অন্তরের ব্যাধি থেকে মুক্তি পাওয়ার ৭ উপায়

· Prothom Alo

মানবদেহে এমন একটি সূক্ষ্ম অথচ অতীব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ রয়েছে, যার সুস্থতার ওপর সমগ্র জীবনের আলো ও অন্ধকার নির্ভর করে। সে অঙ্গটি হলো ‘কলব’ বা অন্তর। মানুষের চিন্তা, চরিত্র, নৈতিকতা ও বাহ্যিক কর্মের চালিকা শক্তি মূলত এই হৃৎপিণ্ড।

এ কারণেই রাসুল (সা.) অন্তরের পরিশুদ্ধিকে সমগ্র মানবদেহের সুস্থতার মূল মাপকাঠি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

Visit syntagm.co.za for more information.

তিনি বলেন, ‘জেনে রেখো, শরীরের ভেতরে একটি মাংসপিণ্ড রয়েছে, তা যদি সুস্থ ও সংশোধিত থাকে, তবে সমগ্র দেহই সুস্থ থাকে; আর তা নষ্ট হয়ে গেলে পুরো দেহই বিনষ্ট হয়ে যায়। শুনে রাখো, সেটিই হলো অন্তর।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২)

বাহ্যিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সুস্থতা ও পরিচ্ছন্নতার চেয়ে আত্মিক ব্যাধি থেকে অন্তরকে সুরক্ষিত রাখা একজন মুমিনের জন্য বহুগুণ বেশি জরুরি। পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে অন্তরের যাবতীয় ব্যাধি নিরাময় ও প্রশান্তি লাভের সাতটি অকাট্য উপায় আলোচনা করা হলো।

সুরা আনফাল, আয়াত: ২প্রকৃত মুমিন তো তারাই, যাদের সামনে আল্লাহর স্মরণ করা হলে তাদের হৃদয় কম্পিত হয় এবং যখন তাদের সামনে তাঁর আয়াত তিলাওয়াত করা হয়, তখন তা তাদের ইমান বৃদ্ধি করে।

১. অর্থ ও মর্ম বুঝে কোরআন পাঠ

অন্তরকে সব ধরনের সংশয়, অহংকার ও আত্মিক ব্যাধি থেকে মুক্ত করার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিষেধক হলো মহান আল্লাহর কালাম। এটি পথহারা হৃদয়ের একমাত্র দিশা।

আল্লাহ–তাআলা ঘোষণা করেন, ‘হে মানবজাতি, তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে এসেছে উপদেশ এবং অন্তরের যাবতীয় ব্যাধির আরোগ্য, আর মুমিনদের জন্য হিদায়েত ও রহমত।’ (সুরা ইউনুস, আয়াত: ৫৭)

অর্থ ও মর্ম উপলব্ধি করে কোরআন পাঠ করলে তা সরাসরি অন্তরে আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং ইমানের গভীরতা বৃদ্ধি করে।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘প্রকৃত মুমিন তো তারাই, যাদের সামনে আল্লাহর স্মরণ করা হলে তাদের হৃদয় কম্পিত হয় এবং যখন তাদের সামনে তাঁর আয়াত তিলাওয়াত করা হয়, তখন তা তাদের ইমান বৃদ্ধি করে।’ (সুরা আনফাল, আয়াত: ২)

২. আল্লাহর কাছে প্রার্থনা

মানব অন্তর অত্যন্ত পরিবর্তনশীল। আজ যে হৃদয় সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত, পার্থিব প্রলোভন ও পরীক্ষার মুখে, কাল তা বিচ্যুত হয়ে পড়তে পারে। তাই অন্তরের স্থিতি ও হিদায়েতের ওপর অটল থাকার জন্য সার্বক্ষণিক আল্লাহর কাছে দোয়া করা আবশ্যক।

মৃত্যুকে স্মরণ: কঠিন হৃদয় নরম করার একটি উপায়

রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং অন্তরের দৃঢ়তার জন্য দোয়া করতেন, ‘আল্লাহুম্মা মুসাররিফাল কুলুব, সাররিফ কুলুবানা আলা তাআতিক।’ অর্থ: ‘হে অন্তরসমূহ পরিবর্তনকারী আল্লাহ! আমাদের অন্তরগুলোকে আপনার আনুগত্যের দিকে ফিরিয়ে দিন ও অবিচল রাখুন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৫৪)

৩. কবরের বাস্তবতা স্মরণ

পার্থিব জীবনের মোহ, ক্ষমতার দম্ভ ও পাপের সাময়িক আনন্দ মানুষকে এমনভাবে অন্ধ করে দেয় যে সে একদিন সবকিছু ছেড়ে মাটির কবরে চলে যাবে—এই চরম সত্যটি ভুলে বসে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) এই বিভ্রান্তি দূর করতে নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমরা পার্থিব জীবনের সব স্বাদ বিনষ্টকারী মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করো।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩০৭)

জাগতিক প্রাচুর্য মানুষের শারীরিক আরাম দিতে পারে, কিন্তু অন্তরের শূন্যতা পূরণ করতে পারে না। হৃদয়ের প্রকৃত প্রশান্তি শুধু আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমেই সম্ভব।

