আইএমএফের কর্মসূচিতে যে সংস্কার জরুরি
· Prothom Alo

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তার ঋণ কর্মসূচির নকশা ও শর্তগুলো পর্যালোচনা করছে। কোভিড-১৯ মহামারির আগে, ২০১৯ সালে এ বিষয়ে সর্বশেষ বড় পর্যালোচনা হয়েছিল। এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। বিশ্বের বহু দেশ সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা ও ঋণসংকটে পড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে তাদের প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের সম্ভাবনার ওপর। ফলে আইএমএফের কর্মসূচি কীভাবে তৈরি ও বাস্তবায়িত হবে, সেই নীতিমালার গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
Visit lej.life for more information.
এই পর্যালোচনায় অন্তত তিনটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, ঋণ দেওয়ার শর্ত। যেসব দেশের অন্য কোনো উৎস থেকে অর্থ পাওয়ার সুযোগ নেই, তাদের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরানোই আইএমএফের অর্থায়নের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। অর্থনৈতিক মন্দার সময়ে সরকার যেন প্রয়োজনীয় ব্যয় বাড়িয়ে অর্থনীতিকে সচল রাখতে পারে এবং পরিস্থিতি ভালো হলে ব্যয় কমিয়ে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে পারে, সেই সুযোগ থাকতে হবে। কিন্তু এমন ঋণ পরিশোধে আইএমএফের অর্থ ব্যবহার করা উচিত নয়, যা নিজেই টেকসই নয়।
আইএমএফ ও এডিবি মিশন: এবার কি সত্যিই সংস্কার হবেআইএমএফের নীতিমালাতেও বলা আছে, তহবিলের অর্থ পেতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশের ঋণ পরিস্থিতি টেকসই হতে হবে। তা না হলে ঋণ পুনর্গঠনের মাধ্যমে পরিস্থিতি টেকসই করার উদ্যোগ নিতে হবে। আবার কোনো দেশ ঋণখেলাপি অবস্থায় থাকলেও আইএমএফ তাকে অর্থ দিতে পারে। অন্য ঋণদাতার কাছে বকেয়া থাকলেও অর্থায়ন করা সম্ভব। এর উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ঋণ পুনর্গঠনের পথ সহজ করা, পুরোনো ঋণ শোধ করে নতুন ঋণের বোঝা বাড়ানো নয়।
দুঃখজনকভাবে অনেক উন্নয়নশীল দেশে এর উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। আইএমএফের কর্মসূচির আওতায় সরকার অবকাঠামো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় কমাচ্ছে, অথচ বেসরকারি ঋণদাতা বা অন্য ঋণদাতাদের পাওনা পরিশোধ অব্যাহত রাখছে। বিশেষ করে যেসব ঋণদাতা পুরোনো ঋণ পরিশোধের জন্য নতুন ঋণ দিতে রাজি নয়, তাদের পাওনা মেটাতে গিয়ে জনস্বার্থের বিনিয়োগ কমানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
গত বছর পোপ ফ্রান্সিসের জন্য তৈরি ভ্যাটিকানের জুবিলি প্রতিবেদনেও এ উদ্বেগ উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় উন্নয়নশীল দেশগুলোকে দেওয়া বহুপক্ষীয় অর্থায়নের অর্থ অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বাড়ানোর বদলে বেসরকারি খাতে অর্থের বহির্গমন ঘটাতে সহায়তা করেছে বলে প্রতিবেদনে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
আইএমএফ প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভাতাই আইএমএফের কর্মসূচিতে অস্থিতিশীল পুঁজিপ্রবাহ ঠেকানোর ব্যবস্থাও থাকতে হবে। নিয়ন্ত্রণহীন পুঁজি প্রবাহ উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতিতে অস্থিরতা বাড়ায়, বিনিময় হারকে অনিশ্চিত করে এবং বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে। আইএমএফের অর্থ কোনোভাবেই পুঁজি পাচারে ব্যবহার করা যাবে না। দ্রুত মুনাফার আশায় এক দেশ থেকে অন্য দেশে অর্থের অস্থির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আইএমএফের অর্থের অপব্যবহার রোধেও কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, আকস্মিক পরিস্থিতি মোকাবিলার পরিকল্পনা থাকতে হবে। আইএমএফের কর্মসূচি সাধারণত কিছু অর্থনৈতিক পূর্বাভাস ও অনুমানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। কিন্তু অর্থনীতি কোনো স্থির সমীকরণ নয়। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যুদ্ধ, বাণিজ্য সংঘাত, পণ্যের দামের ওঠানামা বা আর্থিক সংকটের মতো আকস্মিক ঘটনা ঘটতেই পারে। তাই কর্মসূচির প্রাথমিক অনুমানের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির বড় পার্থক্য হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
