এআই ব্যবহারে কি শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি কমছে

· Prothom Alo

শিক্ষাবিদেরা এখন বেশ চিন্তিত। অনেক শিক্ষার্থী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ছাড়া নিজে থেকে কোনো রচনা লিখতে পারছে না। ফলে শুধু তাদের ব্যাকরণ শেখার বা সঠিক বাক্য তৈরির ক্ষমতাই নষ্ট হচ্ছে না, বরং তারা চিন্তাভাবনা ও শেখার সুযোগও হারিয়ে ফেলছে।

মানুষ কীভাবে লেখে, তা নিয়ে বহু বছর ধরে গবেষণা করছেন মনোবিজ্ঞানী রোনাল্ড টি. কেলগ। তিনি জানিয়েছেন, একটি সাধারণ যুক্তিনির্ভর লেখা তৈরি করা মানসিকভাবে তত কষ্টের, যতটা কোদাল দিয়ে গর্ত খুঁড়তে কষ্ট হয়।

Visit afrikasportnews.co.za for more information.

ভালো লেখার জন্য শব্দভান্ডার, বানান ও ব্যাকরণের ওপর ভালো দখল থাকতে হয়। এটি লেখককে একটি বিষয় গভীরভাবে বুঝতে, নিজের স্মৃতির ঝাঁপি খুলে তথ্য বের করতে এবং সেগুলো সাজাতে বাধ্য করে। একটি ভালো প্রবন্ধ বা লেখা লিখতে এত মনোযোগ দিতে হয় যে সে সময় অন্য কিছু করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

কোদাল দিয়ে গর্ত খুঁড়তে যেমন কেউ ইচ্ছা করে যাবে না, তেমনি জোর করে কাউকে ভালো লেখক বানানো অসম্ভব। তবু সব স্কুলেই শিক্ষার্থীদের লেখালেখি শেখানো হয়। তাই কষ্ট কমানোর জন্য যখনই কোনো নতুন প্রযুক্তি আসে, মানুষ সঙ্গে সঙ্গে তা ব্যবহার শুরু করে।

পছন্দ হোক বা না হোক, শিক্ষার্থীরা এখন লেখালেখির কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করছে। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, হাইস্কুল ও কলেজের বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই পড়াশোনা ও প্রবন্ধ লেখার জন্য এআইয়ের সাহায্য নিচ্ছে।

এই বিষয়টি অনেক শিক্ষককেই চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। তারা মনে করেন, শিক্ষার্থীদের এআই ছাড়া নিজের বুদ্ধিতে লেখা উচিত। তাই অনেক শিক্ষক আবার ক্লাসরুমে বসে হাতে পরীক্ষা নেওয়ার পুরোনো নিয়মে ফিরে যাচ্ছেন। যাতে ছাত্রছাত্রীরা চ্যাটবটের ওপর নির্ভর করতে না পারে।

নিউইয়র্কের জন জে হাই স্কুলের শিক্ষিকা জেসিকা বিনি এআইকে পড়ালেখার কাজে লাগানোর নতুন উপায় বের করেছেন

তবে প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের কর্তারা বিষয়টিকে অন্যভাবে দেখছেন। তাঁদের মতে, কাজের ক্ষেত্রে এআইয়ের বড় একটা অংশ ব্যবহার হচ্ছে লেখার কাজে। তাই কষ্ট করে আগের মতো একা একা লেখার দরকার কী? তা ছাড়া গুছিয়ে লেখার দিক থেকে চ্যাটবট এখন অনেক মানুষের চেয়েই এগিয়ে আছে।

ফলে বড় কিছু প্রশ্ন সামনে আসছে। লেখালেখির জন্য এত পরিশ্রম করা কেন জরুরি? নিজের চিন্তা থেকে লেখা বন্ধ করে দিলে শিক্ষার্থীরা আসলে কী হারাচ্ছে?

মনোবিজ্ঞান ও শিক্ষা নিয়ে কাজ করা গবেষকেরা কিন্তু ঢালাওভাবে এআইয়ের বিরোধী নন। প্রযুক্তির এই বড় অগ্রগতি দেখে তারাও অনেক নতুন সম্ভাবনার কথা ভাবছেন।

তবে তাদের গবেষণা একটি বিষয়ে সতর্ক করে। চিন্তা করা, খসড়া তৈরি করা এবং লেখা ঠিক করার পুরো কাজটিতে এআই ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা ঠিক নয়। কারণ, নিজে নিজে লেখা তৈরি করা কঠিন হলেও এই কঠিন কাজটিই মস্তিষ্কের বিকাশে সাহায্য করে। লেখার মাধ্যমে আমাদের স্মৃতিশক্তি, পরিকল্পনা করার ক্ষমতা ও নিজের ভাবনা নিয়ে নিজে চিন্তা করার দক্ষতা বাড়ে। শৈশব থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত এই দক্ষতা অর্জনে বহু বছর সময় লেগে যায়। ডক্টর কেলগের ভাষায়, ‘লেখা হলো মূলত চিন্তা করার একটি আধুনিক মাধ্যম।’

