ঢাকা দক্ষিণে ১০০ টাকার বেশি বিল আদায় বন্ধ হয়নি, নিয়মিতও নিচ্ছে না ময়লা

· Prothom Alo

রাজধানীর ধানমন্ডির বাসিন্দা লামিয়া আক্তারের বাসায় প্রতি মাসে ময়লার বিলের রসিদ আসে ১২০ টাকার। কিন্তু তাঁকে আরও ৫০ টাকা বেশি দিতে হয়। এই অতিরিক্ত টাকার কোনো রসিদ দেওয়া হয় না।

একই এলাকার আরেক বাসিন্দার ভাষ্য, প্রতি বাসা থেকে ১৬০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে।

Visit h-doctor.club for more information.

ডিএসসিসির বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, কোথাও রসিদে নির্ধারিত অঙ্কের কাছাকাছি টাকা লেখা থাকছে। কিন্তু এর বাইরে হাতে নেওয়া হচ্ছে বাড়তি টাকা। আবার কোথাও বেশি টাকা নিয়েও নিয়মিত ময়লা নেওয়া হচ্ছে না।

যাত্রাবাড়ীর মীর হাজীরবাগ এলাকায় আরও বেশি টাকা নেওয়ার অভিযোগ করলেন স্থানীয় বাসিন্দা আরভীন সোনিয়া। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এখনো প্রতি মাসে ২০০ টাকা করে বিল দিতে হচ্ছে। আবার প্রতিদিন ময়লা নেওয়াও হয় না। দু–তিন মাস ধরে দুই বা তিন দিন পরপর ময়লা নিতে আসছেন কর্মীরা।

বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহে মাসে ১০০ টাকা ফি নির্ধারণ করে দিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। তবে বিভিন্ন এলাকায় এ সিদ্ধান্ত মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

মো. আবদুস সালাম, প্রশাসক, ডিএসসিসি১০০ টাকার বেশি নেওয়ার সুযোগ নেই। নির্ধারিত টাকার বেশি নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে ডিএসসিসির কর্মকর্তাদের গাফিলতি থাকলে তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ডিএসসিসির বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, কোথাও রসিদে নির্ধারিত অঙ্কের কাছাকাছি টাকা লেখা থাকছে। কিন্তু এর বাইরে হাতে নেওয়া হচ্ছে বাড়তি টাকা। আবার কোথাও বেশি টাকা নিয়েও নিয়মিত ময়লা নেওয়া হচ্ছে না। এতে ময়লা জমে থাকা, দুর্গন্ধ ছড়ানোসহ ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম প্রথম আলোকে বলেন, ১০০ টাকার বেশি নেওয়ার সুযোগ নেই। নির্ধারিত টাকার বেশ নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে ডিএসসিসির কর্মকর্তাদের গাফিলতি থাকলে তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে ময়লা সংগ্রহের বাণিজ্য নিয়ে গত মে মাসে প্রথম আলোয় একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ‘ময়লা টানেন তাঁরা, পকেট ভরেন নেতারা’ শিরোনামের প্রতিবেদনে উঠে আসে, বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের কষ্টের কাজটি করেন নিম্ন আয়ের কর্মীরা; কিন্তু আদায় করা টাকার বড় অংশ তাঁদের হাতে যায় না, যায় নিয়ন্ত্রণকারীদের পকেটে। এই খাতের নিয়ন্ত্রণকারীরা রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ও স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী।

বেশি টাকার নেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসার পরিপ্রেক্ষিতে গত মে মাসে ডিএসসিসির প্রশাসক আবদুস সালাম বর্জ্য সংগ্রহকারী ঠিকাদারদের সতর্ক করেন। তিনি বলেছিলেন, বাসাবাড়ি থেকে নির্ধারিত ১০০ টাকার বেশি বর্জ্য সংগ্রহ বিল আদায় করা হলে প্রতিদিনের ময়লা প্রতিদিন না নিলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা হবে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের খবর পাওয়া যায়নি।

নগর–পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন, শুধু অফিস আদেশে এই অনিয়ম, ময়লা–বাণিজ্য বন্ধ হবে না। ওয়ার্ডভিত্তিক ঠিকাদারদের তালিকা, নির্ধারিত ফি, অভিযোগ জানানোর নম্বর, অনিয়মের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থার তথ্য প্রকাশ করতে হবে। তা না হলে ময়লা বাণিজ্য চলতেই থাকবে।

গত ৪ জুন ডিএসসিসির সচিবের সই করা এক অফিস আদেশে ১০টি অঞ্চলের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাদের প্রাথমিক বর্জ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানের (পিসিএসপি) কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়।

আদেশে বলা হয়, পিসিএসপিগুলো প্রতিদিন বর্জ্য সংগ্রহ করছে কি না, বাসাবাড়ি থেকে ১০০ টাকার বেশি ফি নেওয়া হচ্ছে কি না, সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনে (এসটিএস) কার্যক্রম ঠিকভাবে হচ্ছে কি না—এসব বিষয় তদারকি করতে হবে। সার্বিক বিষয়ে ডিএসসিসি প্রশাসক বরাবর সাত দিন পরপর প্রতিবেদন দিতে হবে।

