আন্তর্জাতিক কফি দিবস: আপনিও কি 'কফি হাউস' গানের রমা, সুজাতা, মঈদুল, নিখিলেশ আর অমলের সঙ্গে নিজের মিল খুঁজছেন?
· Prothom Alo

রমা, সুজাতা, মঈদুল, নিখিলেশ আর অমল। নামগুলো জড়িয়ে আছে মান্না দের কালজয়ী গান ‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’ এর পরতে পরতে। আর সামাজিক মাধ্যমে নতুন করে ট্রেন্ডে আসার পর এই চরিত্রগুলোর সঙ্গে আমরা অনেকেই নিজেদের মিল খুঁজছি।
Visit sportfeeds.autos for more information.
আজ ১ অক্টোবর পালিত হলো আন্তর্জাতিক কফি দিবস। কফি নিয়ে কত কথাই তো হচ্ছে আজ। কফি এখন বাঙালির জীবনের সঙ্গে চায়ের মতোই জড়িয়ে গিয়েছে। সেইসঙ্গে হালের ট্রেন্ডে এখন ক্যাফে কালচার। অথচ কফি নিয়ে বাংলায় তেমন কোনো গান বা কবিতা নেই। ঘুরে ফিরে সেই ৪৬ বছর আগে মান্না দে-র গাওয়া একটি গানই বারবার মনে পড়ে এক্ষেত্রে। আর সেই সঙ্গে চোখে ভেসে ওঠে কলকাতার কফি হাউস, রমা, সুজাতা, মঈদুল, নিখিলেশ আর অমল। সেই সঙ্গে কবরে চলে যাওয়া গোয়ানিস গিটারিস্ট ডিসুজা। তাকে না হয় আর না টেনে আনি এখানে।
নামগুলো জড়িয়ে আছে মান্না দে-র কালজয়ী গান ‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’ এর পরতে পরতেনামগুলো জড়িয়ে আছে মান্না দে-র কালজয়ী গান ‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’ এর পরতে পরতে। গানটি শুধু একটি স্মৃতিময় ও প্রিয় আড্ডার গল্প নয়; এটি বন্ধুত্ব, প্রেম, স্বপ্নভঙ্গ, সময়ের পরিবর্তন আর হারিয়ে যাওয়া দিনের এক আবেগময় স্মৃতিচারণ। সামাজিক মাধ্যমে এই গান ও এর চরিত্রগুলো নিয়ে নতুন করে অনেক বেশি আলোচনা হচ্ছে এখন। আর অ্যালগরিদমের পাশাপাশি এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। গানটির কথায় এমন এক জীবনবোধ আছে, যার সঙ্গে কয়েক প্রজন্মের মানুষ নিজেদের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে নিতে পারে। আর তাই তো এই টাইমলেস চরিত্রগুলো নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা লুফে নিয়েছে লাখো মানুষ।
গানটি আসলে এক প্রজন্মের স্মৃতিকথা
১৯৮০ সালে মুক্তি পাওয়া ‘কফি হাউস’ গানটির গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, সুরকার সুপর্ণকান্তি ঘোষ এবং শিল্পী মান্না দে। গানটি কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের ঐতিহাসিক ইন্ডিয়ান কফি হাউসের আড্ডাকে কেন্দ্র করে লেখা।
গানটি কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের ঐতিহাসিক ইন্ডিয়ান কফি হাউসের আড্ডাকে কেন্দ্র করে লেখাগানের শুরুতেই সেই পুরোনো আড্ডার কথা মনে করিয়ে দেওয়া হয়। একসময় যেখানে বন্ধুরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাতেন, সেখানে এখন আর আগের মতো জমায়েত হয় না। জীবনের নানা পথে ছড়িয়ে পড়েছেন বন্ধুরা। কারও জীবন বদলে গেছে, কারও স্বপ্ন ভেঙেছে, কেউ আবার হারিয়ে গেছেন চিরতরে।
রমা, সুজাতা, মঈদুল, নিখিলেশ ও অমল কারা?
