গুমের ঘটনায় স্বাধীন তদন্ত নিয়ে শঙ্কা

· Prothom Alo

  • প্রশ্ন উঠেছে গুমের ঘটনা তদন্তের শুরুতেই কীভাবে কোনো বাহিনীকে অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হবে।

  • গুম-সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক সনদে পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্তের কথা বলা হয়েছে।

    Visit asg-reflektory.pl for more information.

বাগেরহাটের মোংলার মিরাজ শেখের কোনো খোঁজ নেই। তাঁর স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যার পর কোস্টগার্ডের সদস্যরা তাঁকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন। যদিও কোস্টগার্ড শুরু থেকেই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

ঘটনার পর পরিবারের সাধারণ ডায়েরি (জিডি), সংবাদ সম্মেলন, বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন—কোনোটিতেই মিরাজের সন্ধান পাওয়া যায়নি। তাঁর বাবা উচ্চ আদালতেও গেছেন। গত ১২ জুলাই হাইকোর্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টদের ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে মিরাজকে খুঁজে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেন। ২৪ আগস্টও পরিবার জানিয়েছে, সাড়ে চার মাস ধরে তাঁর অবস্থান অজানা।

২৫ আগস্ট সচিবালয়ে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির আবাসিক প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠককালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশে কোনো গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেনি।

গুমের অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা স্বাধীন সংস্থা বা কর্তৃপক্ষকে দেওয়ার দাবি থাকলেও সংসদে উত্থাপিত বিলে তা নেই।

এমন পরিস্থিতিতে মিরাজ শেখের পরিণতি কী হয়েছে, তা এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। এই ঘটনা আবার সামনে এনেছে পুরোনো প্রশ্ন—রাষ্ট্রীয় কোনো বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে তদন্ত করবে কে? সংসদে নতুন ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ ঘিরে এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

গুম

অন্তর্বর্তী সরকারের করা ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে গুমের অভিযোগের তদন্তের নিয়ন্ত্রণ ছিল জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের হাতে। কোথাও গোপন আটককেন্দ্র বা বন্দিশালা আছে সন্দেহ হলে কমিশন সেখানে যেতে পারত। কোনো ব্যক্তি গুম হলে তাঁকে পাওয়া বা তাঁর পরিণতি না জানা পর্যন্ত কমিশনের অনুসন্ধান চালিয়ে যাওয়ার বাধ্যবাধকতাও ছিল।

সংসদে বিএনপি সরকারের আনা বিলে সেই কাঠামো বদলেছে। গুমের অভিযোগের ফৌজদারি তদন্তের নিয়ন্ত্রণ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের হাতে রাখা হয়নি। তবে সংসদে উত্থাপিত বিলে নতুন একটি বিষয় যুক্ত হয়েছে—কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী বা তার সদস্যের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে সেই বাহিনী নিজে তদন্ত করতে পারবে না। কোনো পক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বা সরকার স্বপ্রণোদিত হয়ে অন্য শৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা আন্তঃবাহিনী তদন্ত দলকে দায়িত্ব দেবে।

আজ রোববার, ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘সবার আগে ভুক্তভোগী, এখনই পদক্ষেপ’। একই দিনে গুম থেকে প্রত্যেক মানুষের সুরক্ষা-সম্পর্কিত জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সনদে (আইসিপিপিইডি) বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার দুই বছর পূর্ণ হলো।

তারপরও স্বাধীন তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। কারণ, তদন্তকারী সংস্থা বা দলটি অভিযুক্ত বাহিনীর বাইরে হলেও সেটি রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা বাহিনীর কাঠামোর মধ্যেই থাকবে এবং কে তদন্ত করবে, তা নির্ধারণ করবে সরকার। গুমের মতো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তদন্তে সম্ভাব্য অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন একটি তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের যে ব্যবস্থা ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে কেন্দ্র করে করা হয়েছিল, নতুন বিলে তা নেই।

আজ রোববার, ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘সবার আগে ভুক্তভোগী, এখনই পদক্ষেপ’। একই দিনে গুম থেকে প্রত্যেক মানুষের সুরক্ষা-সম্পর্কিত জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সনদে (আইসিপিপিইডি) বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার দুই বছর পূর্ণ হলো।

