আখতার হুসেন: আমাদের ছড়া-দাদু
· Prothom Alo

আখতার হুসেন বাংলা শিশুসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছড়াকার। দীর্ঘ ছয় দশকের বেশি সময় ধরে তিনি শিশু-কিশোরদের জন্য লিখেছেন। বড়দের জন্য লিখেছেন অসংখ্য লেখা, করেছেন অনুবাদ। গীতিকার হিসেবেও তিনি সুপরিচিত। ছড়া, গল্প, কবিতা, নাটক, গান, জীবনী, অনুবাদ সম্পাদনাসহ সাহিত্যের নানা ক্ষেত্রে তাঁর কাজ ছড়িয়ে আছে। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৮০-এর বেশি। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকে প্রকাশিত পাঁচ খণ্ডের ‘শিশু-বিশ্বকোষ’-এ সবচেয়ে বেশি ভুক্তি লেখার কৃতিত্বও তাঁর। ২৪ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার দুপুরে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা গেছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮১ বছর।
Visit newsbetting.bond for more information.
কিশোর পাঠকদের কাছে তিনি ছড়া-দাদু হিসেবে পরিচিত। কিশোর আলোর পাঠকের কাছে তিনি বহুদিনের প্রিয় লেখক। মজার ছড়া লেখার জন্য তাঁর পরিচিতি আছে শিশু-কিশোরদের মধ্যে। ‘হ্যাঁরে, খবরটা কি উড়ো, শুনতে পেলাম নিখিলপুরের চার–চারটে বুড়ো’ তাঁর লেখা এমন মজার ছড়া পড়ে কত যে শিশু হেসেছে, হিসাব নেই। তাঁর লেখা ছড়া পাঠ্যবইয়েও স্থান পেয়েছে।
হ্যাঁরে, খবরটা কি উড়ো?
শুনতে পেলাম নিখিলপুরের চার-চারটে বুড়ো
কাঁদেন কেবল লাগিয়ে চোখে শুকনো মরিচ গুঁড়ো,
আরে, কী বললি দূরো!
খাওয়ার সময় খায় কী জানিস? পাঁচটা রুইয়ের মুড়ো।
বয়স ওদের জানিস কতো? আটশো নাকি পুরো।
হ্যাঁরে, খবরটা কি উড়ো?
দুপুরের ভাত খাবার সময়আখতার হুসেনের জন্ম ১৯৪৫ সালের ১ নভেম্বর। তাঁর পৈতৃক বাড়ি নাটোরের লালপুর উপজেলার নুরুল্লাপুর গ্রামে। বাবা টি আই এম সিকান্দার রেলওয়েতে চাকরি করতেন। বাবার চাকরির কারণে খুলনা, গফরগাঁও, কুলাউড়াসহ দেশের নানা জায়গায় কেটেছে তাঁর শৈশব-কৈশোর।
তাঁর লেখায় এসেছে সমুদ্র, আকাশ, পাখি, রূপকথা। এসেছে দেশ আর স্বাধীনতার কথা। মজার ছড়া বুঝি সবচেয়ে পাঠকপ্রিয়। যেমন কিশোর আলোতে ছাপা হয়েছে তাঁর লেখা গুগল নিয়ে ছড়া!
মোটেও যা নেই বইয়ে কিংবা ভূগোলে
তা-ই আছে জেনো গুগলে গুগলে গুগলে।
কোথায় কী কাজ করছে সরল গাধারা
ভিরমি কেনই খাচ্ছে তাদের দাদারা
সবই পাওয়া যায় ঠিকমতো সার্চ করলে।
বললে কি তুমি—মিছে কথা! বাজি ধরলে?
তুমি না একটা মূর্খ খাসির বাচ্চা
মোটাই হয়েছ, জানো না ব্যাপার সাচ্চা।
গুগলেই সার্চ করলে পাবে যে তথ্য
দেখবে কিসের কারণে কারা যে মত্ত।
হ্যানয়ে কেনই সিংহরা শুধু কাঁদছে
বেড়ালেরা কেন গিটারেই গলা সাধছে!
