আমেরিকার কলাম্বিয়া রিভার গর্জ: নিসর্গ ও ভূপ্রকৃতির অপূর্ব সম্মিলন
· Prothom Alo
আমেরিকার ওরিগন অঙ্গরাজ্যের প্রশান্ত মহাসাগর সৈকত ভ্রমণের উদ্দেশ্যে জুলাইয়ের এক সুন্দর রৌদ্রোজ্জ্বল সকালে ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের রিচল্যান্ড থেকে স্ত্রী নাসরীন, মেয়ে সাদিয়া, মেয়েজামাই ফাহাদসহ সড়কপথে রওনা হলাম। আগেই জেনেছি আমাদের যাত্রাপথের একটা অংশ কলাম্বিয়া নদী গর্জের ভেতরে পড়বে, তাই আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকি। উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান এ নদীটি প্রশান্ত মহাসাগর অভিমুখী যাত্রাপথের কিছুটা গর্জের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে, যা কলাম্বিয়া রিভার গর্জ নামে পরিচিত।
Visit milkshake.it.com for more information.
রিভার গর্জ বা নদীর গিরিখাত হলো দীর্ঘকাল ধরে নদীপ্রবাহের ফলে সৃষ্ট একটি সরু ও গভীর উপত্যকা, যার দুপাশের দেয়ালগুলো পাথুরে ও অত্যন্ত খাড়া। তবে ক্যানিয়ন গর্জের মতো আরেকটি ভৌগোলিক অবয়ব হলেও গর্জ অধিকতর সরু ও সংকুচিত।
মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্যের কারণে কলাম্বিয়া রিভার গর্জ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে প্রায়ই শীর্ষস্থানে থাকে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের মূল্যায়নে গর্জটি আমেরিকায় দ্বিতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে দশম স্থানে রয়েছে। লোনলি প্ল্যানেট নামের আরেকটি সংস্থা একে বিশ্বের সেরা ১০টি অঞ্চলের মধ্যে তালিকাভুক্ত করেছে।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
কলাম্বিয়া নদী কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া প্রদেশে উৎপন্ন হয়ে আমেরিকার ওয়াশিংটন ও ওরিগন অঙ্গরাজ্যগুলোর ভেতর দিয়ে সর্বমোট প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার পথ পেরিয়ে পশ্চিমের প্রশান্ত মহাসাগরে গিয়ে পড়েছে। নদীটির দীর্ঘ পথের প্রায় ১৩৬ কিলোমিটারজুড়ে রয়েছে গর্জটির উত্তর পাড়ে ওয়াশিংটন ও দক্ষিণ পাড়ে ওরিগন অঙ্গরাজ্য। পূর্ব প্রান্তে কলাম্বিয়া ও ডিসচুটস নদীর মিলনস্থানে গিরিখাতের শুরু এবং পশ্চিম প্রান্ত ওরিগনের পোর্টল্যান্ডের শহরের কাছে শেষ। গর্জের দেয়ালের সর্বোচ্চ উচ্চতা নদীর পানিতল হতে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার।