গুম করে কীভাবে রাখা হয়েছিল, নিজের বয়ানে বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১৫৬৯ গুম, নিখোঁজ–মৃত্যু ২৮৭

হাইকোর্টসংলগ্ন মাজার গেটের সামনে জড়ো হয়ে আওয়ামী লীগের আমলে গুম হওয়া স্বজনদের খোঁজে মানববন্ধন করেছে গুমের শিকার পরিবারগুলোর সংগঠন ‘মায়ের ডাক’। এ সময় অনেককে কাঁদতে দেখা যায়

আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলের শুরু থেকে গুমের ঘটনা সামনে আসতে থাকে। গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের হিসাবে, ২০০৯ সালে দলটি ক্ষমতায় আসার বছরেই ১০টি গুমের ঘটনা নথিভুক্ত হয়; ২০১০ সালে তা বেড়ে হয় ৩৪টি। ওই বছরের ২৫ জুন বিএনপি নেতা ও ঢাকার সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর চৌধুরী আলম নিখোঁজ হলে রাজনৈতিক গুমের ঘটনা ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। ২০১৩-১৪ সালের দিকে এ ধরনের ঘটনা বাড়তে থাকে। ভুক্তভোগীদের বড় অংশই ছিল রাজনৈতিক নেতা-কর্মী।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ২২ দিন পর, ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। কমিশনের দায়িত্ব ছিল ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত গুমের অভিযোগ অনুসন্ধান করা। কমিশন ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে গুম হিসেবে বিবেচনায় নেয়।

গুমের ঘটনায় তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন, বিল সংশোধনের দাবি

এর মধ্যে ১ হাজার ২৮২ জন কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত বেআইনি ও গোপন আটকের পর ফিরে এসেছেন। ২৫১ জন আর ফেরেননি। আরও ৩৬ জনের মরদেহ পাওয়া গেছে। বাস্তবে গুমের ঘটনা ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার পর্যন্ত হতে পারে বলেও কমিশন ধারণা দিয়েছে।

গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের অনুসন্ধানে আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতাও সামনে এসেছে। দেড় হাজারের বেশি অভিযোগের মধ্যে মাত্র প্রায় ২৫০টি ঘটনায় ঘটনার নথিগত প্রমাণ পাওয়া গেছে। বাকিগুলোর নথিগত প্রমাণ না থাকার মূল কারণ থানায় জিডি গ্রহণ না করা।

কমিশনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, র‍্যাব, পুলিশ, পুলিশের গোয়েন্দা শাখা ডিবি ও কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) গুমের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি সংশ্লিষ্টতা ছিল। এর পাশাপাশি ডিজিএফআই, এনএসআইসহ অন্য সংস্থার সংশ্লিষ্টতাও উঠে এসেছে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন

তদন্তের ক্ষমতা ছিল মানবাধিকার কমিশনের হাতে

গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে যুক্ত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করে। পরের জানুয়ারিতে এতে সংশোধনী আনা হয়।

অধ্যাদেশটির গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল—গুমের অভিযোগের তদন্ত সাধারণ পুলিশি কাঠামোর ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়নি। অভিযোগ সরাসরি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে করা যেত। থানায় বা প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অভিযোগ করা হলেও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সেটি কমিশনে পাঠাতে হতো। কমিশন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করত। ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করার বিধান ছিল; প্রয়োজন হলে আরও ৩০ দিন সময় পাওয়া যেত। তদন্ত প্রতিবেদনও প্রথমে কমিশনে জমা পড়ত; কমিশন যাচাই ও অনুমোদনের পর সেটি বিশেষ ট্রাইব্যুনালে পাঠাত।

কমিশনকে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। কারাগার, হাজতখানা, আটককেন্দ্র এবং বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণাধীন অন্য যেকোনো স্থান কমিশন পরিদর্শন করতে পারত। অধ্যাদেশে গুম হওয়া ব্যক্তিকে খোঁজা এবং অপরাধের তদন্ত করা—দুটি আলাদা কাজ হিসেবেও দেখা হয়েছিল। গুম হওয়া ব্যক্তিকে পাওয়া অথবা তাঁর পরিণতি জানা না যাওয়া পর্যন্ত কমিশনকে অনুসন্ধান চালিয়ে যেতে হতো। প্রতি তিন মাসে অভিযোগকারী ও পরিবারকে অনুসন্ধানের অগ্রগতি জানাতে হতো।

