মাদ্রাসায় শিশু নিপীড়ন ও ঝুঁকির দায় কার?

· Prothom Alo

বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষা একটি ঐতিহ্যবাহী ব্যবস্থা, যেখানে মোটাদাগে দুই ধরনের মাদ্রাসা দেখা যায়: আলিয়া ও কওমি। মূলত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সময়ে আলিয়া মাদ্রাসার গোড়াপত্তন হয়। ১৭৮০ সালে বেশ কিছু ইসলামিক পণ্ডিত ব্যক্তি লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংসের সঙ্গে আধুনিক ইসলামিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য দেখা করেন। সে বছরই অর্থাৎ ১৭৮০ সালে ব্রিটিশ প্রশাসকদের সহায়তায় কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়।

এর বিপরীতে সেই সময়ের প্রথাগত আলেমগণ ব্রিটিশ প্রশাসকদের সহায়তায় ধর্মীয় শিক্ষার সংস্কারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তবে এর মাধ্যমে তাঁরা কওমি ব্যবস্থার সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করেন। অতঃপর ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লবের পরে যখন মুসলমানরা অনেকটাই দিশেহারা, তখন ১৮৬৬ সালে দারুল উলুম দেওবন্দ নামে আধুনিক কওমি ধারার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাঁরা গড়ে তোলেন, যা সমাজের মানুষের অর্থনৈতিক সহায়তায় গড়ে ওঠে।

Visit betsport.cv for more information.

সেই থেকে দেওবন্দ, উপমহাদেশের কওমি শিক্ষাব্যবস্থার অলিখিত অভিভাবক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

দেওবন্দের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিবর্গের অনেকেই সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও ইসলামি পুনরুজ্জীবনবাদী হওয়ার কারণে দেওবন্দ ব্রিটিশদের নজরদারির মধ্যে ছিল। সেই নজরদারি থেকে বেরিয়ে আসলো যে দারুল উলুম দেওবন্দ সেসময় শিক্ষাব্যবস্থায় আধুনিক কারিকুলাম সংযুক্ত করেছিল, তা এখনো চলমান রয়েছে, যদিও কালের পরিক্রমায় সেখানে সংস্কারের দাবি রাখে।

সেই দেওবন্দকে অনুসরণ করে বাংলাদেশে অনেক কওমি মাদ্রাসা গড়ে ওঠে। কিন্তু এসব মাদ্রাসা কতটা দেওবন্দের কারিকুলাম ও সিলেবাস অনুসরণ করে তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। অনেক মাদ্রাসা এর ধারেকাছেও নেই। এক মাদ্রাসা থেকে আরেক মাদ্রাসার কারিকুলাম বা সিলেবাস অনুসরণ করে এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। ফলে এখানে পদ্ধতিগত বড় ধরনের ত্রুটি বা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যে কারণে বাংলাদেশের কওমি শিক্ষাধারার আধুনিকায়ন ও একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় রূপান্তরের প্রচেষ্টা এখন সময়ের দাবি।

সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষামন্ত্রীর একটি মন্তব্য থেকে আমরা জানতে পারি যে বাংলাদেশে প্রায় ২৫ হাজারের মতো কওমি মাদ্রাসা রয়েছে, যেখানে প্রায় ৭০ লাখ ছাত্রছাত্রী ধর্মীয় শিক্ষা পেয়ে থাকে। ২০১৫ সালের বাংলাদেশ ব্যুরো অব এডুকেশনাল ইনফরমেশন অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিকসের (ব্যানবেইস) একটি গবেষণা অনুসারে বাংলাদেশ তখন প্রায় ১৪,০০০ কওমি মাদ্রাসা ছিল। অপর দিকে ব্যানবেইসের ২০২৪ সালের তথ্যানুসারে বাংলাদেশে নিবন্ধিত আলিয়া মাদ্রাসার সংখ্যা ছিল ১৩ হাজার ৬৯৪। তাই বলা যায় মাদ্রাসা শিক্ষা একটি বিস্তৃত ও জনপ্রিয় ব্যবস্থা।

মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীর মৃত্যু এবং শিশুর প্রতি সহিংসতায় রাষ্ট্রের নির্লিপ্ততামাদ্রাসায় শিশু নির্যাতনের দায় শুধুই কি শিক্ষকদের?

