হাটখোলার নির্জন রাতে শিক্ষার আলো

· Prothom Alo

দিনের ব্যস্ততা শেষে যেখানে নীরবতা নেমে আসার কথা, সেখানে হাটখোলার টিনশেড থেকে ভেসে আসছে কোমল গলার আবৃত্তি—‘অ-এ অজগর আসছে তেড়ে...’। দিনজুড়ে কেনাবেচার যে হাটবাজারে হাঁকডাক থাকে, রাতের আঁধারে সেটাই বদলে যাচ্ছে এক অনন্য পাঠশালায়। স্থানীয় কিছু উদীয়মান যুবক নিঃস্বার্থভাবে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন গ্রামের শিশুদের মধ্যে।

এ দৃশ্য দেখা যায় দিনাজপুর জেলার চিরিরবন্দর উপজেলার কারেন্টহাট হাটখোলা বাজারে। এখানকার অধিকাংশ মানুষ কৃষক ও শ্রমজীবী হওয়ায় বাচ্চাদের ভালো কোনো স্কুলে পড়াতে পারেন না। অধিকাংশ অভিভাবক স্বল্প আয়ের, কেউ আবার নিরক্ষর। এসব পরিবারের বাচ্চাদের একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে এই হাটখোলার রাতের পাঠশালা, বর্তমানে যার শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৯৭।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

পাঠশালার শিক্ষার্থীদের বই উপহার দিয়েছে দিনাজপুর বন্ধুসভা।

হাটবাজারের দিনের কোলাহল শেষে সন্ধ্যা নামলে সাধারণ মানুষ যখন ঘরে ফেরে, তখন টিনশেডের বাতির আলোয় জমে ওঠে পড়াশোনা। খোলা মেঝেতে এক টুকরো কাপড় বিছিয়ে বসে শিশুরা গভীর মনোযোগে অক্ষর চেনে, নতুন স্বপ্নের বুনন শেখে।

এ উদ্যোগকে আরও এগিয়ে নিতে এবং কোমলমতি শিশুদের মনে পড়াশোনার আগ্রহ দ্বিগুণ করতে পাশে দাঁড়িয়েছে দিনাজপুর বন্ধুসভা। ২৭ সেপ্টেম্বর দিনাজপুর বন্ধুসভার একদল তরুণ স্বেচ্ছাসেবী হাটখোলার এই রাতের বিদ্যালয়ে হাজির হয়ে শিশুদের বিভিন্ন শিক্ষাসামগ্রী বিতরণ করেন। প্রত্যেক শিশুর হাতে তুলে দেওয়া হয় নতুন বই, খাতা, কলম, ম্যাগাজিন ও নাশতা।

স্থানীয় যুবকদের সংগঠন একতা যুব সংঘের সদস্যদের মাধ্যমে পরিচালিত হয় এই পাঠশালা। এতে স্বেচ্ছাসেবায় নিয়মিত পাঠদান করান লিয়াকত আলী, দীপ্তি রানী বিশ্বাস ও মাহাফুজ ইসলাম।

পাঠশালার শিক্ষার্থীদের বই উপহার দিয়েছে দিনাজপুর বন্ধুসভা।

নাম প্রকাশ অনিচ্ছুক একজন অভিভাবক বলেন, ‘মুই পড়াশুনা জানো না সারা দিন মাঠে কামকাজ করো। ছাওয়াটাও ধুলা মাটিতে ঘুরাঘুরি করি বেড়ায় সারা দিন। হাটখোলাত স্কুলটা হওয়ার পর সন্ধ্যা হলে নিয়মিত আইসে। বিনা টাকায় এখানে পড়িবার পায় হামার মতো গরিব মানুষের জন্য অনেক ভালো হইছে।’

হাটখোলা পাঠশালার শিক্ষার্থী বৃষ্টি দাশ (৫) বলে, ‘এখানে স্যাররা আমাদের অনেক কিছু শেখায়। আমি এখন অনেক কবিতা বলতে পারি।’ এরপরই সে কয়েকটি কবিতা শোনায়।

পাঠশালার শিক্ষার্থীদের বই উপহার দিয়েছে দিনাজপুর বন্ধুসভা।

এ বিষয়ে দিনাজপুর বন্ধুসভার সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব চন্দ্র রায় বলেন, ‘বন্ধুসভা তারুণ্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সমাজের জন্য ইতিবাচক কিছু করার একটি সুন্দর প্ল্যাটফর্ম। বন্ধুরা শিক্ষা, মানবিকতা, পরিবেশ ও সামাজিক সচেতনতার বিভিন্ন কার্যক্রমে করে থাকে। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বিভিন্ন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে আজকের এ উদ্যোগ।’

পাশে থাকায় দিনাজপুর বন্ধুসভাকে ধন্যবাদ জানিয়ে একতা যুব সংঘের সভাপতি ডা. ওয়াসিম উদ্দীন শাহ্ বলেন, ‘সমাজের সবার মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়াই এ কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য। এখানে পড়াশোনা করা শিশুরা সবাই শ্রমজীবী ও খেটে খাওয়া পরিবারের সন্তান। চিরিরবন্দর শিক্ষানগরী হিসেবে পরিচিত হলেও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার জন্য মাসে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ হয়; যা অনেক শ্রমজীবী পরিবারের পক্ষে বহন করা কঠিন।’

সাধারণ সম্পাদক, দিনাজপুর বন্ধুসভা

Read full story at source