অধ্যাদেশে বিচারের জন্য বিশেষ গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার ট্রাইব্যুনালের বিধান ছিল। কমিশনের প্রতিবছর গুমের পরিসংখ্যান, ধরন ও সুপারিশ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের বাধ্যবাধকতাও ছিল।

পরে অধ্যাদেশটি সংসদে বিল হিসেবে এনে অনুমোদন করা হয়নি। সাংবিধানিক সময়সীমা ১০ এপ্রিল শেষ হওয়ায় ১১ এপ্রিল থেকে সেটি কার্যকারিতা হারায়। তখন বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে আরও সমৃদ্ধ ও ভালো আইন করবেন তাঁরা।

বিএনপি সরকারের বিল এখন সংসদে

অধ্যাদেশটি কার্যকারিতা হারানোর পর ২৭ জুলাই আইনের নতুন খসড়া প্রকাশ করে বিএনপি সরকার। ৩ আগস্ট মন্ত্রিসভা অনুমোদন দেয় এবং ২৭ আগস্ট বিলটি সংসদে তোলা হয়। তবে বিলটি উত্থাপনের আগেই বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন। তাঁদের অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের বদলে সরকার পৃথকভাবে ‘খণ্ডিত’ সংস্কার করছে।

 ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’–এর খসড়া প্রকাশের পর মতামতের জন্য মাত্র এক দিন সময় রাখা হয়। মাত্র এক দিনের সময় দেওয়াকে ‘প্রহসনমূলক’ বলে সমালোচনা করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি অন্তত দুই সপ্তাহ সময় দিয়ে গুমের ভুক্তভোগী, তাঁদের পরিবার ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নেওয়ার দাবি জানায়।

সংসদে ওঠা বিলে গুমকে স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিন-অযোগ্য ও আপস-অযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সাধারণ গুমের সাজা সর্বনিম্ন তিন বছর থেকে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন এবং সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা জরিমানা। গুমের ফলে মৃত্যু হলে, মরদেহ পাওয়া গেলে অথবা পাঁচ বছরেও ব্যক্তিকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা না গেলে জড়িত ব্যক্তিদের মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন অথবা সর্বনিম্ন পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।

গোপন আটককেন্দ্র স্থাপন ও পরিচালনা অপরাধ হবে। চেষ্টা, সহায়তা ও ষড়যন্ত্রের দায় থাকবে। সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ বা অধস্তনের অপরাধের দায়ও রাখা হয়েছে।

নিখোঁজ বাবা পারভেজ হোসেনের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে মেয়ে আদিবা ইসলাম। গুম হওয়া ব্যক্তিদের ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে তাঁদের স্বজনেরা ‘মায়ের ডাক’-এর ব্যানারে মানববন্ধন করেন।

তদন্তের স্বাধীনতা নিয়ে সংশয়

২০২২ সালের আগস্টে বিএনপি দেশে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনায় জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছিল।

সংসদে উত্থাপিত বিলের ১৪(৩) ধারা অনুযায়ী, কোনো বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ এলে সেই বাহিনী ওই ঘটনা তদন্ত করতে পারবে না। তবে এতে তদন্ত কতটা স্বাধীন হবে, সেই প্রশ্ন রয়ে গেছে।

প্রথম প্রশ্নটি আসে গুমের ঘটনার তদন্তের একেবারে শুরুতেই—কোন বাহিনীকে অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হবে? গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের অনুসন্ধানে এসেছে, ভুক্তভোগীদের সাধারণত সাদাপোশাকে তুলে নেওয়া হতো এবং পরিচয় গোপন করতে এক বাহিনীর সদস্যরা অন্য বাহিনীর নাম ব্যবহার করতেন। অনেক ক্ষেত্রে এক বাহিনীর সদস্যরা আরেক বাহিনীর পরিচয় দিয়ে মানুষকে তুলে নিয়ে ধূম্রজাল তৈরি করতেন। কমিশনের প্রতিবেদনে ডিবি নিজেদের র‍্যাব এবং র‍্যাব নিজেদের অন্য বাহিনীর সদস্য হিসেবে পরিচয় দেওয়ার উদাহরণও এসেছে।

