সেই নাগরিক সেবাকেন্দ্রে তালা, নেই সেবাদানকারী ও সেবাপ্রার্থী

· Prothom Alo

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব যে ছয়টি নাগরিক সেবাকেন্দ্র চালু করেছিলেন, তার একটি ঢাকার মোহাম্মদপুরে। মোহাম্মদপুর সাব-পোস্ট অফিসের দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষ নিয়ে তৈরি হয়েছে এই সেবাকেন্দ্র।

নাগরিক সেবাকেন্দ্র কেমন চলছে, তা দেখতে ২৭ আগস্ট যাই মোহাম্মদপুরে। সরেজমিনে দেখা যায়, কক্ষটিতে দুটি টেবিল ও কয়েকটি চেয়ার অগোছালোভাবে পড়ে আছে। কোনো সেবাদানকারী নেই, কোনো সেবাপ্রার্থী নেই।

Visit amunra.help for more information.

কথা ছিল, একজন করে উদ্যোক্তা এই সেবাকেন্দ্র পরিচালনা করবেন। তিনি পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, জিডি (সাধারণ ডায়েরি) ও ভূমিসেবার মতো ৪৫০টি সরকারি সেবা দেবেন। প্রতিটি সেবার বিপরীতে নির্ধারিত ফি–ও পাবেন তিনি।

মোহাম্মদপুর সাব-পোস্ট অফিসের কর্মীরা প্রথম আলোকে জানান, গত বছর কার্যক্রম শুরুর পর কয়েক দিন একজন উদ্যোক্তা সেবাকেন্দ্রে ল্যাপটপ নিয়ে এসে বসতেন। কিছুক্ষণ থেকে চলে যেতেন। সাম্প্রতিক কালে আর তাঁকে দেখা যায়নি।

নাগরিক সেবাকেন্দ্র কেমন চলছে, তা দেখতে ২৭ আগস্ট যাই মোহাম্মদপুরে। সরেজমিনে দেখা যায়, কক্ষটিতে দুটি টেবিল ও কয়েকটি চেয়ার অগোছালোভাবে পড়ে আছে। কোনো সেবাদানকারী নেই, কোনো সেবাপ্রার্থী নেই।

মোহাম্মদপুরের নাগরিক সেবাকেন্দ্রের উদ্যোক্তা হয়েছিলেন মো. মুস্তাকিম নামের এক ব্যক্তি। তাঁর মুঠোফোন নম্বর সংগ্রহ করে কথা বলে জানা যায়, তিনি আগে একটি কম্পিউটার সেবার দোকান চালাতেন। নাগরিক সেবাকেন্দ্রে নিয়মিত আয় হবে, এই আশায় সেই পেশা ছেড়ে সেবাকেন্দ্রে উদ্যোক্তা হিসেবে যুক্ত হন তিনি।

মুস্তাকিম প্রথম আলোকে বলেন, সরকারের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন; কিন্তু দেননি। মানুষও সেবা নিতে আসেন না। তিনিও কেন্দ্রে যান না।

সরেজমিনে ঘুরে এবং খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ছয়টি নাগরিক সেবাকেন্দ্রের মধ্যে চারটিতে তালা ঝুলছে। দুটি মাঝেমধ্যে খোলা হয়, তবে মানুষ সেবা নিতে খুব একটা আসেন না। যেকোনো সময় এই দুটিও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

মুস্তাকিম প্রথম আলোকে বলেন, সরকারের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন; কিন্তু দেননি। মানুষও সেবা নিতে আসেন না। তিনিও কেন্দ্রে যান না।

অধ্যাপক ইউনূস উদ্বোধন করেন

২০২৫ সালের ২৬ মে ‘এক ঠিকানায় সকল নাগরিক সেবা’ স্লোগানে নাগরিক সেবাকেন্দ্রের যাত্রা শুরু হয়। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় পাইলট প্রকল্পের উদ্বোধন করেন তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।

তখন এই সেবার উদ্বোধন করে প্রধান উপদেষ্টা বলেছিলেন, ‘দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য কমাতে, নানাবিধ হয়রানি রোধে ও ভোগান্তিমুক্ত নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে এ উদ্যোগ যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে।’

