পৃথিবীর সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষ কোথায় বাস করে
· Prothom Alo

পৃথিবীর প্রায় ১০টি দেশে এমন কিছু আদিবাসী বা জনগোষ্ঠী বাস করে, যারা বাইরের দুনিয়ার মানুষের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখে না। তারা আধুনিক সমাজ থেকে অনেক দূরে। একদম নিজেদের মতো করে বাস করে। এই মানুষগুলোর মধ্যে একটি দল তো আরও অদ্ভুত। তারা যখন বন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হেঁটে যায়, তখন পেছনে নিজেদের পায়ের ছাপ পর্যন্ত মুছে ফেলে। তারা এমনটা করে কারণ, তারা চায় না বাইরের কোনো মানুষ কোনোভাবে তাঁদের খুঁজে বের করুক।ক
আজকের দিনে ইন্টারনেটের সাহায্যে আমরা সবাই সবার সঙ্গে সহজেই যুক্ত থাকতে পারি। তাই শুনে অবাক লাগলেও সত্যি পৃথিবীতে আজও এমন হাজার হাজার মানুষ আছেন, যাঁরা বাইরের দুনিয়া থেকে একদম আলাদা জীবন কাটান।
Visit milkshake.it.com for more information.
এই অদ্ভুত আর রহস্যময় মানুষগুলোর কথা আছে ‘সবুজ দ্বীপের রাজা’ সিনেমায়। বিখ্যাত লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা কাকাবাবুর রোমাঞ্চকর গল্প থেকে তৈরি হয়েছে এই সিনেমা। বঙ্গোপসাগরের আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের জারোয়া নামের এক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন থেকে লেখা হয়েছিল এই গল্প।
তবে বাস্তবেও এই পৃথিবীতে এমন বেশ কিছু আদিবাসী ও বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠী রয়েছে, যারা বাইরের আধুনিক সমাজ থেকে নিজেদের পুরোপুরি আলাদা রেখে চলেছে হাজার বছর ধরে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, সারা বিশ্বে অন্তত ১৯৬টি জনগোষ্ঠী রয়েছে, যারা বাইরের মানুষদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখে না। এরা মূলত ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া ও ভারতের মতো প্রায় ১০টি দেশের গহিন জঙ্গল, নির্জন দ্বীপ বা মরুভূমিতে বাস করে।
গাড়ির ইঞ্জিনে আটকে পড়া বিড়ালছানা উদ্ধার, দত্তক নিতে চান শত শত মানুষতবে এদের সবার থাকার ধরন একরকম নয়। কেউ কেউ কাছের অন্য আদিবাসীদের সঙ্গে মাঝে মাঝে দেখা করে। আবার অনেককে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাইরের মানুষের মুখোমুখি হতে হয়। কারণ, বড় বড় কোম্পানি কাঠ কাটা, তেল বা খনি থেকে সম্পদ তোলার জন্য তাদের বন জঙ্গল দখল করে নিচ্ছে।
এতসব জানার পর স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে, এই মানুষদের মধ্যে পৃথিবীর সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন বা একা মানুষেরা আসলে কারা?
আন্দামানের আদিবাসী জারোয়া সম্প্রদায়বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, পৃথিবীর সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠী কারা এই প্রশ্নের এক কথায় সঠিক উত্তর দেওয়া বেশ কঠিন। কারণ, কোনো একটা দলকে যোগাযোগহীন বলার নির্দিষ্ট কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। একেক সংস্থা এদের একেক নামে ডাকে। এই যেমন স্বেচ্ছায় বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠী, লুকানো জনগোষ্ঠী বা অদৃশ্য জনগোষ্ঠী।
সারভাইভাল ইন্টারন্যাশনালের গবেষক হ্যাল রাসেল জানান, যোগাযোগহীন জনগোষ্ঠী বলতে মূলত সেইসব মানুষকে বোঝায়, যারা বাইরের জগৎ সম্পর্কে জানা সত্ত্বেও অন্য কোনো মানুষের সঙ্গে স্থায়ী সম্পর্ক রাখে না এবং সবাইকে এড়িয়ে চলে। মূলত নিজেদের ঐতিহ্য ও আলাদা জীবনধারা টিকিয়ে রাখতেই তারা অন্যান্য সব সংস্কৃতির মানুষ থেকে নিজেদের দূরে রাখে। সোজা কথায়, তারা কারও মাধ্যমে বিরক্ত হতে চায় না।