ফলে পরিবার বা প্রত্যক্ষদর্শী যদি নিশ্চিতই না হন কোন বাহিনী কাউকে তুলে নিয়েছে, তাহলে শুরুতেই ১৪(৩) ধারা কার্যকর করা কঠিন হতে পারে।

দ্বিতীয় প্রশ্নটি তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিয়ে। কারণ, অভিযুক্ত বাহিনীকে বাদ দেওয়া হলেও স্বাধীন কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে তদন্তের দায়িত্ব না দিয়ে তা রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা বাহিনীর কাঠামোর মধ্যেই থাকছে।

তদন্ত কমিশন বলেছে, গুমের অনেক ঘটনায় একাধিক আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সংস্থা যৌথভাবে কাজ করেছে। এক বাহিনী কোনো ব্যক্তিকে তুলে নেওয়া, আরেক বাহিনীর কাছে হস্তান্তর, অন্য স্থানে আটক রাখা এবং পরে মুক্তি বা হত্যার পর্যায়ে ভিন্ন ভিন্ন দল বা সংস্থার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। যৌথ অভিযানের ঘটনাও কমিশন শনাক্ত করেছে। ফলে শুধু এক বাহিনীর পরিবর্তে আরেক বাহিনীকে তদন্তের দায়িত্ব দিলেই স্বার্থের সংঘাত দূর হবে কি না, সেই প্রশ্ন থেকে যায়।

গুম প্রতিরোধ–সম্পর্কিত যে আন্তর্জাতিক সনদে বাংলাদেশ যুক্ত হয়েছে, তার ১২(১) অনুচ্ছেদে গুমের অভিযোগ দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে পরীক্ষা এবং প্রয়োজন হলে পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্তের কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া ১২(৪) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে এমন ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে, যাতে গুমের অপরাধে সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা অভিযোগকারী, সাক্ষী, স্বজন বা তদন্তে যুক্ত ব্যক্তিদের ওপর চাপ, ভয়ভীতি বা প্রতিশোধের মাধ্যমে তদন্তের অগ্রগতিকে প্রভাবিত করার অবস্থানে না থাকেন।

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ

জাতিসংঘের গুমবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপের দুই সদস্যের কারিগরি প্রতিনিধিদল ২০২৫ সালের ১৫ থেকে ১৮ জুন বাংলাদেশ সফর করে। সরকার, গুম তদন্ত কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে বৈঠকের পর তারা স্বাধীন নজরদারি ও দায়মুক্তি বন্ধের সুপারিশ দেয়। এরপর ২০২৬ সালের ১৭ জুন জাতিসংঘের গুমবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপসহ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশের প্রস্তাবিত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের খসড়া নিয়ে সরকারকে আনুষ্ঠানিক পর্যবেক্ষণ পাঠান।

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, গুম হওয়া ব্যক্তিকে খোঁজা আর অপরাধীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্ত এক বিষয় নয়। গুমের খবর পাওয়া মাত্র আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা মামলার অপেক্ষা না করে অনুসন্ধান শুরু হওয়া উচিত। ব্যক্তির ভাগ্য ও অবস্থান পুরোপুরি পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত তা চালাতে হবে। পরিবারেরও সেই অনুসন্ধানে অংশগ্রহণের অধিকার থাকা উচিত।

এই মানদণ্ডে বাগেরহাটের মিরাজ শেখের ঘটনাটিই একটি বাস্তব পরীক্ষা বলে মনে করেন মানবাধিকারকর্মীরা। মিরাজ শেখের পরিবার অভিযোগ করেছে, উচ্চ আদালত নির্দেশ দিয়েছেন; কিন্তু নিখোঁজের সাড়ে চার মাস পরও তিনি কোথায়—সেই উত্তর মেলেনি।

তা ছাড়া ২০২৫ সালের গুমবিরোধী অধ্যাদেশে গুমের অনুসন্ধান ও তদন্তের অংশ হিসেবেই জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে আটকস্থল পরিদর্শনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। সংসদে ওঠা নতুন গুমবিরোধী বিলে সেই ক্ষমতা নেই।