গানের এই চরিত্রগুলো যেন আমাদের চেনা জীবনেরই মানুষ। প্রত্যেকের জীবন আলাদা, প্রত্যেকের গল্পও আলাদা।
রমা ও সুজাতা: গানের দুই নারী চরিত্র। তাঁদের ঘিরে প্রেম, সম্পর্ক ও স্মৃতির প্রসঙ্গ এসেছে।
মঈদুল: তার পরিণতি গানের বিষণ্নতাকে আরও গভীর করে।
নিখিলেশ: বন্ধুমহলের এমন একজন, যাঁর জীবনের পরিবর্তন পুরোনো দিনের সঙ্গে বর্তমানের দূরত্ব তুলে ধরে।
অমল: এই আড্ডার আরেক পরিচিত মুখ। তাঁর জীবনও সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে। হেনেছে অসুস্থতার আঘাত।
তবে মনে রাখতে হবে, গানটির চরিত্রগুলোর প্রত্যেকের জন্য আলাদা, পূর্ণাঙ্গ জীবনী দেওয়া হয়নি। তাঁদের নিয়ে শ্রোতাদের নানা ব্যাখ্যা ও কল্পনা তৈরি হয়েছে।
কফি হাউসের গানটি অনেকের নিজেদের স্মৃতি ও আবেগের সঙ্গে মিলে যায়সামাজিক মাধ্যমে এত আলোচনা কেন?
প্রথমত, পুরোনো দিনের নস্টালজিয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই তাঁদের স্কুল-কলেজের বন্ধু, হারিয়ে যাওয়া আড্ডা কিংবা পুরোনো প্রেমের স্মৃতি ভাগ করে নেন। কফি হাউসের গানটি সেই আবেগের সঙ্গে মিলে যায়।
দ্বিতীয়ত, বন্ধুত্বের বদলে যাওয়া সমীকরণ। একসময় যাঁদের ছাড়া দিন কাটত না, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের অনেকের সঙ্গেই যোগাযোগ কমে যায়। কেউ চাকরির জন্য অন্য শহরে চলে যান, কেউ সংসার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। গানটি সেই বাস্তবতাকে সামনে আনে।
তৃতীয়ত, চরিত্রগুলোর পরিণতি নিয়ে কৌতূহল। রমা, সুজাতা, মঈদুল, নিখিলেশ ও অমলের জীবনে শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছিল, তা নিয়ে শ্রোতাদের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে গানটির ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ ও স্মৃতিচারণে এই কৌতূহল নতুন করে সামনে আসে।
চতুর্থত, সময়ের সঙ্গে গানের প্রাসঙ্গিকতা। গানটি কয়েক দশক আগে তৈরি হলেও এর মূল বিষয়গুলো, বন্ধুত্ব, প্রেম, বিচ্ছেদ, বার্ধক্য ও হারিয়ে যাওয়া সময়, আজও মানুষের জীবনের সঙ্গে মিলে যায়।
গানটির সবচেয়ে বড় শক্তি কোথায়?
‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’ গানটির বিশেষত্ব হলো, এটি কেবল কয়েকজন বন্ধুর গল্প বলে না। বরং শ্রোতাকে নিজের জীবনের দিকে ফিরে তাকাতে বাধ্য করে। গানটি শুনতে শুনতে কেউ হয়তো মনে করেন সেই বন্ধুটির কথা, যার সঙ্গে বহু বছর দেখা হয়নি।
কফি হাউস নিয়ে লেখা গানটি গানটি বারবার ফিরে আসেকেউ মনে করেন কলেজজীবনের প্রেমের কথা। আবার কেউ ভাবেন, সময়ের সঙ্গে কীভাবে বদলে গেছে নিজের জীবনও। এই কারণেই গানটি বারবার ফিরে আসে।
আপনি কি রমা নাকি সুজাতা?
