২০১৪ থেকে ২০২৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ওপর সাত ধরনের নিপীড়ন হয়েছে

· Prothom Alo

২০১৪ থেকে ২০২৫ সালে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষকেরা সাত ধরনের নিপীড়নের মধ্য দিয়ে গেছেন। এগুলো হচ্ছে হত্যা, গুম, শারীরিক নির্যাতন ও হেনস্তা, গ্রেপ্তার, চাকরিচ্যুতি, বাধ্যতামূলক ছুটি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং সমালোচনামূলক জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র সংকোচন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফার এক যৌথ গবেষণাপ্রবন্ধে এমন তথ্য উঠে এসেছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে ‘বাংলাদেশে একাডেমিক স্বাধীনতা: অবস্থা, প্রকৃতি ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এ গবেষণার সারসংক্ষেপ তুলে ধরেছেন সামিনা লুৎফা।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

আজ বৈঠকটির আয়োজন করেছিল আইআইই-দ্য পাওয়ার অব ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন এবং সোশ্যাল সায়েন্টিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (এসএসএ)। সেখানে নিজেদের গবেষণার সারসংক্ষেপ তুলে ধরে সামিনা লুৎফা বলেন, ২০১৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত শিক্ষকদের ওপর যেসব নিপীড়ন হয়েছে, তার দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে—১. অনেকে সেলফ-সেন্সরশিপে (স্বনিয়ন্ত্রণ) চলে গেছেন, কথা বলা বন্ধ করেছেন; ২. ক্রিটিক্যাল একাডেমিকদের আরেকটি ছোট বা ভিন্ন অংশ ক্রমাগত ক্ষমতার কাঠামোকে প্রশ্ন করেছে এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে।

নিপীড়নের বিরুদ্ধে সক্রিয় থাকা শিক্ষকদের কথা বলতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের প্রসঙ্গ টানা হয় ‘দমনমূলক শাসন ও একাডেমিক স্বাধীনতা: কর্তৃত্ববাদী বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের কণ্ঠরোধ ও সংগঠিতকরণ (২০১৪-২০২৫)’ শীর্ষক গবেষণায়। গবেষণায় শিক্ষক নেটওয়ার্কের সদস্যদের সাক্ষাৎকারের কথা উল্লেখ করে সামিনা লুৎফা বলেন, সাক্ষাৎকারে দেখা গেছে, তাঁদের টিকে থাকার কৌশলে অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে নেটওয়ার্কিং (যোগাযোগ)। নেটওয়ার্ক তাঁদের আবেগপূর্ণ, আইনি ও আর্থিক সহযোগিতা দিয়েছিল।

আইন যখন আনুগত্য নিশ্চিতের হাতিয়ার

বৈঠকে তানজীমউদ্দিন ও সামিনা লুৎফার এই গবেষণাপ্রবন্ধসহ মোট পাঁচটি গবেষণাপ্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আনিসুর রহমান ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আ-আল মামুনের ‘বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা: আইন, রাজনীতি ও বাংলাদেশে একাডেমিক স্বাধীনতা’ শীর্ষক যৌথ গবেষণাপ্রবন্ধের ফলাফলে বলা হয়, বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আইন শুধু প্রশাসন পরিচালনার জন্য নয়, বরং আনুগত্য নিশ্চিত করার হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক বা বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা সংকুচিত হয়েছে।

এ গবেষণার সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করেন আনিসুর রহমান। তিনি বলেন, দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক স্বাধীনতার কোনো সংজ্ঞাও নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নির্বাহী বিভাগের পাশাপাশি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ক্রমেই বেড়েছে। এখন বিষয়টি সরাসরি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের দিকে যাচ্ছে।

‘বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় অভিযোগের প্রতিকার ও একাডেমিক স্বাধীনতা’ শীর্ষক প্রবন্ধ যৌথভাবে লিখেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মির্জা তাসলিমা সুলতানা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক কাজলী শেহরীন ইসলাম। এর সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন মির্জা তাসলিমা। তিনি বলেন, ‘পাবলিক ও বেসরকারি সব ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্র আসলে একটা আদর্শিক অ্যাপারেটাস (কাঠামো) হিসেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে। আমাদের তর্ক হচ্ছে, রেস্টোরেটিভ জাস্টিস সিস্টেম (ক্ষতিপূরণ ও পুনর্মিলনভিত্তিক বিচারব্যবস্থা) আনতে হবে, যেখানে ভুক্তভোগী, অভিযোগকারী বা নানা ধরনের মানসিক যন্ত্রণায় থাকা ব্যক্তিদের কেন্দ্র করে বিচারব্যবস্থা দাঁড় করাতে হবে। তাঁদের কথা শুনতে হবে।’