অন্যদিকে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেছিলেন, শূন্য বাজেটে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে দেশের বিদ্যমান সম্পদ ব্যবহার করেই সামনে এগিয়ে চলা সম্ভব।

অবশ্য নিজেদের চালু করা এ উদ্যোগ নিজেরাই সচল রাখতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। প্রয়োজনীয় ইন্টারনেট সংযোগ, কম্পিউটার, প্রিন্টার, বায়োমেট্রিক যন্ত্রপাতি কিংবা সরকারি পোর্টালের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ—কোনোটিই যথাসময়ে নিশ্চিত করা হয়নি।

বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য জানতে ফয়েজ আহমদের সঙ্গে নানাভাবে যোগাযোগের চেষ্টা হয়েছে। প্রশ্ন লিখে পাঠানো হয়েছে। গতকাল শুক্রবার রাত পর্যন্ত সাড়া পাওয়া যায়নি।

অবশ্য নিজেদের চালু করা এ উদ্যোগ নিজেরাই সচল রাখতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। প্রয়োজনীয় ইন্টারনেট সংযোগ, কম্পিউটার, প্রিন্টার, বায়োমেট্রিক যন্ত্রপাতি কিংবা সরকারি পোর্টালের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ—কোনোটিই যথাসময়ে নিশ্চিত করা হয়নি।

নাগরিক সেবাকেন্দ্র বন্ধ

পাইলট প্রকল্পের আওতায় রাজধানীর গুলশান, উত্তরা, নীলক্ষেত, গুলিস্তান, মোহাম্মদপুর ও বনশ্রী—এই ছয় জায়গায় ছয়টি সেবাকেন্দ্র স্থাপন করা হয়। বাছাই করা উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে সনদ দেওয়া হয়।

পরিকল্পনা ছিল, নাগরিকেরা কেন্দ্রে এসে প্রয়োজনীয় নথি জমা দেবেন, নির্দিষ্ট সময় পর সেবা বুঝে নেবেন। যেমন বলা হয়েছিল, পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে পাসপোর্ট অফিসে যেতে হবে না। নাগরিক সেবাকেন্দ্রে আবেদনসহ আঙুলের ছাপ দেওয়া যাবে।

নীলক্ষেতের কেন্দ্রটি বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) কার্যালয়ের দুটি কক্ষ নিয়ে চালু করা হয়েছিল। ২৭ আগস্ট দুপুরে গিয়ে সেখানে তালা ঝুলতে দেখা যায়। একজন নিরাপত্তা প্রহরী প্রথম আলোকে বলেন, উদ্যোক্তাকে আর দেখা যায় না। মাঝেমধ্যে সাইনবোর্ড দেখে দু-একজন করে সেবাপ্রার্থী এসে কাউকে না পেয়ে চলে যান।

নীলক্ষেত কেন্দ্রের উদ্যোক্তা রাজিত খান প্রথম আলোকে বলেন, সেবাপ্রার্থীদের যেসব সেবা দেওয়ার কথা ছিল, তার কিছুই দেওয়া যাচ্ছে না। সংসার চালাতে গেলে আয় দরকার। এ জন্য কেন্দ্র বন্ধ রেখে অন্য কাজে যুক্ত হয়েছেন তিনি।

গুলিস্তানের নাগরিক সেবাকেন্দ্রের কার্যালয়টি টেলিফোন এক্সচেঞ্জ অফিসের ভেতরে। ২৭ আগস্ট বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, কার্যালয়ের দরজায় তালা ঝুলছে। আশপাশে কোনো সেবাপ্রার্থীও নেই।

নীলক্ষেত কেন্দ্রের উদ্যোক্তা রাজিত খান প্রথম আলোকে বলেন, সেবাপ্রার্থীদের যেসব সেবা দেওয়ার কথা ছিল, তার কিছুই দেওয়া যাচ্ছে না। সংসার চালাতে গেলে আয় দরকার। এ জন্য কেন্দ্র বন্ধ রেখে অন্য কাজে যুক্ত হয়েছেন তিনি।