এই গানের দুটি অন্যতম ট্র্যাজিক ও রহস্যময় চরিত্র হওয়ার কারণে রমা রায় এবং সুজাতা নিয়ে শ্রোতাদের মাঝে এত আলোচনা ও কৌতূহল। ভালোবাসার আবেগে ভেসে যাওয়া আর জীবনের হিসেব বুঝে পা ফেলা এই দুই নারী চরিত্রের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে পোস্ট দিচ্ছেন অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে। গানের লিরিক্সে এই দুই নারীর নিয়তি সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর, যা বাঙালি শ্রোতাদের আবেগ ও নস্টালজিয়াকে গভীরভাবে স্পর্শ করে।
গানে রমার পরিণতি সবচেয়ে বেদনাদায়কনিয়তির চরম বৈপরীত্য
গানে এই দুই চরিত্রের পরিণতি যেভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, তা যেকোনো সাধারণ আড্ডার বন্ধুদের বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি:
রমা রায়: গানে রমার পরিণতি সবচেয়ে বেদনাদায়ক। 'কাকে যেন ভালোবেসে আঘাত পেয়ে যে শেষে, পাগলা গারদে আছে রমা রায়...' ভালোবাসায় ধোঁকা বা আঘাত পেয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে রমার মানসিক হাসপাতালে ঠাঁই হওয়ার এই গল্পটি শ্রোতাদের মনকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়।
সুজাতা: রমার ঠিক বিপরীতে সুজাতার অবস্থান। সে জীবনে জাগতিকভাবে সফল। "সুজাতাই আজ শুধু সবচেয়ে সুখে আছে শুনেছি তো লাখপতি স্বামী তার..." গাড়ি, বাড়ি, হীরা-জহরতে মোড়ানো সুজাতার এই জাঁকজমকপূর্ণ জীবন সাধারণ মানুষের মনে এমন অনুভূতি তৈরি করে যে আড্ডার সেই সাধারণ মেয়েটি আজ কতটা বদলে গেছে।
রমার ঠিক বিপরীতে সুজাতার অবস্থানবাস্তব চরিত্রের সন্ধান ও রহস্য
দীর্ঘদিন ধরে শ্রোতাদের মনে প্রশ্ন ছিল, বাস্তবে কি রমা বা সুজাতা নামে কেউ ছিলেন? গানটির সুরকার সুপর্ণকান্তি ঘোষ এবং গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, গানের সব চরিত্রই সম্পূর্ণ কাল্পনিক এবং কেবলই লেখকের কল্পনাপ্রসূত।
তা সত্ত্বেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই বিভিন্ন দাবি ওঠে। যেমন গাইবান্ধার সন্তান ও কলকাতা আর্ট কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী সুজাতা রানী দাশ (যিনি পরবর্তী সময়ে মুক্তিযোদ্ধা ওয়ালিউর রহমান রেজাকে বিয়ে করে ঢাকার মোহাম্মদপুরে বসবাস শুরু করেন) নিজেকে এই গানের সুজাতা বলে দাবি করেছিলেন। যদিও গানটির স্রষ্টারা একে একটি নিখাদ গল্প বা রূপক হিসেবেই বর্ণনা করেছেন, তবুও এই বাস্তব বনাম কল্পনার বিতর্ক চরিত্র দুটিকে নিয়ে আলোচনা সব সময় জিইয়ে রাখে।
অমল, নিখিলেশ আর মঈদুলের তিন ধরনের জীবনদর্শনের কন্ট্রাস্ট