১০০ টাকার বেশি বর্জ্য ফি আদায় হচ্ছে কি না, দেখবে তদারকি কমিটি

কিন্তু তিন মাস পরও এই আদেশের প্রভাব মাঠপর্যায়ে তেমন দেখা যাচ্ছে না। ডিএসসিসির সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের সাত দিন অন্তর প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ থাকলেও তা নিয়মিত জমা পড়ছে না। ফলে কোন ওয়ার্ডে কত টাকা নেওয়া হচ্ছে, কোথায় নিয়মিত ময়লা সংগ্রহ হচ্ছে না, কোন ওয়ার্ডে কোন প্রতিষ্ঠান শর্ত ভাঙছে—এসব বিষয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে পূর্ণাঙ্গ চিত্র তৈরি হয়নি।

আদিল মুহাম্মদ খান, নগর–পরিকল্পনাবিদরসিদের বাইরে টাকা নেওয়া সেবা নয়, চাঁদাবাজি। ১০০ টাকার বেশি নেওয়ার পরও কর্মকর্তারা যদি প্রতিবেদন না দেন, তাহলে তাঁরা অনিয়ম ঠেকাচ্ছেন না; বরং অনিয়মে সুযোগ দিচ্ছেন। এই ব্যর্থতার দায় মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও নিতে হবে।

ধানমন্ডি এলাকা ডিএসসিসির অঞ্চল–১–এর আওতায়। এ অঞ্চলের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা মুহা. মাছুম বিল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, তিনি নতুন যোগ দিয়েছেন। তদারকি ও প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশনার বিষয়টি তিনি জানেন না। তবে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঢাকা উত্তরে চাঁদা নেওয়ার লোক পাল্টেছে, ‘অদৃশ্য শক্তির’ বাধাও আছে

ডিএসসিসির বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের ভাষ্য, শুধু অভিযোগের অপেক্ষায় থাকলে অনিয়ম ধরা কঠিন। অনেকে রসিদের বাইরে টাকা নিচ্ছেন। এ হিসাব কাগজে থাকছে না। আবার অভিযোগ করলে ময়লা নেওয়াই বন্ধ হয়ে যায় কি না, এ আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

পুরান ঢাকার কায়েতটুলী এলাকার বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের এলাকায় প্রতিটি বাসা থেকে মাসে ১৫০ টাকা করে ময়লার বিল নেওয়া হয়। কিন্তু সপ্তাহে এক থেকে দুই দিন ময়লা নিতে আসে। নিয়মিত ময়লা না নেওয়ায় এ মাস থেকে তাঁরা নিজেরাই ময়লা নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে রেখে আসছেন।

ডিএসসিসির ১৬ নম্বর ওয়ার্ডভুক্ত সেন্ট্রাল রোড এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, তাঁদের ভবনে প্রতি ফ্ল্যাট থেকে মাসে ২০০ টাকা করে ফি নেওয়া হয়।

ক্ষমতার ‘আশীর্বাদে’ চলে ময়লা–বাণিজ্য

অবশ্য সব জায়গার চিত্র একই নয়। ডিএসসিসির ৭১ নম্বর ওয়ার্ডভুক্ত মান্ডা এলাকার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, আগে তাঁদের কাছ থেকে ১২০ টাকা করে নেওয়া হতো। গত পবিত্র ঈদুল আজহার পর থেকে ১০০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে।

অর্থাৎ কর্তৃপক্ষ চাইলে নির্ধারিত ফি যে কার্যকর করা যায়, তেমন নজিরও আছে।

ঢাকা সিটির বাসাবাড়ি থেকে ভ্যানে ময়লা নেওয়ার ফি আদায় বন্ধে নির্দেশনা চেয়ে রিট

তবে মীর হাজীরবাগের বাসিন্দা আরভীন সোনিয়ার অভিজ্ঞতা ভিন্ন। তিনি বলেন, তাঁর বাসা থেকে ২০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। আবার প্রতিদিন ময়লা নেওয়া হচ্ছে না।

মীর হাজীরবাগসহ যাত্রাবাড়ী এলাকা ডিএসসিসির অঞ্চল–৫–এর মধ্যে পড়েছে। এই অঞ্চলের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা আক্তার উননেছা শিউলী প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের কাছে এমন কোনো অভিযোগ আসেনি। ওয়ার্ড পর্যায়ে দল গঠন করা হয়েছে। সবকিছু সার্বিক তদারকির মধ্যে আছে। অনেক অভিযোগের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

ময়লা–বাণিজ্যে আ.লীগের দেখানো ‘বনানী মডেল’ বহাল

নগর–পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন, শুধু অফিস আদেশে এই অনিয়ম, ময়লা–বাণিজ্য বন্ধ হবে না; ওয়ার্ডভিত্তিক ঠিকাদারদের তালিকা, নির্ধারিত ফি, অভিযোগ জানানোর নম্বর, অনিয়মে নেওয়া ব্যবস্থার তথ্য প্রকাশ করতে হবে। তা না হলে ময়লা–বাণিজ্য চলতেই থাকবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল–পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ও নগর–পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘রসিদের বাইরে টাকা নেওয়া সেবা নয়, চাঁদাবাজি। ১০০ টাকার বেশি নেওয়ার পরও কর্মকর্তারা যদি প্রতিবেদন না দেন, তাহলে তাঁরা অনিয়ম ঠেকাচ্ছেন না; বরং অনিয়মে সুযোগ দিচ্ছেন। এই ব্যর্থতার দায় মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও নিতে হবে।’

১০০ টাকার বেশি বিল নিলে, নিয়মিত ময়লা না সরালে লাইসেন্স বাতিল: ডিএসসিসি প্রশাসকময়লা টানেন তাঁরা, পকেট ভরেন নেতারা

Read full story at source