অভ্যাস বদলে চায়ের দেশে বাড়ছে কফির চাহিদা
· Prothom Alo

পানীয় হিসেবে এ অঞ্চলে চায়ের প্রচলন শুরু হয় ব্রিটিশ আমলে। এরপর সমাজের সব শ্রেণির মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে ওঠে চা। সকালে ঘুমঘুম চোখে চায়ের কাপ আর পত্রিকা, বন্ধুদের আড্ডা কিংবা অতিথি আপ্যায়ন—চা–ই ছিল অন্যতম অনুষঙ্গ। তবে গত এক দশকে এই চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। চায়ের সেই একচেটিয়া জায়গায় এখন শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে কফি।
এখন কারও সঙ্গে দেখায় প্রশ্ন আসে, ‘চা নাকি কফি?’ ক্রমবর্ধমান চাহিদার হাত ধরে কফি এখন দারুণ জনপ্রিয়। শহরের ক্যাফে, শপিং মলের আউটলেট আর অফিসের প্যান্ট্রিতে কফি এখন অপরিহার্য বিকল্প। কফির এই বিশাল চাহিদার একটি অংশ এখন দেশীয় উৎপাদনে মিটছে। ফলে মান ও দামে টেক্কা দিয়ে কমতে শুরু করেছে বিদেশনির্ভরতা।
Visit fishroad-app.com for more information.
কফির চাহিদা কত দ্রুত বাড়ছে, তা আমদানির হিসাব দেখলেই স্পষ্ট হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩ সালে দেশে কফি আমদানি হয়েছিল ১৩৯ টন এবং ২০১২ সালে ২৬৪ টন। একক বছর হিসেবে ২০২৫ সালে তা পৌঁছেছে ১ হাজার ৭৪৫ টনে। অর্থাৎ ২০১২ সাল থেকে হিসাব করলেও গত ১৩ বছরে কফি আমদানি বেড়েছে ছয় গুণের বেশি।
ডিএইর পর্যালোচনা বলছে, গত এক দশকে চায়ের বাজার যেখানে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৫ শতাংশ হারে বেড়েছে, সেখানে কফির বাজার বেড়েছে গড়ে ৫৬ শতাংশ হারে।
মাঝখানে ২০২৩–২৪ অর্থবছরে আমদানিতে কিছুটা ভাটা পড়েছিল। বিশ্ববাজারে কফির বিনের দাম ৩০ শতাংশ বেড়ে যাওয়া এবং দেশে আমদানি পর্যায়ে শুল্কহার বাড়ার কারণে ওই অর্থবছরে আমদানি কমে ১ হাজার ৪৩৯ টনে হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যমতে, এটি আগের ২০২২–২৩ অর্থবছরের চেয়ে ১৭ শতাংশ কম। তবে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দেশীয় উৎপাদনে নজর দেওয়ার কারণে আমদানি সাময়িক কমলেও একে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৪০টি দেশ থেকে বাংলাদেশে কফি আসে। এর মধ্যে ৮৮ শতাংশই আসে ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ব্রাজিল ও ভিয়েতনাম থেকে। সবচেয়ে বেশি কফি আসে ব্রাজিল থেকে।
বাজারের চেহারায় বদল
এ শতাব্দীর প্রথম দশকেও কফির বাজার তেমন বড় ছিল না। পরের দশক থেকে মূলত চাহিদা আকাশচুম্বী হতে থাকে। ১৯৯৮ সালে নেসলে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে কফি বাজারজাত শুরু করে। ২০০৩ সালে ইনস্ট্যান্ট কফির বাজারের ৬৭ শতাংশই ছিল নেসলের দখলে।
গত এক দশকে ইনস্ট্যান্ট কফির পাশাপাশি বাজারে বৈচিত্র্য এসেছে। শিল্পোদ্যোক্তারা নতুন আউটলেট স্থাপনে বিপুল বিনিয়োগ করেছেন। এর মধ্যে নর্থ এন্ড, গ্লোরিয়া জিনস, ক্রিমসন কাপ, বারিস্তা, বাতেল ও সেগাফ্রেডো উল্লেখযোগ্য। বড় শিল্পের পাশাপাশি ছোট উদ্যোক্তারাও শপিং মলের কোণে ক্যাফে খুলছেন, যেখানে সব সময় ভিড় করছেন কফিপ্রেমীরা।
ডিএইর তথ্য বলছে, নেসলের পর বাজারে যোগ দেয় দেশের বড় কয়েকটি শিল্প গ্রুপ। বর্তমানে আবুল খায়ের, প্রাণ–আরএফএল, বেক্সিমকো, মেঘনা গ্রুপসহ ২৫০টির বেশি কোম্পানি কফি আমদানি ও বাজারজাত করছে। অন্য ব্র্যান্ডে ম্যাককফি, কফিকো ও তোরাবিকার মতো ব্র্যান্ডগুলোও বাজারে নিজেদের জায়গা ধরে রেখেছে।
উৎপাদনের হালচাল ও সুরক্ষা
আমদানিনির্ভর এই বাজারের পাশেই নিঃশব্দে বেড়ে উঠছে দেশীয় উৎপাদন। দেশে কফি উৎপাদনের শুরুটা পাহাড়ে হলেও এখন তা কেবল সেখানেই আটকে নেই। পার্বত্য তিন জেলার পাশাপাশি টাঙ্গাইল, রংপুর ও নীলফামারীতেও বাণিজ্যিকভাবে কফি চাষ শুরু হয়েছে। ডিএইর কর্মকর্তারা জানান, বাজার ভালো হওয়ায় কৃষকেরা কফি চাষে আগ্রহী হচ্ছেন এবং প্রতিবছর চাষের পরিধি বাড়ছে।
দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও এই যাত্রায় শামিল হয়েছে। আবুল খায়ের গ্রুপ পার্বত্য অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে কফি চাষ করছে। নর্থ এন্ড প্রায় এক দশক ধরে পাহাড়ের কৃষকদের সহায়তা করে আসছে এবং নিজেদের ক্যাফেতে ‘হিল ট্র্যাক্ট ব্র্যান্ড’ নামে পাহাড়ের কফি বাজারজাত করছে।
এই নতুন খাতকে টিকিয়ে রাখতে দেশীয় কফি উৎপাদকদের সুরক্ষা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ও কাপনা টি কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কামরান তানভিরুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে এখন কফি হচ্ছে। উৎপাদকদের উৎসাহিত করার জন্য তাঁদের সুরক্ষা বা প্রটেকশন দেওয়া দরকার। এ জন্য আমদানিতে শুল্ক না কমিয়ে বাড়তি রাখা দরকার।’
বর্তমানে ২ দশমিক ৫ কেজি পর্যন্ত প্যাকেটজাত কফি আমদানিতে শুল্ক ৯৬ দশমিক ১ শতাংশ এবং বাল্ক আমদানিতে ৬৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। ব্যবসায়ীদের মতে, দেশীয় প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলোকে উৎসাহিত করতে এবং নতুন বিনিয়োগ টানতে দেশীয় উৎপাদকদের জন্য এই সুরক্ষা বা শুল্কের সুবিধা বজায় রাখা অপরিহার্য।