এসএসসিতে যারা পাস করতে পারেনি, তাদের পাশে দাঁড়ানো জরুরি : মোস্তাফিজুর রহমান

· Prothom Alo

এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর কারও ঘরে আনন্দ, কারও ঘরে হয়তো নিঃশব্দ কান্না। কেউ জিপিএ-৫ পাওয়ার আনন্দে মা-বাবাকে জড়িয়ে ধরছে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জীবনের একটি স্মরণীয় মুহূর্ত ভাগ করে নিচ্ছে। এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ সব শিক্ষার্থীকে অভিনন্দন।

কিন্তু এই আনন্দের ছবির ঠিক উল্টো পাশে আরেকটি ছবি আছে। সেখানে হয়তো একটি কিশোর বা কিশোরী ঘরের এক কোণে মুখ গোমড়া করে বসে আছে। চোখে পানি, মনে প্রশ্ন—পরিবার কী বলবে, বন্ধুরা কী ভাববে, আত্মীয়স্বজনের সামনে মুখ দেখাবে কীভাবে, সামনে তার কী হবে?

Visit sweetbonanza-app.com for more information.

এসএসসিতে শহর–মফস্‌সলের ফলাফলে এত ফারাক কেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা কী

দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর বিদ্যালয়ে পড়াশোনার পর এবার বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি। তাদের প্রত্যেকের পেছনে আছে একটি মুখ, একটি পরিবার এবং অনেক স্বপ্ন। তাই ফলাফল নিয়ে আলোচনার শুরুতেই আমার প্রশ্ন—তাদের ব্যর্থতার দায় কি শুধুই তাদের?

এবার ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার কমে দাঁড়িয়েছে ৬৪ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশে। আর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা মিলিয়ে গড় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ, যা গত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো, এসএসসি ও সমমানের তিন ধারায় মিলিয়ে ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি।

বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে শুধু ‘ফেল করা শিক্ষার্থী’ হিসেবে চিহ্নিত করে আমরা কি দায় এড়িয়ে যেতে পারি? একটি শিশু প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর এসএসসি পর্যন্ত প্রায় এক দশক আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে থাকে। এ সময়ে তাকে শেখানোর দায়িত্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকের। উপযুক্ত শিক্ষক, পাঠ্যক্রম, অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ ও পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের; তাকে উৎসাহ দেওয়া এবং শেখার পরিবেশ তৈরির দায়িত্ব পরিবারের। তাহলে ১০ বছর পর সেই শিশু যদি কাঙ্ক্ষিত শিখনদক্ষতা অর্জন করতে না পারে, তার ব্যর্থতা একা তার হয় কী করে?

মো. মোস্তাফিজুর রহমান, শিক্ষা গবেষক ও গণসাক্ষরতা অভিযানের উপপরিচালক

এবারের ফলাফলে ইংরেজি ও গণিতের দুর্বলতা বিশেষভাবে সামনে এসেছে। কিন্তু ইংরেজি বা গণিতের এই দুর্বলতা কি দশম শ্রেণিতে হঠাৎ তৈরি হয়েছে? একটি শিশু যদি প্রাথমিক পর্যায়ে ঠিকমতো পড়তে, বুঝতে বা মৌলিক গাণিতিক সমস্যা সমাধান করতে না শেখে, তাহলে নবম-দশম শ্রেণিতে এসে কয়েক মাসের পরীক্ষার প্রস্তুতি দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করা কঠিন।

এখন খুব সহজেই প্রশ্ন উঠতে পারে—তাহলে শিক্ষকেরা কী করেছেন? শিক্ষকের জবাবদিহি অবশ্যই থাকতে হবে। কিন্তু শিক্ষকদের শুধু কাঠগড়ায় দাঁড় করালেই কি আমাদের দায়িত্ব শেষ? আমরা তাঁদের কাছ থেকে মানসম্মত শিক্ষা চাই। কিন্তু তাঁদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, একাডেমিক সহায়তা, সামাজিক মর্যাদা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও পেশাগত প্রণোদনা কতটা দিতে পেরেছি?

