কেন নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক এই বন্যা, কেন এত প্রাণহানি

· Prothom Alo

তিব্বত সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বুধবারের ভয়াবহ বন্যায় নেপালে অন্তত ৯৫ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। দুর্যোগ আঘাত হানার কয়েক ঘণ্টা পরও কয়েক শ পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

চীন-নেপাল সীমান্তের একটি নদীর দুই কূল উপচে তীব্র স্রোতে নেমে আসে কাদা ও ধ্বংসাবশেষ। এতে বহু ভবন কাদামাটি ও পানির নিচে চাপা পড়েছে। সেখানে আটকে পড়াদের সন্ধানে জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা।

Visit somethingsdifferent.biz for more information.

নেপাল পুলিশ অন্তত ৯৫ জনের মরদেহ উদ্ধারের খবর নিশ্চিত করেছে। তবে দুর্যোগ আঘাত হানার ৮ ঘণ্টা পরও ৩৮৪ জন পর্যটকের কোনো খোঁজ মেলেনি। নিখোঁজ এই পর্যটকদের মধ্যে ২৯১ জনই বিদেশি।

এই পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে নেপালের পর্যটন বোর্ড। তারা জানিয়েছে, নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাজ্যের নাগরিকেরা রয়েছেন।

প্রাথমিক তথ্যের বরাত দিয়ে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, আকস্মিক এই বন্যার ঘটনায় তিব্বতের গিরংয়ে তিনজন নিহত হয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন ২৬৫ জন।

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, নেপাল সীমান্তের তিব্বত বাণিজ্যকেন্দ্রে ভূমিধসে ‘ব্যাপক হতাহতের’ ঘটনা ঘটেছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে ‘সর্বাত্মক’ অভিযানের নির্দেশ দিয়েছেন।

নেপালের রাজু ভাদেল (৫৬) বলেন, ‘আজ সকালে আমার ভগ্নিপতি আমাকে ফোন করেছিলেন। তাঁরা কাঁদছিলেন এবং বলছিলেন যে তাঁদের পুরো বাড়িটি বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। পরিবারের তিন সদস্যকে উদ্ধার করা গেলেও তাঁর ভাই এখনো নিখোঁজ।’

নেপাল পুলিশের প্রকাশ করা ছবিতে দেখা গেছে, নদীর তীব্র পানির তোড়ে বাড়িঘর ভেসে যাচ্ছে। আর বার্তা সংস্থা এএফপির ছবিতে দেখা যায়, কাদামাটির নিচ থেকে একটি বাড়ির শুধু ওপরের অংশটি জেগে রয়েছে।

পুলিশের এক মুখপাত্র এর আগে এএফপিকে জানিয়েছিলেন, ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ এখনো স্পষ্ট নয়। তবে নদীর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে তাঁরা সতর্ক করেছেন।

আকস্মিক বন্যার পর নদীর তীরে কাদাপানিতে আংশিক তলিয়ে থাকা বাড়িঘর। নেপালের নুয়াকোট জেলার ত্রিশূলী বাজারআকস্মিক বন্যার পর নদীর তীরে কাদাপানিতে আংশিক তলিয়ে আছে ঘরবাড়ি। নুয়াকোট, নেপাল। ২৬ আগস্ট ২০২৬বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর নুয়াকোট জেলার ত্রিশূলী বাজারে চারদিকে শুধু ধ্বংসযজ্ঞ আর কাদামাটির পুরু স্তরআকস্মিক পাহাড়ি ঢল ও কাদামাটিতে তলিয়ে গেছে নেপালের নদীর তীরবর্তী একাধিক স্থাপনা ও মন্দিরআকস্মিক বন্যার পর নদীর তীরে কাদাপানিতে আংশিক তলিয়ে রয়েছে ঘরবাড়ি। সড়ক ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ত্রিশূলী বাজার, নুয়াকোট, নেপাল। ২৬ আগস্ট ২০২৬তীব্র বেগে ছুটে আসা নদীর কাদাপানি বিস্তীর্ণ এলাকাকে এভাবেই ঢেকে দিয়েছেআকস্মিক বন্যায় রাস্তার ওপরেই কাদামাটিতে আটকে গেছে যানবাহন, তলিয়ে গেছে ঘরবাড়িত্রিশূলীতে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ধ্বংসযজ্ঞ দেখছেন স্থানীয় লোকজনপানির তোড়ে নদীর তীরের জনবসতিগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অনেক জায়গায় আস্ত গ্রাম ভেসে গেছেনদীর দুই কূল উপচে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ার পর উপত্যকার বিস্তীর্ণ এলাকার জনবসতি এভাবেই কাদামাটিতে তলিয়ে যায়বরফধসের কারণে নদীর গতিপথ আটকে সৃষ্ট বন্যায় কাদামাটির নিচে প্রায় ঢাকা পড়েছে একটি বাড়িনেপালের বন্যাকবলিত এলাকা থেকে ভেকুর (ব্যাকহো লোডার) সাহায্যে এক ভুক্তভোগী বৃদ্ধাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা

নেপাল সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা উপদ্রুত এলাকায় হেলিকপ্টার ও দুর্যোগ মোকাবিলা কর্মী মোতায়েন করেছে।

নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জলবিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ মিলিয়ে তাদের প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংস্থাটি এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘এই দুর্যোগে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।’

কাঠমান্ডুভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের (ইসিমোড) রিমোট সেন্সিং ও জিও ইনফরমেশন বিশ্লেষক সার্থক শ্রেষ্ঠ জানান, প্রাথমিক মূল্যায়নে চীন সীমান্তে কোনো অস্বাভাবিকতা ধরা পড়েনি।

সার্থক শ্রেষ্ঠ এএফপিকে বলেন, ‘আমাদের ধারণা, নেপাল অংশে একটি পাথুরে বরফধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে লেন্দে নদীর গতিপথ আটকে গিয়ে একের পর এক তীব্র বন্যার সৃষ্টি হয়েছে।’

আরও বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি

নেপাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুর্যোগের কারণে বেশ কয়েকটি মহাসড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি বুধবার জানায়, ‘নেপাল অংশের ভূমিধসের কারণে তিব্বতের জিরং বন্দরে ব্যাপক হতাহত ও বেশ কয়েকজন নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে।’

সম্প্রচারমাধ্যমটির প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, তীব্র স্রোতের সঙ্গে গাছের ডালপালা ও ধ্বংসাবশেষ ভেসে আসছে এবং সড়কগুলো পানিতে ডুবে গেছে। তবে ভিডিওটির সত্যতা তাৎক্ষণিক নিশ্চিত করতে পারেনি এএফপি।

তিব্বতের শিগাতসের ট্রাফিক কর্তৃপক্ষ বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে জানিয়েছে, ওই এলাকার সড়কগুলো ‘ভূমিধসের ঝুঁকিতে রয়েছে এবং চলাচলের অনুপযোগী’।

নেপালে আকস্মিক বন্যায় ১০৫ ভারতীয়সহ ৩৮৪ পর্যটক নিখোঁজ, নিহত ৫৫

বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুলাইয়েও জিরং বন্দরের কাছে ভূমিধসের ঘটনায় ১৭ জন নিখোঁজ হয়েছিলেন।

জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ষার মৌসুমে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে প্রায়ই প্রাণঘাতী বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই অঞ্চলে চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়ার প্রকোপ এবং ভয়াবহতা দিন দিন বাড়ছে।

ইসিমোডের জলবায়ু ও পরিবেশ ঝুঁকি বিভাগের প্রধান চিয়াংগং ঝাং সতর্ক করে বলেছেন, দ্রুত আরেকটি বন্যা দেখা দিতে পারে। তিনি এএফপিকে বলেন, ‘নেপাল-চীন সীমান্ত নদীর উজানে এখনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়ে রয়েছে। ফলে যেকোনো সময় দ্বিতীয় দফায় বন্যা দেখা দিতে পারে বলে কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে।’

নেপালে আকস্মিক ভূমিধস–বন্যায় চাপা পড়ল বিস্তীর্ণ জনপদ

Read full story at source