হামে মৃত্যু হাজার ছুঁই ছুঁই

· Prothom Alo

দেশে গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ১৩২। আগের বছরগুলোর মধ্যে ২০২৪ সালে ২৪৭, ২০২৩ সালে ২৮২, ২০২২ সালে ৩১১ জন হামে আক্রান্ত হয়েছিল। মৃত্যুর রেকর্ড নেই। আর এবার সেই প্রায় নিঃশেষ হতে যাওয়া হামে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারাল প্রায় এক হাজার শিশু।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টায় দেশে হামের উপসর্গে মারা গেছে তিন শিশু। এ নিয়ে হাম ও এর উপসর্গে মারা যাওয়া শিশুর সংখ্যা হলো ৯৯৭। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ২১৬ জন। এ নিয়ে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা হলো ১ লাখ ৮৫ হাজার ৬০।

Visit bettingx.bond for more information.

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক মাহমুদুর রহমান আজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার জানামতে, বাংলাদেশের ইতিহাসে হামে এত শিশুর মৃত্যু হয়নি। এত রোগীও হয়নি কোনো বছর। এ এক ভয়ানক পরিস্থিতি। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এই মৃত্যুর শিকার হলো শিশুরা।’

দেশে বছরের শুরুতে হঠাৎই শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। কিছুদিনের মধ্যে রোগী দ্রুত বাড়তে শুরু করে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গত ১৫ মার্চ থেকে হাম সংক্রমণের তথ্য দিচ্ছে।

এবার হামে মৃত্যু এবং সংক্রমণ নজিরবিহীন। চলতি বছর বিশ্বে হামে সর্বোচ্চ সংক্রমণও হয়েছে বাংলাদেশে। বিশ্বজুড়ে হাম ও রুবেলা সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে ডব্লিউএইচওর সদর দপ্তর জেনেভায় নিয়মিত যে প্রাথমিক উপাত্ত জমা হয়, সংস্থাটির জনসংযোগ বিভাগ থেকে প্রথম আলো সেই তথ্য সংগ্রহ করেছে। সেখানে সর্বোচ্চ সংক্রমণের এই চিত্র দেখা গেছে। গত ১৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনও (সিডিসি) বিশ্বে হাম সংক্রমণের পরিস্থিতি জানাতে জুলাই মাসে তৈরি করা ডব্লিউএইচওর নজরদারি প্রতিবেদনটি ব্যবহার করেছে।

টিকাদানে ঘাটতি, সংক্রমণে ঊর্ধ্বগতি

সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে টিকাদানে একসময় বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বজুড়ে ছিল আলোচিত। নিয়মিত টিকাদান, জাতীয় ক্যাম্পেইনের কারণে হামসহ এ ধরনের রোগের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব এড়ানো যাচ্ছিল। এখন সংকট দেখা দেওয়ার মূল কারণ হিসেবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় টিকাদানের ঘাটতিকে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ডব্লিউএইচওর তথ্যে দেখা যায়, ২০০৬ সালের জাতীয় হাম টিকাদান কর্মসূচিতে ৯ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী ৩ কোটি ৪২ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছিল। লক্ষ্যমাত্রার পুরোটাই বা ১০০ শতাংশ অর্জিত হয়েছিল।

২০১০ সালে ফলোআপ ক্যাম্পেইনে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী ১ কোটি ৮১ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া। সেবারও কাভারেজ ছিল ১০০ শতাংশ। ২০১৪ সালে দেশব্যাপী হাম-রুবেলা কর্মসূচির মাধ্যমে ৯ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী ৫ কোটি ২৭ লাখ শিশুকে টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক হয়েছিল। সেবার কাভারেজ ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়।

২০২০–২১ সালের পর বিশেষ ক্যাম্পেইন আর হয়নি। এর মধ্যে নিয়মিত টিকাদানের কাভারেজও কমতে থাকে। ২০২৫ সালে এ হার ৫৯ শতাংশে নেমে আসে। দেশের বিভিন্ন স্থানে টিকার স্বল্পতাও দেখা দেয়।

ডব্লিউএইচওর গত জুলাই মাসের প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশে এবার আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে শিশুদের সংখ্যা বেশি। এক বছরের কম বয়সী যে পাঁচ হাজারের মতো শিশু গত এক বছরে হামে আক্রান্ত হয়েছে, তার চার হাজারের বেশি হামের টিকার দুই ডোজের একটিও পায়নি। এক থেকে চার বছর বয়সী চার হাজার রোগীর মধ্যে দেড় হাজার শিশু টিকার কোনো ডোজ পায়নি, এক ডোজ পেয়েছে ৫০০ জনের মতো। ৫ থেকে ৯ বছর বয়সী ১ হাজার শিশুর অর্ধেকই টিকার কোনো ডোজ পায়নি।

জাতিসংঘ শিশু সংস্থা ইউনিসেফের বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া ৫ মে প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ২০২৫ সালে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার টিকা সংগ্রহের প্রচলিত পদ্ধতি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলে ইউনিসেফ বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। তাদের আশঙ্কা ছিল, এতে ভ্যাকসিন সরবরাহে দীর্ঘ বিলম্ব হবে এবং রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে।

হার্ড ইমিউনিটিতে ঘাটতি

হাম পৃথিবীর সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি। বিশেষজ্ঞরা বলেন, একজন আক্রান্ত ব্যক্তি ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। এ কারণে ডব্লিউএইচও বলছে, সংক্রমণের শৃঙ্খল ভাঙতে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে দুই ডোজ টিকার আওতায় আনতে হয়। এ অবস্থাকেই বলা হয় হার্ড ইমিউনিটি। তখন কোনো এলাকায় অল্পসংখ্যক টিকা না পেলেও সংক্রমণ সহজে ছড়াতে পারে না।

এবার বাংলাদেশে যে বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, সেটিও মূলত এই ইমিউনিটি গ্যাপের ফল বলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মনে করেছে।

এবার প্রাদুর্ভাবের পর গত এপ্রিলে বর্তমান বিএনপি সরকার ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের হামের টিকাদানে বিশেষ ক্যাম্পেইন শুরু করে, কিন্তু তাতেও ৪৬ লাখ শিশু হামের টিকা থেকে বাদ পড়ে গেছে। কারণ, হামের টিকা দিতে এই বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুর হিসাব করা হয়, কিন্তু গত জুনে একই বয়সী ২ কোটি ২৬ লাখ শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনের আওতায় আনা হয়।

অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, এত বিপুল সংখ্যায় শিশু বাদ পড়ে যাওয়ার কারণে টিকাদান কার্যক্রমের পরও দেশে হামের প্রাদুর্ভাব কমছে না। কোনো দেশে গণটিকা দেওয়ার পর এ অবস্থা সাধারণত দেখা যায় না। এটাও নজিরবিহীন।

জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, সর্বশেষ জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে যে গাফিলতি হলো, বর্তমান সরকার সেটাও স্বীকার করতে চায়নি। বিশ্বের কোথাও এভাবে গণটিকা দেওয়ার পর হামের এ রকম সংক্রমণ দেখা যায়নি। অন্তর্বর্তী সরকার এবং বর্তমান সরকারের সময় টিকাদান এবং স্বাস্থ্য কার্যক্রমে যে গাফিলতি হয়েছে, সেটা যেমন স্বীকার করা হয়নি, এই নিয়ে তাদের কোনো অনুশোচনাও দেখা যাচ্ছে না।

Read full story at source