়া–বিবাদ মেটানোর জন্য আমাদের বাবা, মা, দাদা, দাদি, নানা, নানি চাইলেই এগিয়ে আসতে পারে না। বাচ্চারা বড় হচ্ছে কোল ছাড়া। এতে করে মানবিক অনুভূতি তৈরি হওয়ার সুযোগ থেকে তারা থাকছে বঞ্চিত। তারা দিন দিন হয়ে উঠছে এক একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

প্রবাসে সবকিছু পাওয়া হয়ে গেলে জীবন যখন বিরক্তির (বোরড) হয়ে যায় তখন তাদের মধ্যে এক একটা ক্ষুধা, নেশা, বাতিক (হুজুগ) তৈরি হয়। অনেকটা আমাদের ছোটবেলায় দেখা ‘বাঁদর খেলা’র মতো। মাদারী যেই বলতেন এবার একটু নতুন বউয়ের মতো লজ্জা পেয়ে দেখাও; তখনই বানরটা সেইভাবে লজ্জা পেয়ে দেখাত। আবার বলতেন এবার একটু দেখাও জামাই কীভাবে মিষ্টির হাঁড়ি নিয়ে শ্বশুরবাড়ি যায়। বানরটা তৎক্ষণাৎ সেটা করে দেখাত। প্রবাসে মানুষদের জীবন একটা সময় পরে এই বানরদের মতো হয়ে যায়। কেউ একজন অদৃশ্যভাবে কলকাঠি নাড়েন আর মানুষ তার স্বভাবের সঙ্গে যায় না, এমন সব কর্মকাণ্ড শুরু করেন। এভাবে লাফালাফি করতেই করতেই একসময় মৃত্যুর মুখে পতিত হন।

জীবনের সব পাওয়া হয়ে গেলে সবাই নিজেকে এক একজন তারকা (সেলিব্রেটি) ভাবতে শুরু করেন এবং কে কার চেয়ে বড় তারকা, সেই প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েন। এটা একসময় খুবই দৃষ্টিকটু হয়ে দেখা দেয়। নিজের বাড়ি, গাড়ি, পোশাক, অলংকার থেকে শুরু ছেলেমেয়েদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয়ে তাদের অর্জনও যেন তারকা হওয়ার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়। এর বাইরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কার কত অনুসারী, কাকে নিয়ে বেশি মাতামাতি হচ্ছে, সেটাও একটা মাপকাঠি। প্রবাসের সবাই একসময় হয়ে ওঠেন সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতা, অনুষ্ঠান আয়োজনকারী। এ ছাড়া মানুষকে সাহায্য–সহযোগিতা করার নামে কত রকমের পেজ যে আছে। এতে যাদের আসলেই সাহায্য দরকার, তাদের অবশ্য কাজে লাগে সামান্যই। কারণ, যাঁরা প্রকৃত অর্থে সাহায্য করেন তাঁরা লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

প্রবাসীর বিলাসিতা

এ ছাড়া আরও হাজার রকমের বিলাসিতা চরিত্রের মধ্যে যোগ হয়, যেটা নিয়ে এর আগে লিখেছি। আর এই বিলাসিতার পাশাপাশি তখন দৈন্যও প্রকাশ পেয়ে যায়। সেগুলো নিয়েও লিখেছি। তবে মোটাদাগে দিন শেষে সব বিলাসিতা এসে শেষ হয় খাওয়াদাওয়াতে। এদের যে কত রকমের ক্ষুধা। এত এত খাবার খায় কিন্তু এদের ক্ষুধা আর নিবৃত হয় না। কোথাও বেড়াতে যাবে সেই আয়োজনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো খাবারের আয়োজন। বলা বাহুল্য, বেড়ানোটা আর তখন মুখ্য থাকে না। যেকোনো অনুষ্ঠানে কে কার চেয়ে কত বেশি পদ পরিবেশন করতে পারেন, সেটা নিয়েও চলে এক নীরব প্রতিযোগিতা। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এসব আয়োজনে কেউ যদি ভুল করে খেতে ভুলে যান, তাহলে তাঁর ভাগ্যে খাবার জুটবে না কারণ তার আগেই সবাই প্রতিযোগিতা করে সব খেয়ে ফেলেছেন।

লেখা শুরু করেছিলাম জীবনের কোলাহল শিরোনামে, সেটা এসে শেষ হলো প্রবাসীদের কুৎসা রটনায়। আসলে মানুষ দিন শেষে তার যাপিত জীবনের কাছেই ফিরে আসে। আমারও সেই দশা হলো। কথায় বলে যেই রোগের যেই ওষুধ। তবে প্রবাসে এসব কোলাহলের বাইরেও অনেক মানুষ বসবাস করেন। তাঁদেরকে না পাওয়া যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে না পাওয়া যায় বাস্তবে। কারণ, তাঁরা নিভৃতচারী। তাঁরা জীবনের গূঢ় অর্থ হয়তোবা বুঝে গেছেন। তাঁরা হয়তোবা বুঝে গেছেন জীবনের সব আয়োজনের শেষ হচ্ছে শূন্যতায়। যেখান থেকে আগমন হয়তোবা সেখানেই ফিরে যাওয়া। তবে প্রচারসর্বস্ব এখনকার পৃথিবীর দিকে তাকালে মনে হয় জীবন যেন আর যাপনের না; বরং বেশি বেশি প্রচারের। তারই সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রবাসীরাই–বা কেন পিছিয়ে থাকবেন।

বিদেশে আমাদের দীনতা

Read full story at source