এই আত্মোপলব্ধিকে জীবন্ত করে তোলে কবর জিয়ারত। যে ব্যক্তি একসময় দুনিয়ায় নানা পরিকল্পনা নিয়ে দাপিয়ে বেড়িয়েছে, আজ সে মাটির নিচে একাকী শায়িত—এই দৃশ্য মানুষের কঠিন অন্তরকে নরম করে।

রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমি পূর্বে তোমাদের কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম; এখন তোমরা কবর জিয়ারত করো। কেননা, তা অন্তরকে কোমল করে, চোখে অশ্রু আনে এবং পরকালের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৩৪৮৭)

৪. জিকিরের প্রশান্তি অর্জন

জাগতিক প্রাচুর্য মানুষের শারীরিক আরাম দিতে পারে, কিন্তু অন্তরের শূন্যতা পূরণ করতে পারে না। হৃদয়ের প্রকৃত প্রশান্তি শুধু আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমেই সম্ভব।

কোরআনে বলা হয়েছে, ‘জেনে রেখো, শুধু আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমেই অন্তরসমূহ পরম প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা রাদ, আয়াত: ২৮)

নিয়মিত জিকির আত্মাকে সজীব রাখে এবং শয়তানের প্ররোচনা থেকে রক্ষা করে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের জিকির করে এবং যে জিকির করে না, তাদের উপমা হলো জীবিত ও মৃতের মতো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪০৭)

জীবন্ত হৃদয়: মুমিনকে আল্লাহর দেওয়া আধ্যাত্মিক রিজিক

৫. নিয়মিত তওবার চর্চা

মানুষ যখন কোনো পাপে লিপ্ত হয়, তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে যায়। ক্রমাগত গুনাহ করতে থাকলে পুরো অন্তরটাই মরিচা পড়া কালো পাত্রের মতো হয়ে যায়, যা সত্যকে অনুধাবন করতে পারে না। এই আত্মিক কালিমা দূর করার একমাত্র উপায় হলো আন্তরিক তওবা ও ইস্তিগফার।

রাসুলুল্লাহ (সা.) অভয় দিয়ে বলেছেন, ‘পাপ থেকে খাঁটিভাবে তওবাকারী ব্যক্তি এমন নিষ্পাপ হয়ে যায়, যেন তার কোনো পাপই ছিল না।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪২৫০)

৬. সৎ মানুষের সঙ্গ অবলম্বন

মানুষ তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ ও বন্ধুবান্ধবের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়। অসৎ ও দুনিয়ামুখী মানুষের সান্নিধ্য অন্তরে পাপের প্রতি আকর্ষণ তৈরি করে, পক্ষান্তরে নেককার ও চরিত্রবান মানুষের সংস্পর্শ ভালো কাজের অনুপ্রেরণা জোগায়।

সুরা নুর, আয়াত: ৩০মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে। এটিই তাদের জন্য অধিকতর পবিত্র পদ্ধতি।

রাসুল (সা.) বন্ধু নির্বাচনের ব্যাপারে কড়া সতর্কতা উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘মানুষ তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর ধর্ম ও স্বভাবের ওপর গড়ে ওঠে। অতএব, তোমাদের প্রত্যেকে যেন লক্ষ করে সে কাকে নিজের অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করছে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৭৮)

৭. দৃষ্টির সংযম

অন্তরে ব্যাধি প্রবেশের প্রধানতম প্রবেশদ্বার হলো মানুষের চোখ। অপলক কুদৃষ্টি সরাসরি অন্তরে বিষাক্ত তীরের মতো আঘাত হানে এবং অন্তরের পবিত্রতা নষ্ট করে।

আল্লাহ–তাআলা নির্দেশ দেন, ‘মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে। এটিই তাদের জন্য অধিকতর পবিত্র পদ্ধতি।’ (সুরা নুর, আয়াত: ৩০)

দৃষ্টির হেফাজত না করলে অন্তরে আধ্যাত্মিক নুর ও ইবাদতের মিষ্টতা অবশিষ্ট থাকে না।

সুস্থ অন্তরই পরকালে মুক্তির একমাত্র পাথেয়। কেয়ামতের দিন ধনসম্পদ বা সন্তানসন্ততি কোনো কাজে আসবে না; কাজে আসবে কেবল আল্লাহর দরবারে পেশ করা ‘কলবে সালিম’ বা সুস্থ–পরিশুদ্ধ অন্তর। (সুরা শুআরা, আয়াত: ৮৮–৮৯)

অতএব, দেহের বাহ্যিক পরিচর্যার পাশাপাশি অন্তরের ব্যাধি নিরাময়ে নিয়মিত আত্মশুদ্ধির চর্চা করাই একজন মুমিনের জীবনের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।

  • নাহিদা সুলতানা: আলেমা ও প্রাবন্ধিক

    [email protected]

যে ৫ কারণে অন্তর নষ্ট হয়

Read full story at source