৫০ হাজার টাকা কেজির দুর্লভ হিমালয় মাশরুম ছাড়াও ব্রিকস সম্মেলনের তুমুল আলোচিত শতভাগ নিরামিষ নৈশভোজে কী কী ছিল?
· Prothom Alo

আমিষ-নিরামিষ নিয়ে সাম্প্রতিক নানা বিতর্কের মাঝে ভারতের ব্রিকস সম্মেলনের শতভাগ নিরামিষ নৈশভোজ এখন তুমুল আলোচনায়। কী কী ছিল এর মেন্যুতে? আর কেন এই ডিনারে যোগ দেন নি দুই বড় নেতা?
ব্রিকস আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পাশাপাশি তুমুল আলোচনায় এখন গালা নৈশভোজের মেন্যুর খাবার। আমিষ-নিরামিষ নিয়ে সাম্প্রতিক নানা বিতর্কের মাঝে নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়া নেতাদের জন্য আয়োজিত গ্র্যান্ড গালা ডিনারের পুরো মেনুই ছিল শুদ্ধ নিরামিষ।
Visit zeppelin.cool for more information.
গালা ডিনারের পুরো মেনুই ছিল শুদ্ধ নিরামিষখাবারের বৈচিত্র্যে ছিল ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল ও রান্নার ঐতিহ্যের ছাপ। আর প্রচলিত সব ভারতীয় পদকে নতুনভাবে উপস্থাপনের পাশাপাশি মেনুতে রাখা হয়েছিল বিদেশি কায়দায় রান্না করা নিরামিষ খাবার। শেষ পাতে ছিল পুরনো দিল্লির মিষ্টি ও ফলের স্বাদ।
শুরুতেই খান্ডভি, মাশরুমের গালৌটি
নৈশভোজের শুরুতে পরিবেশন করা হয় খান্ডভি মিল-ফয় ও খুম্ব গালৌটি। খান্ডভি মূলত গুজরাটের জনপ্রিয় একটি নিরামিষ পদ। বেসন ও দই দিয়ে তৈরি এই খাবারটি খুব পাতলা করে রান্না করে রোলের মতো পেঁচিয়ে পরিবেশন করা হয়। সাধারণত এর ওপর সরিষা, কারিপাতা ও অন্যান্য মসলা দিয়ে ফোড়ন দেওয়া হয়। ব্রিকসের নৈশভোজে সেই পরিচিত খান্ডভিকেই ফরাসি মিল-ফয়-এর স্তরযুক্ত পরিবেশনার আদলে সাজানো হয়েছিল। ফলে ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় খাবার পেয়েছে আধুনিক রূপ।
খান্ডভি মূলত গুজরাটের জনপ্রিয় একটি নিরামিষ পদখুম্ব গালৌটিতে ব্যবহার করা হয়েছে মাশরুমআর খুম্ব গালৌটিতে ব্যবহার করা হয়েছে মাশরুম। ‘গালৌটি’ শব্দটি সাধারণত এমন কাবাবকে বোঝায়, যা এতটাই নরম যে মুখে দিলেই গলে যায়। ঐতিহ্যগত গালৌটি কাবাবে মাংস ব্যবহার করা হলেও নিরামিষ সংস্করণে মাশরুমসহ বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করা হয়। মসলা ও নরম টেক্সচারের কারণে এটি নিরামিষ খাবারের তালিকায়ও বেশ আকর্ষণীয় একটি পদ।
মেইন কোর্সে পনির, মাশরুম ও মিলেট
মেইন কোর্সের পদের তালিকায় ছিল পনির লাবাবদার, গুচ্ছি মারমিক, গাজর–শিমের পোরিয়াল এবং মিলেট পোলাও। ভারতীয় রেস্তোরাঁর মেনুতে পরিচিত পদ পনির লাবাবদার। নরম পনির সাধারণত টমেটো, পেঁয়াজ, কাজুবাদাম ও বিভিন্ন মসলা দিয়ে তৈরি ঘন ও মসৃণ গ্রেভিতে রান্না করা হয়। স্বাদে এটি মিষ্টি, ঝাল ও মসলার ব্যালেন্সে তৈরি।
পনির লাবাবদার ছিল মেইন কোর্সে ‘গুচ্ছি’ হলো হিমালয় অঞ্চলে পাওয়া একধরনের বুনো মাশরুম, যা দুর্লভ ও দামি খাবার হিসেবে পরিচিতমেনুর আরেকটি বিশেষ পদ ছিল গুচ্ছি মারমিক। ‘গুচ্ছি’ হলো হিমালয় অঞ্চলে পাওয়া একধরনের বুনো মাশরুম, যা দুর্লভ ও দামি খাবার হিসেবে পরিচিত। বৃষ্টির পর পাহাড়ি এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো এই মাশরুম সংগ্রহ করাও বেশ কঠিন। এর স্বাদ ও গন্ধ সাধারণ মাশরুমের তুলনায় আলাদা হওয়ায় ভারতীয় অভিজাত রান্নায় গুচ্ছির বিশেষ কদর রয়েছে। বাংলাদেশি টাকায় ৫০ হাজার পড়তে পারে এই মাশরুমের এক কেজির দাম।
