দেশের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে

· Prothom Alo

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের সম্ভাবনা, বৈশ্বিক শান্তি ও সহযোগিতা এবং রাষ্ট্র মেরামতের দিকনির্দেশনাসহ দেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামো সম্পর্কে যে দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন, তা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এমন একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও কল্যাণমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছেন, যেখানে দলমত-ধর্ম-জাতিগত পরিচয়নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিক সমান অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে নিরাপদে বসবাস করতে পারবেন। আন্তর্জাতিক পরিসরে উচ্চারিত তাঁর এ অঙ্গীকার অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।

প্রধানমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন, নাগরিকদের ক্ষমতাহীন রেখে কোনো রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না। একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের ভিত্তি শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো কিংবা সামরিক সক্ষমতা নয়; এর মূল শক্তি স্বাধীন ও মর্যাদাবান নাগরিক। সেই নাগরিকের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের আশ্রয় পাওয়ার অধিকার এবং অর্থনৈতিক সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় ও ব্যক্তিগত প্রভাবমুক্ত রেখে জনগণের কাছে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই মৌলিক শর্ত পূরণ ছাড়া কল্যাণমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ঘোষণা কেবল আকাঙ্ক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

Visit mwafrika.life for more information.

প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে মানবাধিকার, সুশাসন ও জবাবদিহির প্রশ্নেও উন্নতির কথা বলেছেন। এখন প্রয়োজন তাঁর এই বক্তব্যের সঙ্গে দেশের বাস্তবতার সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করা। হেফাজতে নির্যাতন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তাহীনতা এবং মতপ্রকাশে বাধার অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনকে আইনের মধ্যে থেকে কাজ করতে হবে। স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, কার্যকর সংসদ, স্বাধীন গণমাধ্যম এবং শক্তিশালী মানবাধিকার ও দুর্নীতি দমন প্রতিষ্ঠান ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত রাষ্ট্র মেরামতের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করা কঠিন।

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে রোহিঙ্গা সংকট, ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, নিরস্ত্রীকরণ এবং সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের বিষয়গুলো যথার্থ গুরুত্ব পেয়েছে। ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার দীর্ঘ উপস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর বিপুল চাপ সৃষ্টি করেছে। নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় ভূমিকা চাওয়ার পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের জীবন রক্ষাকারী সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বানও যৌক্তিক। তবে বাংলাদেশকেও মানবিকতা ও মানবাধিকারের নীতি অক্ষুণ্ন রেখেই এ সংকট মোকাবিলা করতে হবে।

আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা বিদেশি বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু বিনিয়োগকারীদের আস্থা কেবল আহ্বানের মাধ্যমে অর্জিত হয় না। প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, নির্ভরযোগ্য বিচারব্যবস্থা এবং স্বচ্ছ ব্যবসায়িক পরিবেশ। একইভাবে প্রযুক্তিগত অগ্রযাত্রার সুফল পেতে হলে ডিজিটাল বিভাজন কমানো, গবেষণার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে মানবাধিকারসম্মত নীতি প্রণয়ন জরুরি।

জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী যে বাংলাদেশের ছবি তুলে ধরেছেন, তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব মূলত তাঁর সরকারকেই নিতে হবে। অঙ্গীকার তখনই বিশ্বাসযোগ্য হয়, যখন তা নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনে প্রতিফলিত হয়। তাই এখন প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা, সময়সীমা, স্বচ্ছতা এবং নিয়মিত অগ্রগতির মূল্যায়ন। সবার আগে ও সবার জন্য বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে হলে সরকারকে সমালোচনা গ্রহণ করতে হবে, বিরোধী মতের জায়গা নিশ্চিত করতে হবে এবং ক্ষমতার প্রতিটি স্তরে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাহলেই শুধু বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব হবে।

Read full story at source