এদিকে, অমল, নিখিলেশ আর মঈদুল ‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’ গানের আলোচিত তিন পুরুষ চরিত্র। তাঁদের জীবনের গল্প আসলে তিন ধরনের জীবনদর্শনের কন্ট্রাস্ট। একজন সাফল্য ও প্রতিষ্ঠার প্রতীক, একজন আদর্শ ও রাজনীতির পথে হাঁটা মানুষ, আরেকজন জীবনের অনিশ্চয়তা ও বিচ্ছেদের প্রতীক।
গানে নিখিলেশকে দেখা যায় প্রতিষ্ঠিত ও সফল মানুষ হিসেবে। সে বিদেশে, কানাডায়নিখিলেশ: সাফল্যের আড়ালে একাকিত্ব
গানে নিখিলেশকে দেখা যায় প্রতিষ্ঠিত ও সফল মানুষ হিসেবে। সে বিদেশে, কানাডায়। তার জীবন অর্থনৈতিকভাবে সফল, কিন্তু সেই সাফল্য তাকে পুরোনো বন্ধুদের আড্ডা থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। একসময় যে মানুষটি বন্ধুদের সঙ্গে কফি হাউসে বসত, সময়ের সঙ্গে সে হয়ে গেছে দূরদেশের মানুষ। তাঁর জীবনের কন্ট্রাস্টটা এখানেই, জীবনে প্রতিষ্ঠা এসেছে, কিন্তু পুরোনো আড্ডা হারিয়ে গেছে। অর্থাৎ সাফল্য সব সময় পুরোনো সম্পর্ক বা স্মৃতি ফিরিয়ে দেয় না।
অমল: আদর্শের জন্য অন্য পথ
অমলের জীবন সম্পূর্ণ বিপরীত। সে প্রতিষ্ঠা বা অর্থের পেছনে ছোটেনি। গানে তার সঙ্গে রাজনীতি ও আদর্শের প্রসঙ্গ জড়িয়ে আছে। তার জীবন দেখায়, তরুণ বয়সের স্বপ্ন ও আদর্শ অনেক সময় মানুষকে নিরাপদ, স্বচ্ছন্দ জীবনের পথ থেকে দূরে নিয়ে যায়।
অমলের জীবন সম্পূর্ণ বিপরীতনিখিলেশ যেখানে বিদেশে গিয়ে নিজের জীবন গড়েছে, অমল সেখানে অন্য এক বিশ্বাসের পথে চলে গেছে। ফলে দুজনের জীবনপথ আলাদা হলেও পরিণতিতে দুজনেই সেই পুরোনো আড্ডা থেকে দূরে। কিন্তু অমলের কর্কট রোগে ক্ষয়ে যাওয়াটা আসলেই মানতে ইচ্ছা করে না।
মঈদুল: বেদনাময় পরিণতি
মঈদুলের গল্পটি আরও করুণ। গানটিতে তার রাজনৈতিক পরিচয় ও সংগ্রামের ইঙ্গিত আছে। কিন্তু তার জীবনের পরিণতি অন্যদের মতো নয়। সে আর ফিরে আসতে পারে না পুরোনো আড্ডায়। এখানেই মঈদুল অমল ও নিখিলেশের জীবন থেকে সবচেয়ে আলাদা। অমল দূরত্ব তৈরি করেছে জীবনের সাফল্যের কারণে, নিখিলেশ নিজের আদর্শের পথে চলে গেছে; আর মঈদুলের ক্ষেত্রে সময় ও জীবনই যেন তাকে আড্ডার বাইরে ঠেলে দিয়েছে।
গানটিতে মঈদুলের রাজনৈতিক পরিচয় ও সংগ্রামের ইঙ্গিত আছেতবু তিনজনের মধ্যে একটি মিল আছে, তাঁরা কেউই আর আগের সেই কফি হাউসের আড্ডায় ফিরতে পারেন না। এই জায়গাতেই গানটির আসল বেদনা। কফি হাউসটি যেন একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু মানুষগুলো বদলে যায়। কেউ দেশ ছাড়ে, কেউ আদর্শের পথে যায়, কেউ হারিয়ে যায়। অথচ পুরোনো বন্ধুত্বের স্মৃতি থেকে যায়।
তাই এই গানের রমা, সুজাতা, অমল, নিখিলেশ আর মঈদুল শুধু ৫টি চরিত্র নয়; তারা জীবনের পাঁচটি ভিন্ন পরিণতির প্রতীক। আর তাদের কাহিনীর কন্ট্রাস্টই গানটিকে নিছক নস্টালজিয়ার গান না করে সময়, বন্ধুত্ব ও জীবনের পরিবর্তনের এক অসাধারণ দলিল করে তুলেছে।
ছবি: এআই ও ইন্সটাগ্রাম