এটি একটি প্রমত্ত নদী, আস্ত এক পর্বতমালা ভেদ করে এগিয়ে চলেছে। কলাম্বিয়া নদীর গিরিখাত যাত্রায় সূর্যালোক ও মেঘ-বৃষ্টি, মরুময়তা ও উদ্ভিদরাজি এবং খাড়া পাহাড় ও ঝরনার অভূতপূর্ব সম্মিলন পৃথিবীর অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। তাই এসব অসাধারণ চিত্তাকর্ষক প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলির ও সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্যের (গর্জ অঞ্চলে মানবেতিহাসের বয়স ১০-১৫ হাজার বছরের পুরোনো; স্থানীয় আমেরিকানরা এ নদীকে কেন্দ্র করে আবাস, ভ্রমণ ও ব্যবসা করেছে) আকর্ষণে লাখ লাখ মানুষ এ অঞ্চলে ছুটে আসে। পুরো গর্জজুড়েই নানা বয়সী নারী-পুরুষ ভ্রমণকারী, পার্বত্য পথের হাইকার ও বাইকার এবং নদীতে র্যাফটিংকারীদের দেখা মেলে। ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, আবহাওয়া, উদ্ভিদরাজির সম্পর্কটি অত্যন্ত স্পষ্ট এবং শিলা ও শৈবাল-ছত্রাকের সহাবস্থান পরিষ্কারভাবে দেখা যায়, এমনকি সাধারণ চোখে। এক বিস্তৃত জীববৈচিত্র্যের সমাবেশ ঘটেছে জংলি ফুলসহ আট শ প্রজাতির বেশি উদ্ভিদ, ১৫ প্রজাতির উভচর ও সরীসৃপ এবং ২০ প্রজাতির বেশি স্তন্যপায়ী প্রাণী। ডগলাস ফার, ওয়েস্টার্ন রেড সিডার, ওয়েস্টার্ন হেমলক, হোয়াইট ওক, পাইন, ব্ল্যাক কটন উড ইত্যাদি বনাঞ্চলের উল্লেখযোগ্য বৃক্ষ।
কলাম্বিয়া নদী গর্জের গাছপালা–শোভিত ওরিগন অংশের প্রাকৃতিক দৃশ্য; ইনসেটে: মাল্টনোমাহ জলপ্রপাতকলাম্বিয়া নদীটি কাসকেড পর্বতশ্রেণির মধ্য দিয়ে গেছে, যা প্রায় তিন কোটি বছরে ১০৫০-১২০০ মিটার ওপরে উঠেছে, প্লেট টেকটোনিক গতিশীলতায়। পর্বতগুলো প্রধানত ব্যাসাল্ট নামের আগ্নেয়শিলায় গঠিত। ভূবিজ্ঞানীদের মতে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ বছর আগে ঘটা অগ্ন্যুৎপাতে লাভা পূর্ব দিক থেকে পশ্চিমে প্রবাহিত হয়। আজ থেকে প্রায় ৫৫ হাজার বছর আগে আবার অগ্ন্যুৎপাতে লাভার উদ্গিরণ ঘটে। এভাবে বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক সময়ে অগ্ন্যুৎপাত হয়েছে এবং এগুলো ব্যাসাল্ট হলেও লাভার উপাদানগত পার্থক্য, তা অল্প হলেও থাকায় ও শীতল হওয়ার প্রক্রিয়ায় ভিন্নতা থাকায় এ ব্যাসাল্ট শিলাগুলোর গুণে ও বৈশিষ্ট্যে পার্থক্য রয়েছে। যেমন কলামনার ব্যাসাল্ট, পিলো ব্যাসাল্ট ইত্যাদি। আবার কোনো ব্যাসাল্ট স্তরাকারে দৃশ্যমান, কোনোটি চারপাশের ভূপ্রকৃতির মাঝে ঘাড় উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় ৫৫ হাজার বছর আগের ব্যাসাল্ট। এ ঘটনাগুলোর অনেক পরে আজ থেকে ১৫-১৮ হাজার বছর আগে বড় মাত্রার বন্যা হয়েছিল, প্রায় ১৫ মিটার উচ্চতার বন্যার পানির প্রচণ্ড স্রোত বোল্ডার নামে অভিহিত বড় বড় শিলাখণ্ডসহ পলল বয়ে আনে, যা এ অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে। কিছু স্থানে আছে বায়ুবাহিত বালুর সমাবেশ, যা বৃক্ষহীন গোলাকার, অর্থাৎ দৃষ্টি আকর্ষক আরেক ভূমিরূপ সৃষ্টি করেছে। তবে কলাম্বিয়া নদী দুপাড়ের ভূপ্রকৃতিতে একটু পার্থক্য রয়েছে—নদীর উত্তর অর্থাৎ ওয়াশিংটনের দিকের শিলাগুলো হেলানো, ভূমিধসের আধিক্যসমৃদ্ধ, অন্যদিকে নদীর দক্ষিণ অর্থাৎ ওরিগনের দিকের শিলাগুলো সমতল ও জলপ্রপাতসমৃদ্ধ। দীর্ঘকালের ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট ও বিবর্তনের মধ্য দিয়ে পেরোনো গর্জের ভূপ্রকৃতি তাই অনন্য মর্যাদাসম্পন্ন।
