সংসদীয় স্থায়ী কমিটি: বিরোধী দলকে সভাপতি পদ দেওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা

· Prothom Alo

  • জাতীয় সংসদে বিষয়ভিত্তিক ১১টি এবং মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি আছে ৩৯টি।

    Visit betsport24.es for more information.

  • এখন পর্যন্ত বিষয়ভিত্তিক ৬টি ও মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত ৯টি স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে।

  • শুধু সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি পেয়েছে বিরোধী দল।

বিরোধী দলকে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ দেওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দল প্রতিনিধি না দেওয়ায় জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ বণ্টন নিয়ে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। অতীতের রীতি অনুযায়ী কমিটি গঠন করতে চায় সরকারি দল।

জাতীয় সংসদে বিষয়ভিত্তিক ১১টি এবং মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি আছে ৩৯টি। জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী, সংসদে এই ৫০টি কমিটির মধ্যে বিরোধী দল ১৪টি কমিটির সভাপতি পদ পাওয়ার কথা। তবে এবার অন্তত ১১টির সভাপতি পদ পাওয়ার আশা করেছিল বিরোধী দল। এখন পর্যন্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে ১৫টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়া হয়েছে। আগামী অধিবেশনে বাকি ৩৫টি কমিটি গঠন করার কথা। তবে এসব কমিটির আর কোনোটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে সরকারি ও বিরোধী দলের সূত্র জানিয়েছে।

বিরোধী দলের একটি সূত্র জানায়, বিরোধী দলকে স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ দেওয়ার বিষয়ে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা ছিল। দ্বিতীয় অধিবেশনে গঠন করা সরকারি হিসাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সভাপতি পদও বিরোধী দলকে দেওয়া হয়। তাদের আশা ছিল এবার বিষয়ভিত্তিক আর কোনো কমিটির সভাপতি পদ না দেওয়া হলেও সংসদের আসন সংখ্যানুপাতে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক ১০টি কমিটির সভাপতি বিরোধী দল পাবে।

জাতীয় সংসদের প্রধান কাজ আইন প্রণয়ন ও নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। এ দুটো ক্ষেত্রেই সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মন্ত্রণালয়ভিত্তিক সংসদীয় কমিটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাজ পর্যালোচনা, অনিয়ম ও গুরুতর অভিযোগ তদন্ত করতে পারে। বিল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দেওয়া বা সুপারিশ করাও সংসদীয় কমিটির কাজ।

বিদ্যমান ব্যবস্থায় বিরোধী দলকে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। তবে ‘রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল’ হিসেবে সই করা জুলাই সনদের প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, সরকারি হিসাব, বিশেষ অধিকার, অনুমিত হিসাব ও সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতি পদে বিরোধীদলীয় সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদে সংসদে আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দলের মধ্য থেকে নির্বাচন করা হবে। সংবিধানে এই বিধান যুক্ত করা হবে। জুলাই সনদের এই প্রস্তাবে বিএনপিসহ ৩০টি দল ও জোট একমত হয়েছিল।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সনদের এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংশোধন করতেই হবে এমন নয়। সরকার চাইলে এখনই এটি বাস্তবায়ন করতে পারে। কারণ, সংসদীয় কমিটির সভাপতি কোন দল থেকে দেওয়া হবে, তা সংবিধান বা সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির কোথাও নির্ধারণ করে দেওয়া নেই।

আগামী অধিবেশনে বাকি ৩৫টি কমিটি গঠন করার কথা। তবে এসব কমিটির আর কোনোটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে সরকারি ও বিরোধী দলের সূত্র জানিয়েছে।

কমিটি গঠনপ্রক্রিয়া

জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে বলা আছে, সংসদে গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী কমিটির সদস্যরা নিযুক্ত হবেন। সংসদ মনোনীত না করে থাকলে কমিটির সদস্যরা তাঁদের মধ্য থেকে একজনকে সভাপতি নির্বাচন করবেন।