দক্ষিণ ভারতের ছোঁয়া পোরিয়ালে
মেনুতে ছিল গাজর–শিমের পোরিয়াল। পোরিয়াল দক্ষিণ ভারতীয় রান্নার একটি পরিচিত ধরন। সাধারণত বিভিন্ন সবজি অল্প তেল, সরিষা, কারিপাতা, ডাল ও মসলা দিয়ে ভেজে তৈরি করা হয়। খুব বেশি ঝোল থাকে না। গাজর ও শিমের মতো সবজির স্বাভাবিক স্বাদ বজায় রেখেই এই ধরনের পদ তৈরি করা হয়।
সাধারণ চালের পরিবর্তে মিলেট ব্যবহার করে তৈরি পোলাও ছিল মেন্যুতেএর সঙ্গে ছিল মিলেট পোলাও। ভারতীয় উপমহাদেশে বহুদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের মিলেট বা ছোট দানার শস্য খাওয়া হলেও সাম্প্রতিক সময়ে স্বাস্থ্যসচেতন খাদ্যাভ্যাসের কারণে এগুলোর জনপ্রিয়তা আবার বেড়েছে। সাধারণ চালের পরিবর্তে মিলেট ব্যবহার করে তৈরি পোলাও তাই ঐতিহ্য ও আধুনিক খাদ্যভাবনার একটি মিশ্রণ।
মিষ্টিতে পুরনো দিল্লি ও তুঁত ফল
নৈশভোজের শেষ পর্বে ছিল পুরনো দিল্লির ফলের ক্রিমের সঙ্গে জিলাপি এবং শাহতুত ফিরনি। জিলাপি ভারতীয় উপমহাদেশের বহুল পরিচিত মিষ্টি। ময়দার ব্যাটার গোল করে ভেজে চিনির সিরায় ডুবিয়ে তৈরি করা হয় এটি। ফল ও ক্রিমের সঙ্গে জিলাপি পরিবেশনের ফলে পরিচিত মিষ্টিটিকে দেওয়া হয়েছিল ভিন্নধর্মী উপস্থাপন।
পরিচিত মিষ্টিটিকে দেওয়া হয়েছিল ভিন্নধর্মী উপস্থাপনতুঁত ফল যোগ হওয়ায় স্বাদ ও রঙে এসেছে আলাদা বৈশিষ্ট্যআর ‘শাহতুত’ হলো তুঁত ফল। এই ফল ব্যবহার করে তৈরি ফিরনি ছিল মেনুর অপেক্ষাকৃত ব্যতিক্রমী মিষ্টান্ন। চালের গুঁড়া, দুধ ও চিনি দিয়ে তৈরি ফিরনি উত্তর ভারতীয় উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি। তাতে তুঁত ফল যোগ হওয়ায় স্বাদ ও রঙে এসেছে আলাদা বৈশিষ্ট্য।
খাবারের সঙ্গে সংস্কৃতির আয়োজন
নৈশভোজের টেবিলের বাইরে অতিথিদের জন্য ছিল সাংস্কৃতিক পরিবেশনাও। ‘ব্রিকস সিম্ফনি—ওয়ান রিদম, মেনি কালচারস’ শিরোনামের আয়োজনে অংশ নেন শতাধিক শিল্পী। খাবারের মেনুর মতো এই পরিবেশনাতেও বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের ধারণাটি তুলে ধরা হয়।
এত আয়োজনের মধ্যেও ছিলেন না চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংদেশে ফিরে যাওয়ায় নৈশভোজে অংশ নেননি আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদতবে এত আয়োজনের মধ্যেও ছিলেন না চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। দিনের সম্মেলন ও নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে তিনি বিশ্রামের জন্য হোটেলে ফিরে যান বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর পরিবর্তে নৈশভোজে চীনের প্রতিনিধিত্ব করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদও দিনের কর্মসূচি শেষে দেশে ফিরে যাওয়ায় নৈশভোজে অংশ নেননি।
সব মিলিয়ে, এই নৈশভোজের মেনু শুধু অতিথিদের আপ্যায়নের আয়োজন ছিল না; ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের রান্না, উপকরণ ও মিষ্টির ঐতিহ্যকে একই টেবিলে তুলে ধরারও একটি প্রচেষ্টা ছিল। আর সেই সঙ্গে আমিষ-নিরামিষ বিতর্ক আর নিরামিষ খাবার নিয়ে ভারত সরকারের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থান ও বার্তাও এতে উঠে এসেছে বলে মত দিচ্ছেন অনেকেই।
সূত্র: এনডিটিভি
ছবি: ইন্সটাগ্রাম