‘আমার তো সব শেষ হয়ে গেল, এখন আমি কী নিয়ে বাঁচব’
· Prothom Alo

একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিমের লাশ উদ্ধারের পর থেকে নিজেকে সামলাতে পারছেন না কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগম। কথা বলতে গেলেই কান্নায় ভেঙে পড়ছেন, মূর্ছা যাচ্ছেন। একই রকম অবস্থা অপ্রতিমের ব্যবসায়ী বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে নাহিদা বলেন, ‘আমার একটাই মাত্র ছেলে। এখন আমি কী নিয়ে বাঁচব। তোরা আইফোন নিয়ে যেতি, কিন্তু আমার ছেলেকে খুন করলি কেন? আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দাও। অপ্রতিম আমার বুকের মানিক, তোকে ছাড়া কীভাবে বাঁচব, বাবা।’
Visit esporist.com for more information.
নিখোঁজের এক দিন পর আজ শনিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার মাথায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে বলে জানায় পুলিশ। এ ঘটনায় একজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ।
‘কাকা, একটা বাচ্চা পড়ে আছে’—যেভাবে জঙ্গলে পাওয়া গেল অপ্রতীমের লাশএকমাত্র সন্তান অপ্রতিমকে হারিয়ে মা নাহিদা বেগমের আহাজারিকুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি কোটবাড়ির গন্ধমতী (দক্ষিণ বাগমারা) এলাকার নুরজাহান ভিলার তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করেন নাহিদা বেগম ও ফিরোজ শাহরিয়ার দম্পতি। সেখানেই আজ বিকেলে অপ্রতিমের বিষয়ে কথা হয় এই প্রতিবেদকের।
শোকের সঙ্গে নাহিদা বেগমের অসহায় প্রশ্ন, কেন তাঁর সন্তানকে এভাবে চলে যেতে হলো। তিনি বলেন, ‘আমার ছোট্ট ছেলেটাকে অনেক কষ্ট দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। মৃত্যুর সময় ছেলেটা কীভাবে ছটফট করেছিল, কে জানে। আমার তো সব শেষ হয়ে গেল। এখন আমি কী নিয়ে বাঁচব। যারা আমার ছেলেকে খুন করেছে, আমি তাদের বিচার চাই।’
কথা বলতে বলতে আবারও অপ্রতিমের কথা মনে পড়ে যায় নাহিদার। তিনি বলেন, ‘ছেলেটাকে নিয়ে বুকভরা স্বপ্ন ছিল। কোনোভাবেই মানতে পারছি না, আমার সেই ছেলে এখন লাশ।’
একসময় আক্ষেপ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক বলেন, ‘আমার ছেলের কী অপরাধ ছিল যে তাকে হত্যা করা হলো? আমি কুমিল্লায় চাকরি করতে এসেছি, এটা কি আমার অপরাধ? বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পাশেই কেন একজন শিক্ষক আর তাঁর সন্তানকে এমন ঘটনার শিকার হতে হবে?’
‘এইরকম ১০টা ফোন মুক্তিপণ হিসেবে চাইতি—আমরা দিতাম’ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিম‘অপ্রতিম ছিল আমাদের পৃথিবী’
অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার মুঠোফোনের যন্ত্রাংশ ও সরঞ্জামের ব্যবসা করেন। ছেলেকে হারিয়ে তিনি অনেকটাই বাক্রুদ্ধ। কথা বলতে গিয়ে বারবার থেমে যাচ্ছিলেন। ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, ‘অপ্রতিম ছিল আমাদের পৃথিবী। তাকে নিয়েই আমাদের সাজানো সংসার। কিন্তু সামান্য একটি আইফোনের জন্য আমার ছেলেটা আজ পৃথিবীতে নেই। কেন আমার ছেলেটাকে এভাবে হত্যা করা হলো, আমি তার বিচার চাই।’
ছেলের নিখোঁজ হওয়ার আগের সময়টুকু মনে করে ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, শুক্রবার দুপুরে তিনি ছেলেকে খাবার খাইয়েছিলেন। এরপর ছেলেকে বাইরে না যেতে বলেছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি ওকে দুপুরে খাবার খাইয়েছি। পরে বললাম, “বাবা, তুমি আজ বাইরে যেয়ো না। আমরা একসঙ্গে একটু ঘুরব, মুভি দেখব বাসায়। বিকেলে তোমাকে একটা ভালো গিফট দেব।” কিন্তু সে বলল, বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে যাবে। এরপর চলে গেল। এরপর আর ছেলে ফিরে আসেনি।’
একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে অনেকটাই বাকরুদ্ধ বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার (সবুজ রঙের গেঞ্জি পরা)ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, ‘পরে আমরা থানায় জিডি করেছি, নানা জায়গায় যোগাযোগ করেছি। পুলিশসহ সবাইকে জানিয়েছি। অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু আর পাওয়া যায়নি। অবশেষে এভাবে আমার ছেলেকে পাওয়া গেল।’
কথাগুলো বলতে বলতে কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে ফিরোজ শাহরিয়ারের। তিনি বলেন, ‘এইভাবে আসলে আমার আর কথা বলার মতো মন নেই। আমি শুধু আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই। ও আমাদের একমাত্র সন্তান। মনে হচ্ছে, বাঁচার অবলম্বনটুকু হারিয়ে ফেলেছি।’
নাহিদা ও ফিরোজের ফ্ল্যাটের দেয়াল ও আসবাবে অপ্রতিমের উপস্থিতির নানা চিহ্ন। ছোটবেলার ছবি, স্কুলজীবনের ছবি-বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাওয়া ছেলেটির মুখের নানা স্মৃতি সেখানে ধরে রাখা। দরজার পাশের কাঠের ফলকে লেখা ‘অপ্রতিমদের বাসা, প্রযত্নে নাহিদ ও শাহরিয়ার’। সেটিও যেন বলে দেয়, এই পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু ছিল অপ্রতিম।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের নিখোঁজ ছেলের লাশ জঙ্গল থেকে উদ্ধারবাসার দরজার পাশে কাঠের ফ্রেমে লেখা ‘অপ্রতিমদের বাসা, প্রযত্নে– নাহিদ ও শাহরিয়ার’। সেই বাসাতেই এখন শোকের আবহনাহিদা বেগম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন ২০১৫ সালে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি কোটবাড়ির গন্ধমতী (দক্ষিণ বাগমারা) এলাকায় তাঁরা বসবাস করছিলেন। তাঁদের একমাত্র সন্তান অপ্রতিম পড়ত কোটবাড়ি এলাকার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে।
অপ্রতিমের বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ফেরদৌসী জাহান বলেন, অপ্রতিম ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে তাঁদের বিদ্যালয়ে পড়ত। এখন সপ্তম শ্রেণিতে ছিল। পড়াশোনায় ভালো ছিল। একটু চুপচাপ, মিশুক ও শান্ত স্বভাবের ছেলে ছিল। বিদ্যালয়ে অপ্রতিমকে কখনো কোনো ঝামেলায় জড়াতে দেখা যায়নি। সহপাঠীদের কাছ থেকেও তার সম্পর্কে নেতিবাচক কিছু শোনা যায়নি। অপ্রতিমের এমন মৃত্যু তার সহপাঠী ও বিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষার্থীদেরও গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।