কার্য উপদেষ্টা কমিটি, পিটিশন কমিটিসহ কয়েকটি কমিটির সদস্য মনোনয়ন করেন স্পিকার। এর বাইরে বিষয়ভিত্তিক অন্য কমিটিগুলো এবং মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত কমিটিগুলো সংসদে ভোটের মাধ্যমে গঠিত হয়। সাধারণত সংসদ নেতার পক্ষে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ কমিটি গঠনের প্রস্তাব সংসদে তোলেন। এই প্রস্তাব পাসের মাধ্যমে কমিটি গঠিত হয়। যেহেতু সংসদে সরকারি দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে, তাই তারা যেভাবে চাইবে সেভাবেই কমিটি গঠিত হবে। যেমন এবার সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি বিরোধী দল থেকে করা হয়েছে।

৫০ শতাংশ সংসদীয় কমিটির সভাপতি বিরোধী দল থেকে চায় জামায়াত

এর আগে একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদেও বিরোধী দলকে সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি পদ দেওয়া হয়েছিল। একাদশ সংসদে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হয়েছিল বিরোধী দল থেকে।

অধ্যাপক আলী রীয়াজ, সহসভাপতি, সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনসরকারের জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার স্বার্থে সংসদীয় কমিটিগুলো দ্রুত গঠন করা উচিত। জুলাই সনদ অনুযায়ী চারটি কমিটির সভাপতি অবশ্যই বিরোধী দল থেকে পাওয়ার কথা। এ ছাড়া সংখ্যানুপাতিক হিসাবে মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত কমিটিগুলোর ২৬ শতাংশ বিরোধী দলের পাওয়া উচিত।

সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, কমিটি গঠনের আগে সাধারণত বিরোধী দলের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা করে থাকে সরকারি দল। কোন কমিটিতে বিরোধী দলের কে থাকবেন, সে পরামর্শ তাদের কাছ থেকে নেওয়া হয়।

চলতি সংসদে এখন পর্যন্ত বিষয়ভিত্তিক ৬টি ও মন্ত্রণালয়ভিত্তিক ৯টি মিলিয়ে ১৫টি স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে। কার্যপ্রণালি বিধিতে নতুন সংসদ যাত্রা শুরুর প্রথম তিনটি অধিবেশনের মধ্যে মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত কমিটি গঠনের বাধ্যবাধকতা আছে। ২৭ আগস্ট থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হবে। এই অধিবেশনে বাকি ৩৫টি সংসদীয় কমিটি গঠন করা হবে। তবে আবদুল মঈন খান ও আন্দালিভ রহমান পার্থ যথাক্রমে পরিকল্পনা এবং আইন মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ছিলেন। তাঁরা মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ায় এ দুটো কমিটি পুনর্গঠন করতে হবে।

বিরোধী দলের একটি সূত্র জানায়, বিরোধী দলকে স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ দেওয়ার বিষয়ে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা ছিল। দ্বিতীয় অধিবেশনে গঠন করা সরকারি হিসাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সভাপতি পদও বিরোধী দলকে দেওয়া হয়। তাদের আশা ছিল এবার বিষয়ভিত্তিক আর কোনো কমিটির সভাপতি পদ না দেওয়া হলেও সংসদের আসন সংখ্যানুপাতে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক ১০টি কমিটির সভাপতি বিরোধী দল পাবে।

জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ও বিরোধী দলের সংসদীয় দলের মুখপাত্র নাজিবুর রহমান মোমেন প্রথম আলোকে বলেন, সম্প্রতি সরকারি দল তাঁদের কাছে সংসদীয় কমিটির সদস্য দেওয়ার জন্য নাম চেয়েছিল। তখন বিরোধী দল প্রশ্ন তুলেছিল জুলাই সনদ অনুযায়ী সংখ্যানুপাতে বিরোধী দলকে সভাপতি পদ দেওয়ার কথা। তবে সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়, বিরোধী দল সংবিধান সংশোধন কমিটিতে নাম না দিলে সংসদীয় কমিটিতে সভাপতি পদ দেওয়া হবে না। সরকারি দল জুলাই সনদ লঙ্ঘন করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি পেছন থেকে ছুরিকাঘাতের মতো।