বেশির ভাগ মাদ্রাসা সমাজের পিছিয়ে পড়া এবং এতিম শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষায় একটা দীর্ঘ সময় ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, এসব মাদ্রাসা শিশুদের জন্য বিনা বেতনে শিক্ষার ব্যবস্থা করে থাকে, যেখানে বেশির ভাগ মাদ্রাসায় আবাসিক সুবিধাও রয়েছে। এই মাদ্রাসাগুলো সমাজের বিত্তবান ও অন্যান্য মানুষের নিঃস্বার্থ অর্থনৈতিক এবং অন্যান্য সহযোগিতার মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে।  

কওমি মাদ্রাসার সঙ্গে সমাজের এমন একটি মিথস্ক্রিয়া ও নির্ভরশীলতার সম্পর্ক আমরা দেখতে পাই, যে সম্পর্ককে কেবল ধর্মীয় পরিসর দিয়ে বোঝা যাবে না। বরং এর সঙ্গে সমাজের পিছিয়ে পড়া এতিম শিশুদের ভরণপোষণ থেকে শুরু করে তাদের সামগ্রিক দায় এবং দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়গুলো যুক্ত।

এ প্রেক্ষাপট বাংলাদেশে কওমি শিক্ষাব্যবস্থার জনপ্রিয়তাও প্রমাণ করে। এটি আবার একই সঙ্গে আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতাকেও নির্দেশ করে। যে দায়বদ্ধতা মূলত রাষ্ট্রের হলেও রাষ্ট্র কখনোই এই বিশাল অংশের ছাত্রছাত্রীদের মৌলিক চাহিদাকে মূলধারার সঙ্গে সমন্বিত করে দেখতে চায়নি এবং তা  মেটাতে কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপও নিতে পারেনি। বরং যুগ যুগ ধরে কওমি মাদ্রাসাগুলো অবহেলিতই থেকে যাচ্ছে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে এমন একজন মধ্যবয়সী পুরুষ মানুষকে জানি, যে তাঁর শিশুবেলায় ঘটে যাওয়া এই ধরনের যৌন নিপীড়নের স্মৃতি এক মুহূর্তের জন্য ভুলতে পারেন না। প্রবল মানসিক শক্তির কারণে হয়তো সেই ব্যক্তি এখনো তাঁর পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন; কিন্তু যখনই কোনো এক অলস দুপুরে কিংবা নির্জন সময়ে তাঁর সেই স্মৃতি মনে পড়ে, এই পৃথিবীটাকে তখন তাঁর দুমড়েমুচড়ে ভেঙে ফেলতে ইচ্ছা করে।

রাষ্ট্রীয় অবহেলার কারণেই বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠী তাদের নানাভাবে স্বীয় স্বার্থে ব্যবহার করছে। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল যেমন তাদের সহজেই টার্গেট করে, তেমনি সমাজের বিভিন্ন স্তরে লুকিয়ে থাকা উগ্রবাদী গোষ্ঠীও মাদ্রাসার ছাত্রছাত্রীদের নানাভাবে প্রলুব্ধ করে আসছে।

এর সঙ্গে রয়েছে মাদ্রাসায় ধর্ষণের মতো নিপীড়নের চিত্র, যেখানে অনেক ছাত্রছাত্রী ভুক্তভোগী। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের মতে, যদিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক সুনির্দিষ্ট তথ্য তাদের হাতে নেই তবে তাদের সাধারণ পর্যবেক্ষণ হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির অধিকাংশই হচ্ছে মাদ্রাসায় (ডয়চে ভেলে, ১১ আগস্ট, ২০২৬)।

মাদ্রাসায় মেয়েশিশুদের ধর্ষণের ঘটনা যেমন দেখতে পাই, একইভাবে ছেলেশিশুদেরও ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে, যা সংবাদমাধ্যমে এলেও এই নিপীড়নের অধিকাংশই উপেক্ষিত থেকে যায়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, ছেলেদের যৌন নিপীড়নকে ধর্ষণ হিসেবে সংজ্ঞায়ন করা হয় না, কেননা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যৌন নিপীড়নের সংজ্ঞায় ছেলেশিশু ও পুরুষদের ধর্ষণের কোনো স্পষ্ট বিধান নেই।

মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের পাশে কে দাঁড়াবে

তাই আইনের অস্পষ্টতা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অজ্ঞতার কারণে ছেলেশিশু কিংবা পুরুষদের ধর্ষণের সঠিক বিচার হয় না। যে কারণে ছেলে আর মেয়েশিশুর ধর্ষণের বিচার ও শাস্তির মাত্রা ভিন্ন হয়ে যায়, অথচ সেটি হওয়া উচিত না। ফলে এই সংজ্ঞাগত সীমাবদ্ধতা আগে দূর করে আইনের সংস্কার করতে হবে।

পত্র-পত্রিকায় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ধরনের ঘটনা ক্রমাগত ধরা পড়ার পরও অনেক মাদ্রাসার মধ্যে এই প্রবণতা কমছে না। কিছুদিন আগেই একটি মেয়েশিশুর ধর্ষণের পরপর প্রধানমন্ত্রীর ত্বরিত পদক্ষেপ আমরা দেখতে পেলাম, যার মধ্য দিয়ে দোষী ব্যক্তিকে অতি দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন জাগে, এই ধরনের ঘটনা তারপরও কেন কমছে না। তাহলে কি আমরা একটি যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক এবং বিচারিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারছি না, নাকি নাকি আমরা সেটা করতে চাচ্ছি না?

আর কত শিশু এভাবে মানুষরূপী নরপিশাচদের হাতে নিগৃহীত হবে? আমরা দেখতে পাই অনেক শিশুই শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর মুখ কোলে ঢলে পড়ছে আর যারা বেঁচে ফিরছে তারা সারাটা জীবন সেই দুর্বিষহ যৌন নিপীড়নের ট্রমার মধ্য দিয়ে প্রতিটি দিন পার করছে।

নিখোঁজ সংবাদ: মাদ্রাসার শিশু–কিশোরের সংখ্যা কেন বেশি

আমি ব্যক্তিগতভাবে এমন একজন মধ্যবয়সী পুরুষ মানুষকে জানি, যে তাঁর শিশুবেলায় ঘটে যাওয়া এই ধরনের যৌন নিপীড়নের স্মৃতি এক মুহূর্তের জন্য ভুলতে পারেন না। প্রবল মানসিক শক্তির কারণে হয়তো সেই ব্যক্তি এখনো তাঁর পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন; কিন্তু যখনই কোনো এক অলস দুপুরে কিংবা নির্জন সময়ে তাঁর সেই স্মৃতি মনে পড়ে, এই পৃথিবীটাকে তখন তাঁর দুমড়েমুচড়ে ভেঙে ফেলতে ইচ্ছা করে।

কিন্তু আমরা এমন একটা সামাজিক ব্যবস্থায় বসবাস করি, আমাদের আসলে কিছুই করার থাকে না কেবল দুফোঁটা চোখের জল ফেলা ছাড়া। যে দুফোঁটা জলও তিনি কাউকে দেখাতে পারেন না এই পুরুষতান্ত্রিক রূঢ় ব্যবস্থায়।

এর দায় কেবল এই রাষ্ট্রের নাকি আমাদের সবার। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কাছে মাঝে মাঝে আর কোনো কিছু প্রত্যাশা করতে ইচ্ছা করে না। একেকটি ঘটনা ঘটে আর সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষ নানাভাবে তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়, আমরা প্রতিশ্রুতি পাই, কিন্তু আমরা কখনো একটি টেকসই ব্যবস্থাপনা পাই না। বিচার যেন শুধু ভাইরাল হওয়াদের জন্য।

আর কোনো পিতা-মাতা কিংবা ভাই-বোনকে যেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ভাইরাল হতে না হয়—তেমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলার ন্যূনতম সংস্কার যেন এই সরকার করতে পারে। সমাজের নিপীড়িত ও নিগৃহীত মানুষ যদি  আইনের শাসন না পায় এবং ঘটে যাওয়া অন্যায়ের বিচার না পায়, তাহলে এর চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক আর কিছু হতে পারে না।

  • বুলবুল সিদ্দিকী নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং আহ্বায়ক, অ্যালায়েন্স ফর মাল্টিডিসিপ্লিনারি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস
    মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source