মহানবী (সা.) শিশুদের যেভাবে স্নেহ করতেন

· Prothom Alo

শিশুদের লালন-পালন ও তাদের সঙ্গে মানবিক আচরণের ক্ষেত্রে বিশ্বমানবতার জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ হলেন মহানবী মুহাম্মদ (সা.)।

তিনি ছিলেন শিশুদের প্রতি অতুলনীয় স্নেহশীল ও মমতাময়। তিনি কেবল শিশুদের নসিহত করতেন না; বরং তাদের কোলে তুলে নিতেন, কাঁধে চড়াতেন, তাদের সঙ্গে নির্মল রসিকতা করতেন, তাদের ছোট ছোট আবেগ-আবদারকে পরম গুরুত্ব দিতেন এবং সার্বক্ষণিক তাদের কল্যাণে দোয়া করতেন।

Visit biznow.biz for more information.

সুন্নাহর আলোকে শিশুদের প্রতি নববি শিষ্টাচার ও ভালোবাসার রূপরেখা তুলে ধরা হলো:

১. শিশুদের স্নেহ করতেন নবীজি

শিশুরা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ নেয়ামত। নবীজি (সা.) শিশুদের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা প্রদর্শন করতেন এবং উম্মতকে ছোটদের প্রতি সদয় হওয়ার তাগিদ দিতেন।

তিনি বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি আমাদের ছোটদের স্নেহ করে না এবং আমাদের বড়দের অধিকার ও সম্মান রক্ষা করে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৪৩)

অর্থাৎ শিশুর প্রতি মমতা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়; এটি নববি জীবনাদর্শের অন্যতম মৌলিক দাবি।

২. সব শিশুর প্রতি মানবিক দৃষ্টি

নবীজি (সা.) মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সব শিশুর প্রতি স্নেহশীল আচরণ করতেন। শিশুর নিষ্পাপ স্বভাবকে স্বীকৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতিটি নবজাতকই স্বভাবজাত ইসলাম বা ফিতরাতের ওপর জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার পিতা-মাতা তাকে ইহুদি, খ্রিষ্টান কিংবা অগ্নিপূজক হিসেবে গড়ে তোলে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩৫৮)

এই ঘোষণা প্রমাণ করে, প্রতিটি শিশুই জন্মগতভাবে ভালোবাসা, সম্মান ও সুন্দর পরিবেশে বেড়ে ওঠার অধিকার রাখে।

শিশু যখন আল্লাহকে দেখতে চায়

৩. এতিম ও সহায়হীন শিশুদের পুনর্বাসন

পিতা-মাতার স্নেহবঞ্চিত এতিম শিশুদের প্রতি তাঁর হৃদয়ে ছিল বিশেষ মমতা। এতিমের মাথায় স্নেহের হাত রাখা, তাদের সার্বিক প্রয়োজন মেটানো ও নিরাপদ ভবিষ্যতের ব্যবস্থা করার বিষয়ে তিনি সর্বোচ্চ মর্যাদা ঘোষণা করেছেন।

তিনি স্বীয় তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল সামান্য ফাঁক করে ইঙ্গিত করে বলেন: ‘আমি ও এতিম প্রতিপালনকারী জান্নাতে এভাবে পাশাপাশি অবস্থান করব।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৩০৪)

৪. শিশুর মনস্তত্ত্ব বোঝা ও খেলাধুলা

নবীজি (সা.) শিশুদের মানসিক পরিপক্বতা ও বয়সের স্তর খুব গভীরভাবে বুঝতেন। সাহাবি আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমায়েরের একটি ছোট পোষা পাখি মারা গেলে শিশুটির বিষণ্ণতা দূর করতে নবীজি (সা.) পরম মমতায় তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন: ‘হে আবু উমায়ের, তোমার নুগায়ের (ছোট পাখিটি) কী করেছে?’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১২৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১৫০)

একটি অবোধ শিশুর খেলার সাথি হারানোর কষ্টকেও তিনি অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে মূল্যায়ন করেছিলেন।