গত ১৩ জুলাই সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করে জাতীয় সংসদ। বিরোধী দলকে ওই কমিটিতে পাঁচজনের নাম দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। তবে বিরোধী দল কারও নাম দেয়নি। তারা এ কমিটি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, জুলাই সনদ অনুযায়ী তারা সংবিধান সংস্কারের পক্ষে। সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে বিরোধী দলের ধারণাগত মতভিন্নতা আছে।

বিরোধী দল প্রতিনিধি না দিলেও সংবিধান সংশোধন–সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে। সরকারি দল বলেছে, বিরোধী দলের প্রতিনিধি দেওয়ার সুযোগ উন্মুক্ত আছে। তারা যখন নাম দেবে, তখনই তাদের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

সরকারি দলের অবস্থান

সরকারি দলের একটি সূত্র জানায়, সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদের বণ্টন বিষয়ে তাদের অবস্থান হলো—বিএনপি ইতিমধ্যে বলেছে জুলাই সনদ যেভাবে সই হয়েছে, সেভাবে তা বাস্তবায়ন করা হবে। বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ার একটি অংশ হচ্ছে সংবিধান সংশোধন কমিটি। বিরোধী দলকে সভাপতি পদ দেওয়ার বিষয়টিও ওই প্রক্রিয়ার অংশ। কিন্তু তারা বিশেষ কমিটিতে প্রতিনিধি দিচ্ছে না, এর অর্থ তারা ওই প্রক্রিয়ার অংশ হতে চাইছে না। সংবিধান সংশোধন হওয়ার পর জুলাই সনদের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করা হবে। তা ছাড়া এর আগে বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকারের পদটি দিতে চেয়েছিল সরকারি দল, তখন তারা সেটিও নেয়নি।

জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, অতীতের রীতি অনুযায়ী এবার সংসদীয় কমিটি গঠন করা হবে। অতীতে সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি বিরোধী দলকে দেওয়া হয়েছিল। এবারও তা করা হয়েছে। বাকি সব কমিটি আগামী অধিবেশনে গঠিত হবে। তিনি বলেন, জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবে বাস্তবায়ন হবে। এ জন্য সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি কাজ করছে।

যেসব কমিটি হয়েছে

এখন পর্যন্ত গঠিত মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত ৯টি স্থায়ী কমিটি হলো মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, বাণিজ্য, পানিসম্পদ, শিল্প, পরিকল্পনা, অর্থ এবং আইন মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত। সব কটি কমিটির সভাপতি হয়েছেন সরকারি দল বা মিত্রদের মধ্য থেকে।

এখন পর্যন্ত গঠিত বিষয়ভিত্তিক ছয়টি কমিটির মধ্যে শুধু সরকারি হিসাব সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। বাকি পাঁচটি কমিটি হলো কার্য উপদেষ্টা কমিটি, বিশেষ অধিকার, সংসদ কমিটি, লাইব্রেরি কমিটি ও বেসরকারি সদস্যদের বিল এবং বেসরকারি সদস্যদের সিদ্ধান্ত-প্রস্তাব সম্পর্কিত কমিটি।

সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ গতকাল শুক্রবার টেলিফোনে প্রথম আলোকে বলেন, সরকারের জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার স্বার্থে সংসদীয় কমিটিগুলো দ্রুত গঠন করা উচিত। জুলাই সনদ অনুযায়ী চারটি কমিটির সভাপতি অবশ্যই বিরোধী দল থেকে পাওয়ার কথা। এ ছাড়া সংখ্যানুপাতিক হিসাবে মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত কমিটিগুলোর ২৬ শতাংশ বিরোধী দলের পাওয়া উচিত। এ বিষয়ে সব দলের ঐকমত্য হয়েছিল। এটি করার জন্য সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন নেই। এটিকে একটি স্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে দাঁড় করানোর জন্যই তাঁরা মূলত প্রস্তাবটি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছিলেন।

Read full story at source