শিক্ষকসংকট, পাঠদানের ধারাবাহিকতা, শিক্ষার্থীর উপস্থিতি, দীর্ঘদিনের শিখনঘাটতি, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা এবং পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ—সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাব অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।

বিশেষভাবে অনুসন্ধান প্রয়োজন সেই ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে, যেখান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। একটি বিদ্যালয়ের সব পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হলে সেটি শুধু পরীক্ষার্থীর ব্যর্থতা হতে পারে না। সেখানে শিক্ষক ছিলেন কি না, নিয়মিত পাঠদান হয়েছে কি না, শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে উপস্থিত ছিল কি না, প্রধান শিক্ষক ও ব্যবস্থাপনা কমিটি কী করেছেন, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তাদের তদারকি কেমন ছিল—প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।

আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার। প্রমাণ ছাড়া কোনো পরীক্ষার্থীর নম্বর বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ করা ঠিক হবে না। কিন্তু আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে পাসের হার ও জিপিএ-৫-এর সংখ্যাকে শিক্ষার সাফল্যের প্রধান সূচক হিসেবে তুলে ধরার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল। কতজন সত্যিকার অর্থে শিখল, তার চেয়ে কতজন পাস করল—সেটিই যেন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।

এবার পাসের হার কমেছে বলেই মূল্যায়ন শতভাগ সঠিক হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যাবে না। প্রয়োজন বিষয়ভিত্তিক, বোর্ডভিত্তিক ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলের গভীর বিশ্লেষণ। প্রশ্নপত্রের কঠিনতার মাত্রা, পাঠ্যক্রমের সঙ্গে প্রশ্নের সামঞ্জস্য এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নে ধারাবাহিকতা ছিল কি না, সেটিও দেখতে হবে। সঠিক মূল্যায়ন মানে বেশি নম্বর দেওয়া নয়, আবার কঠোরভাবে নম্বর কেটে নেওয়াও নয়। একজন শিক্ষার্থী সত্যিকার অর্থে যতটুকু শিখেছে, তার যথাযথ প্রতিফলনই সঠিক মূল্যায়ন।

এখন প্রয়োজন দোষী খোঁজা নয়, সমাধান খোঁজা। সরকারের উচিত দ্রুত একটি বিস্তারিত ‘পোস্ট-রেজাল্ট অ্যানালাইসিস’ করা। কোন বিষয়ে, কোন অঞ্চলে এবং কোন ধরনের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বেশি পিছিয়েছে, তা চিহ্নিত করতে হবে। ইংরেজি ও গণিতসহ দুর্বল বিষয়গুলোয় বিশেষ সহায়ক শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে হবে। শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য পৃথক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, একাডেমিক সহায়তা ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

একাদশে ভর্তিতে এবারও পরীক্ষা নেই, আবেদন ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে

তবে এখন সবচেয়ে জরুরি তাদের পাশে দাঁড়ানো, যারা পাস করতে পারেনি। অভিভাবকদের প্রতি অনুরোধ—আজ সন্তানকে বকবেন না, অপমান করবেন না, পাশের বাড়ির সন্তান কিংবা তার বন্ধুর সঙ্গে তুলনা করবেন না। একটি পরীক্ষার ফল দিয়ে একটি মানুষের সামর্থ্য কিংবা ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় না। তার পাশে বসুন। তার কথা শুনুন। তাকে বলুন, ‘তুমি আবার চেষ্টা করবে, আমরা তোমার পাশে আছি।’

বিদ্যালয়ও দায়িত্ব এড়াতে পারে না। অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য কাউন্সেলিং, বিষয়ভিত্তিক সহায়তা ও পুনঃপ্রস্তুতির ব্যবস্থা করতে হবে। সমাজকেও তাদের ‘ব্যর্থ’ হিসেবে চিহ্নিত করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

অকৃতকার্য? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু শিক্ষার্থীকে নয়, রাষ্ট্রকে, বিদ্যালয়কে, শিক্ষককে, পরিবারকে এবং সমাজের সুবিধাভোগী নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রত্যেককেই দিতে হবে।

*লেখক: ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান, শিক্ষা গবেষক ও গণসাক্ষরতা অভিযানের উপপরিচালক

Read full story at source