প্রতিদিন একই জিনিস খাওয়া কি ঠিক

লেখার অভ্যাস ও এআইয়ের প্রভাব

১৮৭০ সালের আগে আমেরিকান শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেওয়া হতো মুখে মুখে। কিন্তু পরে অফিস-আদালত বেড়ে যাওয়া ও টাইপরাইটার আবিষ্কার হওয়ার পর গুছিয়ে লেখার প্রয়োজন তৈরি হয়। তখন থেকেই স্কুলে সবাইকে লিখতে শেখানো শুরু হয়।

বিজ্ঞানীরা জানান, কোনো বিষয় গভীরভাবে বুঝতে ও মনে রাখতে লিখে ফেলা সবচেয়ে ভালো উপায়। নিজে থেকে লিখতে গেলে চিন্তা করার ক্ষমতা ও মেধা বাড়ে।

তবে আজকাল অনেকে লেখার জন্য এআই বা চ্যাটবটের সাহায্য নিচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এআই দিয়ে লিখলে মস্তিষ্কের কাজ কমে যায়। এতে নিজে কী লেখা হলো, তা মনেও থাকে না। ফলে বেশি এআই ব্যবহার করলে মানুষের নিজের চিন্তা করার শক্তি কমে যেতে পারে।

বর্তমানে গুগল বা ওপেনএআইয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এমন এআই তৈরি করছে, যা ছাত্রছাত্রীদের পড়া সরাসরি লিখে দেবে না। বরং তাদের চিন্তা করতে সাহায্য করবে। পরীক্ষা করার জন্য গুগলের ‘জেমিনি গাইডেড লার্নিং’ এবং ওপেনএআইয়ের ‘চ্যাটজিপিটি স্টাডি মোড’ শিক্ষার্থীদের শিক্ষকের মতো বিভিন্ন প্রশ্ন করে চিন্তা করতে সাহায্য করে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিজের বুদ্ধি ও সৃজনশীলতা বজায় রাখতে হাতে লিখে চর্চা করার কোনো বিকল্প নেই।

বিল গেটসের মেয়ের স্টার্টআপে কী হয়েছিল

লেখালেখিতে এআইয়ের ব্যবহার ও সীমাবদ্ধতা

এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সহজে যেকোনো লেখা সংক্ষেপ করা, তথ্য বিশ্লেষণ করা বা নতুন লেখা তৈরি করা যায়। শারীরিক প্রতিবন্ধী বা নতুন ভাষা শেখা শিক্ষার্থীদের জন্য এটি দারুণ কার্যকর। এটি ব্যাকরণ ঠিক করতে এবং লজ্জা ছাড়া ভুল শুধরে নিতে সাহায্য করে।

তবে সব কাজ এআই দিয়ে করিয়ে নিলে মানুষের স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা কমে যায়। নিজে থেকে লেখার মাধ্যমে মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটে, শব্দভান্ডার বাড়ে এবং শেখা জ্ঞান দীর্ঘস্থায়ী হয়। এআই ইন্টারনেটের পুরোনো তথ্যই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে লেখে। তাই এতে মৌলিক ভাবনার অভাব থাকে।

নিউইয়র্কের জন জে হাই স্কুলের শিক্ষিকা জেসিকা বিনি এআইকে পড়ালেখার কাজে লাগানোর নতুন উপায় বের করেছেন। তিনি ক্লাসে শিক্ষার্থীদের প্রথমে এআই দিয়ে কবিতা লেখান। তারপর সেই কবিতার ভালো-মন্দ বিচার করে তা এআইকে দিয়ে শুধরে নেন। তবে বাড়ির কাজের ক্ষেত্রে এআইয়ের অপব্যবহার ঠেকাতে তিনি এখন ক্লাসরুমে বসেই শিক্ষার্থীদের কাগজ কলমে লিখতে দেন।

বিজ্ঞানীরা একে পুরোপুরি বাদ দিতে বলছেন না। তারা মনে করেন, এআইয়ের সঠিক ব্যবহার শেখার পাশাপাশি ক্লাসরুমে কাগজ কলমে নিজে লেখার চর্চা বজায় রাখা জরুরি। এতে প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতার পাশাপাশি নিজস্ব মেধা ও চিন্তাশক্তিও টিকে থাকবে।

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমসকিছু মানুষ কেন শিস বাজাতে পারে না

Read full story at source