এ কারণে কর্মসূচির নকশায় মধ্যমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য জরুরি বিনিয়োগ সুরক্ষিত রাখতে হবে। শিক্ষা, জ্ঞান ও অবকাঠামোর মতো খাতে বিনিয়োগ কমিয়ে সাময়িকভাবে হিসাব মেলানো হলে দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতি আরও দুর্বল হতে পারে। তাতে একটি দেশ আইএমএফের ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে বারবার নতুন কর্মসূচির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক কি সত্যিই রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হবেআইএমএফের অনেক কর্মসূচি প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। এর কারণ হতে পারে কর্মসূচি বাস্তবায়নে ব্যর্থতা, ভুল অর্থনৈতিক পূর্বাভাস বা নতুন কোনো বিরূপ অভিঘাত। তাই কর্মসূচি ব্যর্থ হলে শুধু ব্যয় কমানোর পথে না গিয়ে কেন ব্যর্থতা ঘটেছে, তা শনাক্ত করতে হবে এবং সে অনুযায়ী বিকল্প পরিকল্পনা নিতে হবে।
এ ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও জবাবদিহির প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের সঙ্গে গোপন চুক্তি করে জনগণের কাছ থেকে কোনো শর্ত আড়াল করা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। যেমন প্রকাশ্য চুক্তিতে একটি রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলো, কিন্তু গোপন পার্শ্বচুক্তিতে বলা হলো, লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে মূল্য সংযোজন কর বাড়াতে হবে। এ ধরনের ব্যবস্থা স্বচ্ছতার পরিপন্থী এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহিকে দুর্বল করে।
তৃতীয়ত, কর্মসূচির রাজনৈতিক ও সামাজিক সমর্থন নিশ্চিত করা জরুরি। আইএমএফের বিশেষ সুবিধার আওতায় নির্ধারিত সীমার বেশি ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে এটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আইএমএফের ঋণের দায় শুধু বর্তমান সরকারের নয়; তা পরবর্তী সরকার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও বর্তায়।
আইএমএফের কর্মসূচির চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকের উন্নতি। অন্য ঋণদাতাদের স্বল্পমেয়াদি ঋণখেলাপির ক্ষতি কমানো কিংবা কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করা এর উদ্দেশ্য হতে পারে না।
তাই কোনো কর্মসূচির প্রতি সমর্থন বলতে শুধু ক্ষমতাসীন সরকারের সম্মতি বা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি বোঝানো উচিত নয়। এর পেছনে ব্যাপক রাজনৈতিক ও সামাজিক সমর্থন থাকা দরকার। ক্ষমতাসীন সরকারের সিদ্ধান্তে দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের পাশাপাশি ক্ষমতায় টিকে থাকার রাজনৈতিক হিসাবও কাজ করতে পারে। ঋণদাতাদের সিদ্ধান্তেও কখনো রাজনৈতিক প্রভাব দেখা যায়। আইএমএফও তার বাইরে নয়।
এ ক্ষেত্রে সরকার ও আইএমএফের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির জন্য সংসদের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। এতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে, জনগণের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে। গণতন্ত্রের পশ্চাদপসরণের এই সময়ে এমন জবাবদিহি আরও জরুরি।
শেষ পর্যন্ত আইএমএফের সাফল্য মাপা উচিত একটি দেশের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা দিয়ে শুধু নয়, তার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও পুনরুদ্ধারে অর্থায়ন কতটা ভূমিকা রাখল, তা দিয়ে। বিশেষ করে দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতি হয়েছে কি না, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
আইএমএফের কর্মসূচির চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকের উন্নতি। অন্য ঋণদাতাদের স্বল্পমেয়াদি ঋণখেলাপির ক্ষতি কমানো কিংবা কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করা এর উদ্দেশ্য হতে পারে না। ঋণ কর্মসূচি যদি মানুষের জীবন ও অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার বদলে শুধু পুরোনো ঋণ শোধের ব্যবস্থা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সেই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়বে।
মার্তিন গুজমান আর্জেন্টিনার সাবেক অর্থমন্ত্রী এবং জোসেফ ই স্টিগলিৎস অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত ও বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