জীবনরক্ষায় স্মার্টফোনের যে ফিচারগুলো চালু রাখতে হবেবইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে (বাঁ থেকে) লেখক রেজা ঘটক, শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেন, লেখিকার মা মালঞ্চ গমেজ, লেখক সুপর্ণা এলিস গমেজ, কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক এবং পিউস রোজারিও।আখতার হুসেনের জন্ম ১৯৪৫ সালের ১ নভেম্বর। তাঁর পৈতৃক বাড়ি নাটোরের লালপুর উপজেলার নুরুল্লাপুর গ্রামে। বাবা টি আই এম সিকান্দার রেলওয়েতে চাকরি করতেন। বাবার চাকরির কারণে খুলনা, গফরগাঁও, কুলাউড়াসহ দেশের নানা জায়গায় কেটেছে তাঁর শৈশব-কৈশোর। আর সেই ঘুরে বেড়ানো শৈশবই পরে তাঁর লেখার ভুবনে নানা রং এনে দিয়েছিল। গফরগাঁওয়ে তাঁর সাহিত্যজীবনের শুরু, কুলাউড়ায় প্রকাশিত হয় প্রথম মুদ্রিত লেখা।
শুধু লেখক হিসেবে নয়, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ছিল গভীর। বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ছিলেন তিনি। সংগঠনটির প্রথম দিককার অনেক নাটক লিখেছেন ও নির্দেশনা দিয়েছেন। খেলাঘরেরও প্রথম সারির সংগঠক ছিলেন। ছাত্র ইউনিয়ন ও খেলাঘরের সংগঠন সংগীত ‘আমরা তো সৈনিক, শান্তির সৈনিক’ তাঁরই লেখা।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও তাঁর কলম হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের ভাষা। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত তাঁর লেখা এবং অজিত রায়ের সুরে তিমির নন্দীর গাওয়া ‘স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে জাগছে বাঙালিরা’ গানটি মুক্তিযুদ্ধের সময় মানুষের মধ্যে উদ্দীপনা তৈরি করেছিল।
স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে জাগছে বাঙালিরা
রুখবে তাদের কারা, আজ রুখবে তাদের কারা।।
আকাশ বাতাস পথে প্রান্তরে জয়ধ্বনি শোনা যায়
শৃঙ্খল বেড়ি কে আর পরাবে ওদের কঠিন পায়।
জীর্ণ ধরার ভিত ধরে ওরা দেবেই দেবে যে নাড়া ।।
জেনেছে ওরা ধুঁকে ধুঁকে মরা সেই তো জীবন নয়
শোষণের বুকে হানছে আঘাত নির্ভীক বরাভয়।
কণ্ঠে ওদের ঘুম ভাঙানিয়া দীপ্ত শপথ গান
বিপ্লবী ওরা আঁধারের দেশে সূর্যের সন্তান
মহাকাল আসে মহাকাল দিক দিগন্তে সাড়া।।
কাজপ্রতীকী এই ছবিতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মডেল হয়েছেন শিশু সাহিত্যিক আখতার হুসেনআখতার হুসেনের অনেকগুলো বই বেশ জনপ্রিয়। ‘সমুদ্র অনেক বড়’, ‘রামধনুকের সাঁকো’, ‘উল্টোপাল্টা’, ‘হালচাল’, ‘আমার দুটো ডানা’, ‘ও হাওয়া ও হাওয়া’, ‘পাজি বেড়ালের শাস্তি’, ‘ফ্রিডম ফাইটার’, ‘কর্ণকুসুম ও কালোপাখার প্রজাপতি’, ‘খেলাঘরের পুতুলগুলো’ ‘ছোটদের চারণকবি মুকুন্দদাস’সহ অনেক বই এখন পাঠকের হাতে আছে।
আখতার হুসেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক-শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, ভাষাশহীদ আবদুল জব্বার স্মৃতিপদকসহ বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। বাংলা একাডেমির ফেলোও ছিলেন তিনি।
পেশাজীবনে সাংবাদিকতা দিয়ে শুরু করেছিলেন আখতার হুসেন। দৈনিক সংবাদ, দৈনিক জনকণ্ঠ, প্রথম আলোসহ বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করেছেন। পরে প্রথমা প্রকাশনে পাণ্ডুলিপি সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রথমায় পাণ্ডুলিপি সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
কিশোর আলোর শুরু থেকেই তিনি নিয়মিত লিখেছেন। কিশোর আলোর নানা আয়োজনেও তিনি অংশ নিয়েছেন। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে শিশু-কিশোরদের বিভিন্ন আয়োজনে তাঁকে পাওয়া গেছে হাসিমুখে। ২০২৫ সালের ১ অক্টোবর কিশোর আলোর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শিশু-কিশোর সম্মেলনেও তিনি উপস্থিত ছিলেন। পাঠকের উদ্দেশে কথা বলেছিলেন।
আখতার হুসেনের মৃত্যুতে কিশোর আলোর পাঠকেরা প্রিয় লেখককে হারিয়েছে। তাঁর ছড়া, তাঁর লেখা আমাদের সঙ্গে থেকে যাবে। কিশোর আলোতে প্রকাশিত তাঁর ছড়া ও কবিতাগুলোও নতুন পাঠকের চোখে পড়বে। এভাবে লেখার মধ্যে টিকে থাকবেন ছড়া-দাদু আখতার হুসেন।
ট্যুরেট সিনড্রোম ছাপিয়ে সব জয় করা বিলি আইলিশ