মহাকাশের ভয়ংকর ঝড় পৃথিবীতে আঘাত হানলে কী হবে
· Prothom Alo

সকালবেলা অ্যালার্মের কর্কশ শব্দে ঘুম থেকে উঠলেন। চোখ কচলাতে কচলাতে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলেন, কোনো সিগন্যাল নেই। ভাবলেন, হয়তো সিম কোম্পানির আবার কোনো নতুন নাটক! ওয়াইফাই চেক করতে গিয়ে দেখলেন ইন্টারনেট তো দূরের কথা, পুরো এলাকার বিদ্যুৎ ব্যবস্থাই গায়েব! অফিসের রাস্তা দেখার জন্য গুগল ম্যাপ খুলবেন, জিপিএসও কাজ করছে না। এমন অবস্থা হতে পারে শুধু মহাশূন্যের কোনো খামখেয়ালিপনা বা সূর্যের একটি ছোটখাটো ‘ঢেকুর’ তোলার ফলে!
Visit rouesnews.click for more information.
মহাকাশের আবহাওয়া আমাদের পৃথিবীর রোজকার জীবনযাত্রাকে কতটা নাকাল করে দিতে পারে, তা আমরা সাধারণ মানুষ খুব একটা বুঝতে না পারলেও বিজ্ঞানীরা ঠিকই ভয়ে তটস্থ। লয়েডসের ২০২৫ সালের একটি আঁতকে ওঠার মতো হিসাব বলছে, বড়সড় কোনো মহাজাগতিক ঝড় যদি পৃথিবীতে আঘাত হানে, তবে মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় ২.৪ ট্রিলিয়ন ডলার পুরোপুরি হাওয়া হয়ে যাবে। এই বিশাল ধ্বংসযজ্ঞ ও ব্ল্যাকআউট থেকে আমাদের বাঁচাতে যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া দপ্তর ‘মেট অফিস’ এক অভিনব ব্যবস্থা নিয়েছে। তাদের সদর দপ্তরের একটি বিশাল কন্ট্রোল রুমে একদল গবেষক দিনরাত ২৪ ঘণ্টা, বছরে ৩৬৫ দিন একদৃষ্টে বড় বড় স্ক্রিনে সূর্যের দিকে তাকিয়ে বসে আছেন। তাদের কাজ একটাই—সূর্যমামা কখন বিগড়ে যায়, তার ওপর কড়া নজরদারি করা!
মহাকাশ থেকে মিল্কিওয়ে দেখতে কেমনবড়সড় কোনো মহাজাগতিক ঝড় যদি পৃথিবীতে আঘাত হানে, তবে মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় ২.৪ ট্রিলিয়ন ডলার পুরোপুরি হাওয়া হয়ে যাবে।
সূর্যের মুড সুইং
মহাকাশের এই বৈরী আবহাওয়ার মূল খলনায়ক কিন্তু খোদ সূর্য। এর পৃষ্ঠে মাঝেমধ্যেই প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় সৌরশিখা। বিপদটা এতটাই বাস্তব ও ভয়াবহ যে, যুক্তরাজ্য সরকার তাদের জাতীয় ঝুঁকি নিবন্ধনের তালিকায় মহাকাশ ঝড়কে বেশ ওপরের দিকেই জায়গা দিয়েছে। মেট অফিসের স্পেস ফোরকাস্টিং টিমের সদস্য রিচার্ড স্টোন বেশ জোর দিয়েই জানালেন, ‘সূর্যের পৃষ্ঠে ঘটা যেকোনো পরিবর্তন স্ক্যান করে পৃথিবীর মানুষকে আগেভাগে সতর্ক করাই তাদের মূল কাজ, যাতে বড় ধরনের ক্ষতির হাত থেকে বাঁচা যায়।’
তবে মুশকিল হলো, তাদের এই পূর্বাভাস দেওয়ার প্রযুক্তি এখনো বেশ কাঁচা। সূর্য থেকে কোনো ঝড় পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসতে দেখলে বিজ্ঞানীরা হয়তো তিন দিন আগে তা টের পান। কিন্তু এরপর মহাকাশের ওই বিশাল শূন্যতায় সেই ঝড়ের আর কোনো হদিস মেলে না!
যুক্তরাজ্যের অ্যাবেরিস্টউইথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক হিউ মরগানএকেবারে পৃথিবী থেকে দশ লাখ মাইল দূরে থাকা কোনো স্যাটেলাইটে এসে ধাক্কা খাওয়ার পর বিজ্ঞানীরা আবার এর অস্তিত্ব টের পান। এরপর তাদের হাতে সময় থাকে বড়জোর এক ঘণ্টা!
এই দুর্বলতা কাটাতেই যুক্তরাজ্যের অ্যাবেরিস্টউইথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক হিউ মরগানের নেতৃত্বে নর্থামব্রিয়া, ডারহাম এবং রিডিং ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক কোমর বেঁধে নেমেছেন। তাঁরা এমন এক স্মার্ট অ্যালার্ম সিস্টেম তৈরি করতে চাইছেন, যাতে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানিগুলো বা বিমান সংস্থাগুলো আগেভাগেই সাবধানে থাকার সুযোগ পায়।
মহাকাশের শব্দ শুনতে কেমনরিচার্ড স্টোন বেশ জোর দিয়েই জানালেন, ‘সূর্যের পৃষ্ঠে ঘটা যেকোনো পরিবর্তন স্ক্যান করে পৃথিবীর মানুষকে আগেভাগে সতর্ক করাই তাদের মূল কাজ, যাতে বড় ধরনের ক্ষতির হাত থেকে বাঁচা যায়।’
টেলিগ্রাফের তার যখন নিজেই কথা বলত!