এমনই একটি দল হলো সেন্টিনেলিজ জনগোষ্ঠী। তারা বঙ্গোপসাগরের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের উত্তর সেন্টিনেল দ্বীপে বাস করে। তারা নিজেদের কী নামে ডাকে, তা নৃবিজ্ঞানীরাও জানেন না। দ্বীপের নাম অনুসারেই তাদের সেন্টিনেলিজ বলা হয়। প্রায় ২৩ বর্গমাইলের এই দ্বীপে তাঁরা বাস করছে।
পিঁপড়ার পথ খোঁজার কৌশল গবেষণা করে বের করেছে ১৩ বছরের শিক্ষার্থীধারণা করা হয়, তারা প্রায় ৫৫ হাজার বছর ধরে এই দ্বীপে আছে। সেন্টিনেলিজরা শিকার করে ও ফলমূল কুড়িয়ে জীবন চালায়। তারা কাঠ দিয়ে হাতে তৈরি ছোট নৌকা দিয়ে উপকূলে মাছ ধরে। সারভাইভাল ইন্টারন্যাশনালের অনুমান, তাদের দলে ৫০ থেকে ১৫০ জন মানুষ থাকতে পারে। তবে তাদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয় বলে সঠিক জনসংখ্যা গণনা করা অসম্ভব।
তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা প্রায় অসম্ভব দুটি কারণে। প্রথমত, তাদের দ্বীপটি খুবই দুর্গম। দ্বিতীয়ত, তারা নিজেরাই বাইরের কারও সঙ্গে দেখা করতে চায় না। কোনো নৌকা বা হেলিকপ্টার তাদের দ্বীপের কাছে গেলে তারা তির ধনুক ছুড়ে তা তাড়া করে।
সেন্টিনেলিজরা শিকার করে ও ফলমূল কুড়িয়ে জীবন চালায়। তারা কাঠ দিয়ে হাতে তৈরি ছোট নৌকা দিয়ে উপকূলে মাছ ধরেসেন্টিনেলিজরা তির-ধনুক ছুড়ে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, তারা কারও সঙ্গে যোগাযোগ চায় না। তাদের জীবন ও বহিরাগত ব্যক্তিদের নিরাপত্তা রক্ষায় ভারত সরকার এই দ্বীপে যাওয়া নিষিদ্ধ করেছে। সেন্টিনেলিজরা অন্তত তিনজনকে তির ছুড়ে হত্যা করেছে। তাঁদের মধ্যে জন অ্যালেন চাউ নামের একজন ধর্মপ্রচারক ছিলেন, যিনি ২০১৮ সালে বেআইনিভাবে ওই দ্বীপে গিয়েছিলেন।
আবার যোগাযোগহীন আদিবাসীদের বেশির ভাগই আমাজনে অববাহিকায় বাস করে। মধ্য পেরুর আমাজনের কাকাতাইবো জনগোষ্ঠী এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। এরা নিজেদের লুকিয়ে রাখতে এত মরিয়া যে বন-জঙ্গলে হাঁটার পর মাটি দিয়ে পায়ের ছাপ পর্যন্ত মুছে ফেলে। ফলে তাদের সম্পর্কে খুব বেশি জানা সম্ভব হয়নি। এটি মূলত নিজেদের রক্ষা করার একটি কৌশল। অতীতে বাইরের মানুষের সঙ্গে তাদের দেখা হয়েছিল, তবে সেই অভিজ্ঞতাগুলো মোটেও ভালো ছিল না।
এমনই আরেকটি বিচ্ছিন্ন দল হলো কাওয়াহিভা। আর এরা এতটাই আড়ালে থাকে যে মাত্র একটি ভিডিওর ওপর ভিত্তি করে ১৯৯৯ সালে তাঁদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কোনো দল একেবারে নথিভুক্ত না থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এমনকি ব্রাজিলের মতো কড়া নজরদারির দেশেও ২০২১ সালে এমন এক নতুন জনগোষ্ঠীর সন্ধান মেলে, যারা এতদিন কর্তৃপক্ষের চোখ ফাঁকি দিয়ে চলছিল। তাঁদের নামও জানা যায়নি।
যোগাযোগহীন আদিবাসীদের বেশির ভাগই আমাজনে অববাহিকায় বাস করেএ ছাড়া পেরুর গহিন বনের মাশকো পিরো গোষ্ঠী হলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় যোগাযোগহীন দল, যাদের সদস্যসংখ্যা প্রায় ৭৫০। ১৮০০ সালে আমাজনের রাবার খামারে দাস হিসেবে আটকে রাখা কিছু মানুষ সেখান থেকে পালিয়ে গহিন জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছিল। আজকের মাশকো পিরোরা মূলত তাদেরই বংশধর।
জাতিসংঘের আইন অনুযায়ী, প্রতিটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। গবেষকদের মতে, তারা এই অধিকারটাই কাজে লাগায়। যখন ইচ্ছা হয় তখন বাইরের মানুষের সঙ্গে দেখা করে, আর পছন্দ না হলে দূরে সরে থাকে। তাদের কাছে যোগাযোগের ব্যবস্থা নেই এমনটা ভাবা ভুল। নিজেদের দ্বীপ ছেড়ে নৌকায় করে অন্য কোথাও চলে যাওয়া খুব কঠিন কিছু নয়। তারা যে যোগাযোগ করছে না, সেটা সম্পূর্ণ তাদের নিজেদের সচেতন সিদ্ধান্ত।
সূত্র: লাইভ সায়েন্সহাঙর, শাপলাপাতা আর পীতাম্বরী মাছ যেভাবে সমুদ্র রক্ষা করে