শ্রমিকদের মানসিক স্বাস্থ্যে জোর দিন

· Prothom Alo

পোশাক কারখানাগুলোয় বিভিন্ন সময়ে ‘ভূত’ বা ‘জিন’-আতঙ্কে হঠাৎ একের পর এক শ্রমিকের অসুস্থ হয়ে পড়ার খবর আমাদের শ্রমিকদের জীবনযাপনের এক করুণ ও আশঙ্কাজনক চিত্র ফুটিয়ে তোলে। এসব ঘটনার সঙ্গে কারখানাগুলোর কর্মপরিবেশ এবং শ্রমিকের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

সাম্প্রতিক কয়েকটি কারখানাসহ অতীতে ঘটে যাওয়া একই ধরনের ঘটনা বিশ্লেষণ করলে একটি নির্দিষ্ট প্রবণতা লক্ষ করা যায়। যেমন গত মে মাসের প্রথম সপ্তাহে আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে নিউএইজ গ্রুপের একটি পোশাক কারখানার বাথরুমে দুজন নারী শ্রমিক অজ্ঞান হয়ে পড়লে কারখানাটিতে ‘জিন-আতঙ্ক’ ছড়িয়ে পড়ে এবং পরে আরও কয়েকজন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রায় প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে এমন একই ধারা ও মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ঘটনাগুলোকে অনেকে অলৌকিক বলে দাবি করলেও বা অপপ্রচারের চেষ্টা হলেও এর নেপথ্যে শ্রমপরিবেশ ও শ্রমিকদের মানবেতর জীবনযাপনের নিদারুণ বাস্তবতা রয়েছে বলে আমরা মনে করি।

Visit tr-sport.click for more information.

যদিও কারখানা কর্তৃপক্ষ প্রায়ই এসব ঘটনার পেছনে নানা ষড়যন্ত্র বা স্বার্থান্বেষী মহলের ইন্ধনের কথা বলে থাকে, তবে এসব সংকটকে শুধু ‘ষড়যন্ত্রতত্ত্ব’ দিয়ে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। বরং দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা এবং আড়ালে পড়ে থাকা জটিল সামাজিক ও শারীরিক সমস্যার উপসর্গ হিসেবেই এগুলোকে দেখা উচিত। এই সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিতকরণ ও টেকসই সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ করা জরুরি।

প্রথম আলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে শ্রমিকদের হতাশা, পুষ্টিহীনতা, শারীরিক দুর্বলতা, কুসংস্কার ও গুজবে বিশ্বাস করার প্রবণতার কথা উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মনোরোগ চিকিৎসার ভাষায় মাথা ঘোরানো, বমি ভাব, পেটব্যথার উপসর্গগুলোকে কনভারশন ডিজঅর্ডার বলা হয়। যখন এ ধরনের উপসর্গ একজনের থেকে অন্য অনেকের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেটিকে বলা হয় ‘গণমনস্তাত্ত্বিক রোগ’। সাধারণত স্কুল, হোস্টেল বা কারখানার মতো যেসব স্থানে একই সঙ্গে অনেকে অবস্থান করেন বা কাজ করেন, সেখানে এ ধরনের রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি বেশি থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক চাপ, পারিবারিক ও সামাজিক দ্বন্দ্বের কারণে এ ধরনের আলামত দেখা দেয়। বাংলাদেশের পোশাক খাতের শ্রমিকদের দৈনন্দিন কষ্টের জীবন সর্বজনবিদিত। আমরা মনে করি, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার চাপ, অপর্যাপ্ত বিশ্রাম, নিম্ন মজুরির কারণে সুষম খাদ্যের অভাব এবং পারিবারিক বা মানসিক উদ্বেগ শ্রমিকদের শারীরিকভাবে দুর্বল ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। এটি কোনো একক শ্রমিকের সংকট নয়; বরং কারখানার সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমিক প্রায় একই ধরনের মানসিক ও শারীরিক সংকটের মধ্যে দিনাতিপাত করেন। ফলে তাঁদের অসুস্থ হয়ে পড়ার বিষয়টিকে ভূতের আসর হিসেবে না দেখে শ্রমিকদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির ফল হিসেবে দেখাটা জরুরি। 

লক্ষ করা গেছে, কর্তৃপক্ষ জিন তাড়াতে কারখানায় মিলাদের আয়োজন করেছে, তান্ত্রিক এনে ঝাড়ফুঁকও করানো হয়েছে। সাধারণ শ্রমিকদের একটি অংশের এমন সংস্কারকে সহানুভূতির সঙ্গে দেখা যেতে পারে, কিন্তু কর্তৃপক্ষ কেবল এগুলোর দিকে মনোযোগ দিলে মূল সংকটের গভীরে পৌঁছানো সম্ভব হবে না। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে এখনো মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয় না।    

এ অবস্থায় আমরা মনে করি, শ্রমিকদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়ার সময় এসেছে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শ্রমপরিবেশ ও শ্রমিকদের জীবনযাপনের পরিবর্তনের প্রশ্নও। কারখানা মালিক, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং সরকারকেই সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বর্তমান বাজারব্যবস্থার সঙ্গে সংগতি রেখে শ্রমিকদের জন্য জীবনধারণের উপযোগী উপযুক্ত মজুরি ও নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শ্রমিকদের মানসিক চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জোরদার করতে হবে।

Read full story at source