‘বন্দে মাতরম’ না গাওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ হতে পারে না: ভারতের সুপ্রিম কোর্ট
· Prothom Alo

বিবেকের ডাকে সাড়া দিয়ে কেউ যদি জাতীয় গান ‘বন্দে মাতরম’ গাইতে অস্বীকার করেন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হওয়া উচিত নয়। বন্দে মাতরম নিয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ এটাই। গতকাল মঙ্গলবার এ–সংক্রান্ত এক মামলার শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তর বেঞ্চ এই মৌখিক পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে জানিয়েছেন, কেউ বন্দে মাতরমের পুরোটা না গাইলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
বন্দে মাতরমের মোট ছটি স্তবক। কিন্তু স্বাধীনতার আগে থেকে সর্বত্রই প্রথম দুটি স্তবক গেয়ে আসা হচ্ছে, যেহেতু পরবর্তী স্তবকগুলোতে হিন্দু দেবী দুর্গা, কালী, লক্ষ্মী, সরস্বতীর স্পষ্ট উল্লেখ আছে। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতারা এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। কারণ, কংগ্রেসের মুসলিম নেতারা ওই গান নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। পুরোটা গাইতে তাঁরা অস্বীকার করেছিলেন। ১৯৩৭ সালে জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনের আগে তাই মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, মৌলানা আজাদ, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলরা রবীন্দ্রনাথের কাছে এই গান সম্পর্কে তাঁর মতামত জানতে চান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই প্রথম দুটি স্তবক গাওয়ার পরামর্শ দেন। সেই প্রথা কংগ্রেস আজও চালিয়ে যাচ্ছে।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
এই গানের দেড় শ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিজেপি নেতৃত্বাধীন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার জাতীয় সম্মান অবমাননা প্রতিরোধ (সংশোধনী) বিলে জাতীয় সংগীতের মতো জাতীয় গানকেও আইনগত সুরক্ষা দেয়। নতুন বিধান অনুযায়ী, জাতীয় সংগীতের মতো বন্দে মাতরম গাইতেও কেউ যদি বাধা দেন বা না গান কিংবা সেই গান গাওয়ার সময় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন, তবে তা অপরাধ বলে গণ্য হবে। সাজা হিসেবে সর্বোচ্চ তিন বছরের জেল, জরিমানা অথবা দুটোই। সরকারের ওই বিধানের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে একাধিক মামলা করা হয়েছে।
বিশিষ্ট কর্ণাটকী সংগীতশিল্পী টি এম কৃষ্ণ সুপ্রিম কোর্টে এক রিট পিটিশন করেন। তাতে তিনি জাতীয় গানের সব কটি স্তবক গাওয়া বাধ্যতামূলক করার সরকারি নিয়ম এবং লঙ্ঘনকারীকে শাস্তির আওতায় আনার আইনি বিধানকে চ্যালেঞ্জ জানান। গত মঙ্গলবার তারই শুনানিতে প্রধান বিচারপতির এজলাসে ওই মৌখিক পর্যবেক্ষণ করা হয়। বিচারপতিরা বলেন, জাতীয় গানের সংজ্ঞা নিরূপণ করা আদালতের এখতিয়ার নয়। তবে কোনো নাগরিক যদি বিবেকজনিত কারণে পুরো গানটি গাইতে না চান অথবা তাঁকে যাতে তা গাইতে বাধ্য করা না হয়, আদালত তা খতিয়ে দেখতে পারে।
শুনানির সময় বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ১৯৮৬ সালের বিজোই ইমানুয়েল মামলার উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ধর্মীয় কারণে কেরলমের এক স্কুলে জাতীয় সংগীত গাইতে অসম্মত হওয়া তিন পড়ুয়াকে সুপ্রিম কোর্ট আইনি রক্ষাকবচ দিয়েছিলেন। সুপ্রিম কোর্টের রায় ছিল, জাতীয় সংগীতের অপমান বা অসম্মান করার অপরাধে কারাবাস ও জরিমানার যে বিধান রয়েছে, না গাওয়ার ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য হতে পারে না। মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট এই বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের অভিমত তলব করেছে। দুই সপ্তাহের মধ্যে তা দিতে বলা হয়েছে। যদিও এই বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারকে নোটিশ দেওয়া হয়নি।
মঙ্গলবার ওই মামলার শুনানির সময় সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতার সঙ্গে তীব্র বাগ্যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন আবেদনকারী টি এম কৃষ্ণের আইনজীবী এস মুরলীধর। মুরলীধর বলেন, বন্দে মাতরমের শেষ চার স্তবকে হিন্দু দেবীদের বর্ণনা রয়েছে। সম্পূর্ণ গানটি গাইতে বাধ্য করা দেশের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের পরিপন্থী। তিনি বলেন, কোনোরকম জাতীয় ঐকমত্য বা জনমত গঠন না করে তড়িঘড়ি করে ওই সংশোধনী চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আইনজীবী মুরলীধরের এই বক্তব্যের পিঠে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা বলেন, সংবিধান অনুযায়ী সাংবিধানিক রীতি ও পদ্ধতি মেনে আইন প্রণয়ন হয় এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নকশালপন্থীদের চিন্তাভাবনা অনুযায়ী বা তাদের দাবি মেনে হয় না। তুষার মেহতার ওই মন্তব্যের বিরোধিতা করে মুরলীধর বলেন, স্বাধীনচেতা মানুষ মানেই নকশালপন্থী নয়। সলিসিটর জেনারেল ও মামলাকারীর আইনজীবীর বাগ্বিতণ্ডায় বিচারপতিরা হস্তক্ষেপ করেননি। তবে জানিয়েছেন, মেহতা ও মুরলীধরের মন্তব্যগুলো নথিভুক্ত হবে না।
কেন্দ্রীয় সরকারি বিধান সত্ত্বেও কংগ্রেস নেতারা দলীয় অনুষ্ঠানে এখনো বন্দে মাতরম পুরো গানটি গাইছেন না। ১৯৩৭ সাল থেকে চলে আসা প্রথা অনুযায়ী তাঁরা প্রথম দুই স্তবকই গাইছেন। সম্প্রতি কর্ণাটক বিধানসভা ও বিধান পরিষদে শাসক দল কংগ্রেসের বিধায়কেরা বন্দে মাতরমের প্রথম দুটি স্তবক গেয়ে থেমে যান। প্রতিবাদে বিরোধীরা পুরো গানটি গান। সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে কংগ্রেস নেতারা বলেছেন, সরকার বলুক—রবীন্দ্রনাথ, নেহরু, গান্ধী, সুভাষচন্দ্র, সর্দার প্যাটেলরা অপরাধী, দেশদ্রোহী!
জম্মু-কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতা ওমর আবদুল্লাহ সম্প্রতি বন্দে মাতরম নিয়ে শরিক কংগ্রেসের দাবি মানতে অস্বীকার করেন। এক সরকারি অনুষ্ঠানে কংগ্রেস নেতারা প্রথম দুই স্তবক গাওয়ার ওপর জোর দিলেও মুখ্যমন্ত্রী ওমর তা না মেনে বলেন, রাজ্য সরকার আইন ভাঙতে পারে না। কংগ্রেসের উদ্দেশে তিনি বলেন, ক্ষমতায় এসে কংগ্রেস আইন বদলে দিক। কিন্তু তা না হওয়া পর্যন্ত তিনি আইন মেনে চলবেন। ওমর বলেন, ‘আমি চাই না কাশ্মীরিদের এ কারণে জেলে যেতে হোক।’