৫. শিশুর আবদারের মূল্যায়ন

শিশুদের স্বাভাবিক আবদারকে নবীজি (সা.) কখনো বিরক্তির চোখে দেখতেন না। একবার তিনি হাসান বা হুসাইন (রা.)-কে কোলে নিয়ে নামাজের ইমামতিতে দাঁড়ালেন। নামাজের একটি সিজদা তিনি অস্বাভাবিক দীর্ঘ করলেন। সাহাবিরা মাথা তুলে দেখলেন, শিশুটি তাঁর পিঠের ওপর চড়ে বসে আছে।

নামাজ শেষে সাহাবিরা কারণ জানতে চাইলে নবীজি (সা.) বললেন, ‘আমার এই সন্তানটি আমার পিঠে সওয়ার হয়েছিল; তার মনের আনন্দ ও তৃপ্তি পূর্ণ হওয়ার আগে আমি তাকে জোর করে নামিয়ে দেওয়া পছন্দ করিনি।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ১১৪১)

নামাজের মতো পরম গম্ভীর ইবাদতেও তিনি শিশুর নিষ্পাপ আবেগকে মর্যাদা দিয়েছেন।

৬. আনন্দ ও প্রফুল্লতা দান

শিশুদের সঙ্গে সর্বদা রুক্ষ বা গুরুগম্ভীর থাকা নববি নীতি নয়। দীর্ঘ ১০ বছর নবীজির সান্নিধ্যে থাকা কিশোর সাহাবি আনাস (রা.)-কে নবীজি স্নেহভরে কৌতুক করে ‘হে দুই কানওয়ালা!’ বলে সম্বোধন করতেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৯২)

এই স্নেহপূর্ণ রসিকতা শিশুর মানসিক বিকাশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

গর্ভপাত হয়ে যাওয়া শিশু হবে নাজাতের উপায়

৭. ভুলের কারণে তিরস্কার পরিহার

শেখার প্রক্রিয়ায় শিশুদের ভুল হওয়া খুবই স্বাভাবিক। তাই ভুলের কারণে তাদের প্রতিনিয়ত গালমন্দ বা অপমান করা উচিত নয়।

আনাস (রা.) বলেন, ‘আমি দীর্ঘ ১০ বছর রাসুলের খেদমত করেছি। আল্লাহর কসম! তিনি কোনো দিন আমার প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করে ‘উফ’ পর্যন্ত বলেননি। কোনো কাজ করে ফেললে বলেননি কেন করলে, কিংবা কোনো কাজ না করলে কখনো জবাবদিহি চেয়ে তিরস্কার করেননি’। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৩০৯)

শাসন হতে হবে কোমলতা ও সংশোধনের উদ্দেশ্যে, রাগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে নয়।

৮. আতঙ্কিত বা ভীত না করা

শিশুর আকস্মিক ভুল বা অসতর্কতায় তাকে ভয় দেখানো নবীজির সুন্নাহর পরিপন্থী। একবার হাসান বা হুসাইন (রা.) নবীজির কোলে থাকা অবস্থায় অসাবধানতাবশত পেশাব করে দিলে সাহাবিরা দ্রুত তাকে টেনে সরিয়ে নিতে চাইলেন।

নবীজি (সা.) সাহাবিদের থামিয়ে বললেন, ‘শিশুর প্রস্রাবের গতি হঠাৎ বন্ধ করে তাকে আতঙ্কিত কোরো না; তাকে স্বাভাবিকভাবে শেষ করতে দাও।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৯০৫৯)

৯. সর্বদা কল্যাণ ও বরকতের দোয়া

শিশুর অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে অনেক অভিভাবক বদদোয়া বা অভিশাপ দিয়ে ফেলেন, যা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

মদিনার নবজাতক ও শিশুদের নবীজির কাছে নিয়ে আসা হলে তিনি পরম স্নেহে তাদের জন্য বরকত ও কল্যাণের দোয়া করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৪৬৮)

  • মুফতি ইবরাহীম আল খলীল: শিক্ষক, জামিয়া আরাবিয়া আশরাফুল মাদারিস, ঢাকা।

তিন শিশু দোলনা থেকে কথা বলেছিল

Read full story at source