আকাশ পরিষ্কার থাকা সাপেক্ষে গোল্ডেনডেল নামক স্থান থেকে এ অঞ্চলের অন্যতম একটি মৃত আগ্নেয়গিরির বরফাচ্ছাদিত শৃঙ্গ ও দর্শনীয় স্থান মাউন্ট হুড দেখা যায়। সৌভাগ্যবান হওয়ায় আমরা দেখেছি। মাউন্ট হুড ওরিগনের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ, উচ্চতা ৩ হাজার ৪২৯ মিটার। আবার দ্য ডালেস শহরের কাছাকাছি এলেই গাছগাছালির আকস্মিক বৃদ্ধি সহজেই চোখে পড়ে, যেন মরুময় ও সবুজ-সতেজ দুই ভিন্ন ভূপ্রকৃতির সেতুবন্ধ এ শহর ভূপ্রকৃতির সঙ্গে উদ্ভিদরাজির নিবিড় সম্পর্কের চমৎকার উদাহরণ। তা ছাড়া শহরটি হাজার হাজার বছর আগে থেকে অদ্যাবধি ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। পাহাড় থেকে নেমে আসা ছোট-বড় জলপ্রপাত চোখে পড়ে নদীর বাঁ তীরে। গর্জের মধ্য দিয়ে চলার পথে আমরাও দেখেছি লাটাউরেল ও মাল্টনোমাহসহ অনেকগুলো জলপ্রপাত। এদের মধ্যে মাল্টনোমাহ জলপ্রপাতটি সর্ববৃহৎ এবং ওরিগনের সর্বোচ্চ। এখানে প্রায় ১৯০ মিটার উঁচু থেকে সশব্দে দুই ধাপে অঝোরধারায় পানি নেমে আসছে, কী অপরূপ দৃশ্য। নদীর দক্ষিণ পাড়ের এ জলপ্রপাত ও আশপাশের নৈসর্গিক দৃশ্য উপভোগ করতে মানুষের ভিড় লেগেই আছে, পছন্দমতো সময়ের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে কষ্ট করতে হয়।
আমরা আন্তরাজ্য মহাসড়ক ৮৪ দিয়ে যাচ্ছিলাম, ফাহাদ ঘণ্টায় প্রায় ১১০ কিলোমিটার গতিতে গাড়ি চালাচ্ছিল। পুরো ভ্রমণপথে আমি গভীর আগ্রহ, নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও প্রখর দৃষ্টিতে গিরিখাতের দুদিকেই নজর রাখছিলাম, বিশদভাবে দেখতে কখনো ভিউপয়েন্টে যাত্রাবিরতি দিয়ে। যেকোনো ভূবিজ্ঞানীর কাছে অজানাকে জানার এক অপূর্ব ও দুর্লভ সুযোগ। এ নদী গর্জের দুপাড়ের ভূমিরূপ নানা ধরনের ও নানা বয়সী শিলা এবং ভূতাত্ত্বিক বিবর্তনের ফলে সৃষ্ট নানা ছাপ যেমন ফল্ট বা চ্যুতি, ফ্র্যাকচার বা ফাটল, অতীত ভূমিধসের ছিট-ছাট আরও অমীমাংসিত কিছু দৃষ্টান্তসহ প্যাসিফিক ও আমেরিকান টেকটোনিক প্লেটগুলোর গতিশীলতা, ভূমিকম্প ও অতীত পরিবেশের স্বাক্ষর বহন করছে। প্রায় কোটি কোটি বছরের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের সাক্ষী, বৈচিত্র্যময় উদ্ভিদরাজির আবাস এবং মনোমুগ্ধকর ও চিত্তাকর্ষক প্রাকৃতিক দৃশ্যের ও অসাধারণ ভূপ্রকৃতির কলাম্বিয়া নদী গর্জ (গিরিখাত) সব মানুষকে কেন আকর্ষণ করে আসছে ভ্রমণ শেষে তা সহজবোধ্য।
লেখক: এ কে এম খোরশেদ আলম, ভূতত্ত্ববিদ, রিচল্যান্ড, ওয়াশিংটন, যুক্তরাষ্ট্র