জুনে বাংলাদেশকে পাঠানো জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণ বলেছে, গুম প্রতিরোধে পুলিশ, গোয়েন্দা বা সামরিক—যে সংস্থারই হেফাজত হোক না কেন, সব আটকস্থল স্বাধীন কর্তৃপক্ষের পরিদর্শনের আওতায় থাকা প্রয়োজন। আটক ব্যক্তির নাম, আটকের সময়, স্থান, কোন কর্মকর্তা আটক করেছেন, কোথায় স্থানান্তর করা হয়েছে—এসবের পূর্ণাঙ্গ ও হালনাগাদ রেজিস্টারও থাকতে হবে।

বিশেষ ট্রাইব্যুনালও থাকছে না

২০২৫ সালের অধ্যাদেশে প্রতিটি বিভাগ বা জেলায় প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার ট্রাইব্যুনাল করার ব্যবস্থা ছিল। বিচারক হতেন জেলা ও দায়রা জজ পদমর্যাদার কর্মকর্তা। কমিশনের সুপারিশে বিশেষ প্রসিকিউটর নিয়োগেরও সুযোগ ছিল। সংসদে উত্থাপিত বিলে আলাদা গুম ট্রাইব্যুনালের কাঠামো রাখা হয়নি। বিচার হবে দায়রা জজ আদালতে।

সাধারণ দায়রা আদালতে বিচার নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। গুমের মামলায় সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থার নথি, কমান্ড চেইন, একাধিক বাহিনীর ভূমিকা, দীর্ঘ গোপন আটক এবং ডিজিটাল ও ফরেনসিক আলামতের মতো জটিল বিষয় থাকবে। বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বদলে সাধারণ দায়রা আদালতে বিচার হলে এসব মামলা পরিচালনার জন্য বিচারক, প্রসিকিউটর ও তদন্তকারীদের সেই সক্ষমতা আছে কি না, এমন বিষয়ও সামনে এসেছে।

অভিযোগ দিলে নতুন ভয়

২০২৫ সালের অধ্যাদেশে বিচার শেষে আদালত যদি নিশ্চিত হতেন যে গুমের অভিযোগটি জেনেশুনে মিথ্যা ও হয়রানির উদ্দেশ্যে করা হয়েছে, তাহলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড দেওয়া যেত। বিলে এই সাজা বাড়িয়ে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মিথ্যা অভিযোগ ঠেকানোর প্রয়োজনীয়তা থাকলেও গুমের ক্ষেত্রে এই বিধানটির প্রভাব অন্য অপরাধের চেয়ে আলাদা হতে পারে। কারণ, গুমের অভিযোগ সাধারণত রাষ্ট্রীয় কোনো বাহিনী বা ক্ষমতাশালী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আসে। সাক্ষী ও পরিবারের সদস্যরা এমনিতেই নিরাপত্তাহীনতায় থাকেন। অভিযোগ শেষ পর্যন্ত প্রমাণ করতে না পারা এবং ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা অভিযোগ করা—দুটির মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বাস্তবে কীভাবে নিশ্চিত হবে, সেটি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

এ ছাড়া ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে গুমের কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারের তত্ত্বাবধান ছিল জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের হাতে, আর নতুন বিলে তা সরকারের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছে। গুম–সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের অনুসন্ধানে গ্রেপ্তারের তারিখ বদলানো এবং গোপন আটকের সময়কাল নথি থেকে আড়াল করার তথ্য এসেছে। ফলে গুমের তথ্যভান্ডার কে নিয়ন্ত্রণ করবে এবং তথ্যের অখণ্ডতা কীভাবে নিশ্চিত হবে, তা ভবিষ্যৎ তদন্ত ও বিচারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী মনে করেন, কোন বাহিনী গুমে জড়িত, শুরুতেই তা ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষে শনাক্ত করা কঠিন। সবচেয়ে নিরাপদ হলো একটি স্বাধীন সংস্থার মাধ্যমে তদন্ত করা, যার নিয়ন্ত্রণ পুলিশ বা কোনো বাহিনীর হাতে থাকবে না। তাহলেই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত সম্ভব হবে।

Read full story at source