‘লোকদেখানো উদ্যোগ’

নাগরিক সেবাকেন্দ্র চালুর উদ্যোগটিকে ‘লোকদেখানো’ বলে মনে করছেন কেউ কেউ। এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত আইসিটি বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, উদ্যোগটি আসলে ‘ওপরে ওপরে’ নেওয়া হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার এটাকে গুরুত্বের সঙ্গে নিলে এর জন্য আলাদা বাজেট করত। সব ধরনের সুবিধা ও প্রচারের ব্যবস্থা করা হতো; কিন্তু তা হয়নি।

উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, সেবাকেন্দ্র চালুর পর সরকারি উদ্যোগে ইন্টারনেট সংযোগও নিশ্চিত করেনি অন্তর্বর্তী সরকার। তাঁদের ভাষ্য, সরকারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি না থাকায় তাঁরা নিজেরা সরকারি নামে ইন্টারনেট সংযোগও নিতে পারেননি।

আইসিটি বিভাগের ডিজিটাল গভর্ন্যান্স ও সিকিউরিটি অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব মো. মজিবর রহমাননাগরিক সেবাকেন্দ্রের কার্যক্রম খুব বেশি টেকসই হয়নি। প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যায়নি। তাই এ নিয়ে আর এগোয়নি সরকার।

উত্তরার নাগরিক সেবাকেন্দ্রের উদ্যোক্তা আশিকুর রহমান মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, আসবাব ও কক্ষ সাজানো ছাড়া সেবা দিতে প্রয়োজনীয় কোনো সরঞ্জাম তিনি পাননি। নিজের ল্যাপটপ দিয়েই প্রথম প্রথম কাজ চালিয়েছেন। পাসপোর্ট অফিস থেকে একটি বায়োমেট্রিক মেশিন (আঙুলের ছাপ নেওয়ার যন্ত্র) দেওয়া হয়েছিল। সেটিও কয়েক মাস আগে ফেরত নেওয়া হয়েছে।

বর্তমান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নাগরিক সেবা উদ্যোগ বন্ধ ঘোষণা করেনি। আবার কেন্দ্রগুলো কার্যত অচল। জানতে চাইলে আইসিটি বিভাগের ডিজিটাল গভর্ন্যান্স ও সিকিউরিটি অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব মো. মজিবর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, নাগরিক সেবাকেন্দ্রের কার্যক্রম খুব বেশি টেকসই হয়নি। প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যায়নি। তাই এ নিয়ে আর এগোয়নি সরকার। তিনি বলেন, প্রয়োজনে ভিন্নভাবে উদ্যোগটি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত না নিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। আগের নেওয়া উদ্যোগগুলো কেন সফল হয়নি, সে বিশ্লেষণও জরুরি। তিনি বলেন, টেকসই সমাধান চিন্তা না করে উদ্যোগ নিলে উদ্যোগের সংখ্যাই বাড়বে; কিন্তু সমস্যার সমাধান হবে না।

‘টেকসই সমাধান দরকার’

নাগরিক সেবাকেন্দ্র যে ধরনের কাঠামো ও উদ্দেশ্য নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল, প্রায় একই রকম সেবা দেয় ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (ইউডিসি)। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ইউনিয়নগুলোতে ডিজিটাল সেন্টার গড়ে তোলা হয়েছে। এসব সেন্টার কতটা কার্যকর, সে প্রশ্ন আছে।

একটি সূত্র বলছে, আইসিটি বিভাগ এখন রুরাল ডিজিটাল সেন্টার নামে সেবাকেন্দ্র চালুর কথা ভাবছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত না নিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। আগের নেওয়া উদ্যোগগুলো কেন সফল হয়নি, সে বিশ্লেষণও জরুরি। তিনি বলেন, টেকসই সমাধান চিন্তা না করে উদ্যোগ নিলে উদ্যোগের সংখ্যাই বাড়বে; কিন্তু সমস্যার সমাধান হবে না।

Read full story at source