ইসবগুল আমদানিতে বছরে খরচ এক শ কোটি টাকা, দেশে উৎপাদনের চেষ্টা
· Prothom Alo

পেটের সমস্যাসহ বিভিন্ন সমস্যা দূর করতে ইসবগুলের ভুসির জুড়ি নেই। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি ঘরেই পরিচিত এই নাম। তবে প্রতিদিন যে ইসবগুল আপনার গ্লাসে গুলিয়ে খাচ্ছেন, তার প্রায় পুরোটাই বিদেশি। ইসবগুল পুরোপুরি আমদানিনির্ভর।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক বিভাগের তথ্য অনুসারে, দেশে গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ২ হাজার ৭০০ টন ইসবগুলের ভুসি আমদানি হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় পৌনে ৯ লাখ ডলার বা প্রায় ১০৮ কোটি টাকা। পুরোটা আমদানি হয়েছে ভারত থেকে। কারণ, দেশে বাণিজ্যিকভাবে কোনো ইসবগুল উৎপাদন হয় না।
অবশ্য আট বছর আগে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ইসবগুলের পরীক্ষামূলক চাষ শুরু করেন বিজ্ঞানীরা। গত শীত মৌসুমেও পরীক্ষামূলক ইসবগুল চাষ হয়েছিল। এতে গাছ থেকে ইসবগুল বীজ পাওয়া গেলেও সেটি থেকে ভুসি সংগ্রহ করা যায়নি। কারণ, ইসবগুলের বীজ ভাঙিয়ে ভুসি তৈরির যন্ত্র নেই আমাদের দেশে। ফলে শেষ পর্যন্ত এই পণ্যের বাণিজ্যিক চাষও শুরু করা যায়নি।
ইসবগুল নাম যেখান থেকে
ইসবগুল মূলত একটি ভেষজ উদ্ভিদ। এটি বহু বছর ধরে স্বাস্থ্যসেবায় ব্যবহার হয়ে আসছে। এর বৈজ্ঞানিক নাম প্ল্যান্টাগো ওভাটা, বাণিজ্যিকভাবে এটি ব্লন্ড সিলিয়াম নামে পরিচিত।
ইসবগুলের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়ে একটি গবেষণা করেছে ভারতের কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (আইসিএআর)। গবেষণা প্রতিবেদনটি ২০২৩ সালে গবেষণা জার্নাল রিসার্চ গেটেও প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসবগুল শব্দটি ফার্সি ‘আসব্’ (ঘোড়া) এবং ‘গুল্’ (কান) শব্দ দুটির সমন্বয়ে গঠিত; যার অর্থ ‘ঘোড়ার কান’। মূলত ইসবগুল বীজের আকৃতি দেখতে অনেকটা ঘোড়ার কানের মতো; তাই এমন নামকরণ।
আইসিএআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসবগুলের উৎপত্তি মূলত ভূমধ্যসাগর তীরবর্তী অঞ্চল ও পশ্চিম এশিয়ায় (মধ্যপ্রাচ্য)। পরে এটি দক্ষিণ এশিয়া এবং ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা ও অন্যান্য অঞ্চলে বিস্তৃত হয়। মধ্যযুগে পারস্য ও আরব বণিকদের মাধ্যমে এটি ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম পরিচিতি পায়। পরবর্তী সময়ে মোগল ও ইংরেজ আমলে এর ঔষধি গুণের বিচারে ভারতে ইসবগুলের বাণিজ্যিক চাষ বাড়ে।
শীর্ষ উৎপাদক ও রপ্তানিকারক ভারতে
বর্তমানে বিশ্বে ইসবগুল উৎপাদনে শীর্ষ দেশ হচ্ছে ভারত। রপ্তানিও সবচেয়ে বেশি করে দেশটি। ভারতের গুজরাট, রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশ রাজ্য ইসবগুলের প্রধান ও আদি উৎপাদন অঞ্চল। পরে এই চাষ পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ ও কর্ণাটক রাজ্যে ছড়িয়েছে। ভারতের গুজরাটে ইসবগুল প্রক্রিয়াজাতের বড় বড় কারখানা রয়েছে, যেখানে ইসবগুল বীজ থেকে ভুসি উৎপাদন করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, ফ্রান্স, রাশিয়াসহ বেশ কিছু দেশেও ইসবগুল চাষ হয়।
আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতই ইসবগুলের শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশ। বৈশ্বিক বাজারে সিলিয়াম ভুসি বা ইসবগুলের প্রায় ৮০ শতাংশের জোগান দেয় ভারত। ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর ভারত প্রায় ৫০ হাজার টন ইসবগুল ভুসি ও বীজ রপ্তানি করে। ভারতে ইসবগুলের ভুসির বাজার প্রায় ৫০০ কেটি রুপির।
ভারতের কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের তথ্য অনুসারে, একক দেশ হিসেবে ভারতীয় ইসবগুলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি ভারতের রপ্তানি করা ইসবগুলের ৫০ শতাংশ কিনে নেয়। এ ছাড়া জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও ইতালিসহ ইউরোপ, এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পণ্যটির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
দেশে ইসবগুল ভুসির দাম কত
মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের মসলা বিক্রেতা মো. সাগর জানান, বর্তমানে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ইসবগুল ভুসি গড়ে ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়। মান ভালো হলে দাম আরও বেশি হয়। খুচরায় ভালো মানের ১০০ গ্রাম খোলা ইসবগুল কিনলে অন্তত দেড় শ টাকা লাগে। বাজারে বিভিন্ন পরিচিত ও অপরিচিত ব্র্যান্ড প্লাস্টিকের কৌটায় ইসবগুলের ভুসি বিক্রি করে। এগুলোর দাম তুলনামূলক বেশি। যেমন ৬০ গ্রাম ইসবগুলের ভুসির দাম ১৬০-১৭০ টাকা।
বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত আট বছরে ইসবগুলের ভুসির দাম বেড়েছে প্রায় ৮৮ শতাংশ। যেমন ২০১৭ সালের জুনে এক কেজি ইসবগুলের ভুসির দাম ছিল ৮০০ টাকা। ২০২২ সালের শেষে সেই দাম বেড়ে ১ হাজার ২০০ টাকা হয়। ২০২৪ সালে রোজার সময় ইসবগুলের ভুসির দাম বেড়ে কেজি প্রায় ২ হাজার টাকা হয়। রোজার পর অবশ্য দাম কেজিতে ২০০-৩০০ টাকা কমেছে।
দেশে ইসবগুলের ভুসি মূলত ভারত থেকেই আমদানি হয়। সর্বশেষ অর্থবছরে দেশটি থেকে প্রায় ২ হাজার ৭০০ টন ইসবগুলের ভুসি আমদানি হয়েছে। এর বাইরেও অবৈধ পথে (শুল্ক ফাঁকি দিয়ে) দেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ইসবগুলের ভুসি এ দেশে আনা হয় বলে ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন।
দেশে ২০১৯ সাল থেকে পরীক্ষামূলকভাবে ইসবগুল চাষের গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) বিজ্ঞানীরা। মাগুরায় অবস্থিত আঞ্চলিক মসলা গবেষণা কেন্দ্রে লাগানো হয়েছে ইসবগুলগাছইসবগুলের উপকারিতা
ইসবগুলের ভুসি খুব শক্তিশালী প্রিবায়োটিক। এর উচ্চমাত্রার আঁশ অন্ত্রে দ্রুত উপকারী ব্যাকটেরিয়ার কলোনি তৈরি করে হজম প্রক্রিয়াকে সহজ করে এবং অন্ত্রের যেকোনো সংক্রমণের হার কমায়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. টিটু মিয়া বলেন, যাদের কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা আছে, তাদের জন্য ইসবগুলের ভুসি খুব উপকারী। কারণ, এটি প্রচুর পানি ধারণ করে।
বর্তমানে অন্যান্য কিছু শিল্প খাতেও ইসবগুল ব্যবহারের তথ্য জানা যায়। টাইমস অব ইন্ডিয়ার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ প্রতিষ্ঠানগুলো বেকারি পণ্যে, বিশেষ করে ডাইজেস্টিভ বিস্কুটে ইসবগুল ব্যবহার বাড়াচ্ছে। বস্ত্র ও প্রসাধনী খাতও এখন রঞ্জন (ডাইং), ছাপানো এবং পণ্য তৈরির কাজে ইসবগুলের ভুসি ব্যবহার শুরু করেছে। আবার ইসবগুল বীজ প্রোটিনসমৃদ্ধ গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।
দেশে প্রথমবার ইসবগুল চাষের চেষ্টা
দেশে ২০১৯ সাল থেকে পরীক্ষামূলকভাবে ইসবগুল চাষের গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) বিজ্ঞানীরা। তাঁরা বগুড়া, গাজীপুর, লালমনিরহাট ও ফরিদপুরে পরীক্ষামূলক চাষ করে সফলতা পেয়েছেন। তাঁদের মতে, অতিরিক্ত লবণাক্ত এলাকা এবং পানি জমে থাকা জমি ছাড়া দেশের প্রায় সব অঞ্চলের উঁচু জমিতে রবি ফসল হিসেবে ইসবগুল চাষ করা সম্ভব।
মাগুরায় অবস্থিত আঞ্চলিক মসলা গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা রিয়াজুল ইসলাম জানান, ইসবগুল অত্যন্ত স্বল্পমেয়াদি—মাত্র ১১০ থেকে ১২০ দিনের ফসল। নভেম্বর মাসে বীজ বপন করে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি বা মার্চের শুরুতে ফসল সংগ্রহ করা যায়। এক বিঘা (৩৩ শতক) জমিতে ইসবগুল চাষে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা খরচ হতে পারে। সেখান থেকে বিঘাপ্রতি জমিতে প্রায় ১০০ কেজি ফলন পাওয়া যাবে। এক বিঘা জমিতে উৎপাদিত ইসবগুল বীজ বিক্রি করে প্রায় ৩০-৪০ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব। আর ভুসি বিক্রি করা গেলে বিঘাপ্রতি প্রায় এক লাখ টাকা পর্যন্ত আয় হতে পারে। এতে তেমন সেচ, সার বা কীটনাশকের প্রয়োজন হয় না এবং রোগবালাইও খুব কম। তবে ইসবগুল বীজ ভাঙিয়ে ভুসি তৈরি করার মতো যন্ত্র দেশে নেই।
বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের দেশের আবহাওয়ায় ইসবগুল ভালো হয়। কিন্তু বীজ ভেঙে ভুসি তৈরির প্রক্রিয়া প্রসেসিং কিছুটা জটিল। এ জন্য উপযোগী প্রযুক্তি বা যন্ত্রপাতি বর্তমানে আমাদের দেশে নেই। এ কারণে আমরা এখনো কৃষকদের এটি বাণিজ্যিকভাবে চাষ করতে বলছি না।’