নব্য উদারতাবাদের প্রভাব

গোলটেবিল বৈঠকে ‘গুণগত মানের মূল্য: বাংলাদেশে একাডেমিক স্বাধীনতা ও উচ্চশিক্ষার নব্যউদারীকরণ প্রক্রিয়া’ শীর্ষক গবেষণাপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক বখতিয়ার আহমেদ। প্রবন্ধটি তিনি ও যুক্তরাষ্ট্রের বার্ড কলেজের ফ্যাকাল্টি মেম্বার ফাহমিদুল হক যৌথভাবে লিখেছেন।

এই প্রবন্ধে বলা হয়, নব্বইয়ের দশক থেকে বাংলাদেশে অর্থনীতির সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষারও নব্য উদারীকরণ শুরু হয়। নব্য উদারতাবাদের প্রভাব প্রসঙ্গে এই গবেষণায় বলা হয়, ‘বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা পুরোপুরি পাঠদাননির্ভর। এখানে শক্তিশালী গবেষণা ডিগ্রি, তহবিল নেই। তারপরও একাডেমিকদের চাপে রাখা হচ্ছে যে তাঁদের পেশাগত উৎকর্ষ সম্পূর্ণ নির্ভর করবে গবেষণার ওপর। সে ক্ষেত্রে জার্নাল–সংশ্লিষ্ট বিষয়ের কারণে আবার খুব প্রচলিত গবেষণা-এজেন্ডাতেই যেতে হয়। কাজের চাপ, মার্কেটাইজেশন, কন্ট্রোল মেকানিজম (নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা) ও প্রাইভেট (বেসরকারিকরণ)—সবকিছু মিলিয়ে এই রেজিম একাডেমিক স্বাধীনতাকে সাংঘাতিকভাবে সংকুচিত করে ফেলছে।’ তাঁর মতে, একাডেমিক স্বাধীনতাই আসলে প্রকৃত গবেষণা–উৎকর্ষ তৈরি করে।

বৈঠকে ‘দক্ষিণ এশিয়ায় ছাত্ররাজনীতি ও একাডেমিক স্বাধীনতার প্রভাব: অবস্থা, ক্যাম্পাস ও চাপের মুখে জ্ঞান-বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার তুলনামূলক আন্তঃদেশীয় বিশ্লেষণ’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ তুলে ধরেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম। এতে বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ার এই পাঁচ দেশে জাতীয় রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন ঘটানোর সক্ষমতা রাখে ছাত্ররাজনীতি। আবার এই ছাত্ররাজনীতিই বিভিন্ন পর্যায়ে একাডেমিক স্বাধীনতাকে সংকুচিত করেছে। ছাত্ররাজনীতিকে রোমান্টিকভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই বলে প্রবন্ধে প্রস্তাব করা হয়।

অন্য স্বাধীনতা না থাকলে একাডেমিক স্বাধীনতাও অসম্ভব

গবেষণাপ্রবন্ধ উপস্থাপনের পর সেগুলোর ওপর আলোচনা হয় গোলটেবিল বৈঠকে। আলোচনায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, স্বৈরশাসন ও নব্য উদারতাবাদ—বাংলাদেশে এই দুটি বিষয়ের ভয়াবহ সংমিশ্রণ হয়েছে। এই সংমিশ্রণ দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও পুরো শিক্ষা খাতকে একটা ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে নিয়ে গেছে। আমরা একাডেমিক স্বাধীনতার কথা বলছি। কিন্তু রাজনৈতিক-ব্যক্তিগত ও অন্যান্য স্বাধীনতা যদি দেশে না থাকে, বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা করে একাডেমিক স্বাধীনতা পাওয়া একটা অসম্ভব ব্যাপার।

তবে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সব সময় একাডেমিক স্বাধীনতার লড়াই থাকে উল্লেখ করে এই অধ্যাপক বলেন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের দিক থেকে এই বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটা না থাকলে একটা সমাজের কোনো ভবিষ্যৎ থাকে না। ফলে একাডেমিক স্বাধীনতা একটা সার্বক্ষণিক লড়াইয়ের বিষয়।

আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘আগের সরকারের (ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ) সময় যে ধরনের উপাচার্য নিয়োগ হতো, এখনো ঠিক সেইভাবেই হচ্ছে। এমন সব উপাচার্য নিয়োগ হচ্ছে, যেটা অবিশ্বাস্য মাত্রার নিম্নমানের। বোঝাই যাচ্ছে, তাঁদের নিয়োগ করা হচ্ছে কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য। এই ভীতিকর কিংবা প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে একাডেমিক স্বাধীনতা নিয়ে এ ধরনের কাজগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন।

আলোচনায় অংশ নেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সারা হোসেন ও জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য শামস রহমান, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক শেখ নাহিদ নিয়াজী ও নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক শর্মী হোসেন। পরে জাতীয় ছাত্রশক্তির বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি তাহমীদ আল মুদ্দাসসির চৌধুরী, ছাত্র ইউনিয়ের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মিশকাতুল মাশিয়াত প্রমুখ সেখানে বক্তব্য দেন।

Read full story at source