বিজ্ঞানীদের এত সতর্কতার পেছনে একটা বড় ঐতিহাসিক কারণ আছে। ১৮৫৯ সালে ক্যারিংটন ইভেন্ট নামে এক ভয়াবহ ভূ-চৌম্বকীয় ঝড় পৃথিবীতে আছড়ে পড়েছিল। ইংরেজ জ্যোতির্বিজ্ঞানী রিচার্ড ক্যারিংটনের নামে নামকরণ করা এই ঝড়ের সময় পৃথিবীতে অদ্ভুত সব কাণ্ড ঘটেছিল। তখন তো আর ইন্টারনেট বা স্মার্টফোন ছিল না, যোগাযোগের ভরসা ছিল সদ্য শুরু হওয়া টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা। সেই ঝড়ের চোটে টেলিগ্রাফের তারগুলো থেকে অদ্ভুত গুণগুণ শব্দ আও স্ফুলিঙ্গ বের হতে শুরু করেছিল। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, অপারেটররা বিদ্যুতের কোনো সংযোগ ছাড়াই সেই টেলিগ্রাফ যন্ত্রগুলো দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছিলেন! মহাকাশ থেকে আসা চার্জের পরিমাণ এতটাই বেশি ছিল যে, ব্যাটারি ছাড়াই সিগন্যাল আদান-প্রদান করা যাচ্ছিল।
কখনো সূর্য একেবারে শান্ত থাকে, আবার কখনো প্রচণ্ড রেগে আগুন হয়ে যায়বিজ্ঞানীরা সূর্যের এই মেজাজ মর্জি মাপার জন্য প্রায় ১১ বছরের একটি সৌরচক্র হিসাব করেন। কখনো সূর্য একেবারে শান্ত থাকে, আবার কখনো প্রচণ্ড রেগে আগুন হয়ে যায়। ২০২৪ সালে সূর্য তার এই চক্রের একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল। এ কারণেই ওই বছর পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মেরুজ্যোতি এত বেশি দেখা গেছে। তবে বিজ্ঞানীরা বারবার সতর্ক করে দিচ্ছেন, ১৮৫৯ সালের ক্যারিংটন ইভেন্টের মতো কোনো ঝড় যদি আজকের এই প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতে আঘাত হানে, তবে আধুনিক সভ্যতার চাকা মুহূর্তেই স্থবির হয়ে পড়বে।
মহাকাশের কোনো বস্তু আপনার মাথায় পড়ার সম্ভাবনা কতটাহেলেন জানান, এই মহাজাগতিক কণাগুলো এতটাই শক্তিশালী যে, তা মহাকাশযানের পুরু দেয়াল ভেদ করে সরাসরি নভোচারীদের চামড়া ও চোখের ভেতর দিয়ে চলে যায়।
মহাকাশে বিপদের মুখে নভোচারীরা
মহাকাশের এই ঝড়ের কবল থেকে পৃথিবীর মানুষ তবু বায়ুমণ্ডল ও চৌম্বকক্ষেত্রের কারণে অনেকটা বেঁচে যাবে, কিন্তু নভোচারীদের কী অবস্থা হবে? ১৯৯১ সালে মির স্পেস স্টেশনে আট দিনের মিশনে যাওয়া প্রথম ব্রিটিশ নভোচারী হেলেন শারম্যান তাঁর এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। স্পেস স্টেশনে থাকাকালীন তিনি গ্যালাকটিক কসমিক রে বা সৌরজগতের বাইরের বিকিরণের শিকার হয়েছিলেন।
হেলেন জানান, এই মহাজাগতিক কণাগুলো এতটাই শক্তিশালী যে, তা মহাকাশযানের পুরু দেয়াল ভেদ করে সরাসরি নভোচারীদের চামড়া ও চোখের ভেতর দিয়ে চলে যায়। তিনি নিজের চোখে মাঝে মাঝেই উজ্জ্বল আলোর অদ্ভুত সব ঝলকানি দেখতে পেতেন!
১৯৯১ সালে মির স্পেস স্টেশনে আট দিনের মিশনে যাওয়া প্রথম ব্রিটিশ নভোচারী হেলেন শারম্যানপৃথিবীর কাছাকাছি কক্ষপথে পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র নভোচারীদের কিছুটা সুরক্ষা দিলেও, ভবিষ্যতে চাঁদ বা মঙ্গল গ্রহে যাওয়ার মিশনে এই মহাজাগতিক বিকিরণ থেকে নভোচারীদের কীভাবে বাঁচানো যাবে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের রীতিমতো ঘাম ঝরছে।
আপনার চারপাশের দুনিয়াটা আপাতত শান্ত মনে হলেও, মহাশূন্যের বিশাল মঞ্চে কখন যে কী তুলকালাম কাণ্ড পাকিয়ে উঠছে, তা বলা মুশকিল। তবে শান্তিতে ঘুমানোর একটা ভালো অজুহাত আপনার আছে—আপনাকে বাঁচানোর জন্য পৃথিবীর একদল বুদ্ধিমান মানুষ অন্তত সারাক্ষণ সূর্যের দিকে টেলিস্কোপ তাক করে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন!
সূত্র: বিবিসিমহাকাশ স্টেশন লিক হওয়ায় নিরাপদ আশ্রয়ে পাঠানো নভোচারীরা এখন কেমন আছেন