এত সংকটে সরকারি ১৬ মেডিকেল কলেজ, তবু আসছে আরও
· Prothom Alo
হবিগঞ্জ ২৫০ শয্যার সদর হাসপাতালটির অবস্থান শহরের প্রায় কেন্দ্রস্থলে। এই হাসপাতালের ভেতরেই হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজ। সরকারি কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৬ সালে। ১০ বছর পরও কলেজের নিজস্ব জমির বন্দোবস্ত হয়নি। আটতলা হাসপাতাল ভবনের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও অষ্টম তলায় মেডিকেল কলেজ চলছে।
Visit casino-promo.biz for more information.
নিজস্ব জমি, ভবন ও ক্যাম্পাসের ব্যবস্থা না করেই হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৮ সালে। শিক্ষাদান চলে তিন হাজার বর্গফুট জায়গায়, পাঁচটি শ্রেণিকক্ষে। নেই প্রয়োজনীয় শিক্ষক, ব্যবহারিক শ্রেণিকক্ষ ও ল্যাবরেটরি। নেই শিক্ষার্থীদের আবাসনব্যবস্থা বা হোস্টেল।
মেডিকেল কলেজটির শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছে অসন্তুষ্টি। এমনই একজন শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করে প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রত্যেক মেডিকেল কলেজের নিজস্ব হাসপাতাল থাকে। আমাদের কলেজের তা নেই। আমাদের নির্ভর করতে হয় সদর হাসপাতালের ওপর। কিন্তু এই হাসপাতালে রেজিস্ট্রার না থাকায় আমাদের কাজের তদারক করার কেউ নেই।’ উল্লেখ্য, হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোতে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেন রেজিস্ট্রার।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ব্যক্তির ইচ্ছায়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা প্রতিটি জেলায় একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করার কথা বলেছিলেন। তাঁর ক্ষমতাচ্যুতির পর মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা বন্ধ হয়নি। বিভিন্ন সংকট দূর না করেই অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারও মেডিকেল কলেজের অনুমোদন দিয়েছে। বিএনপি সরকারও পুরোনো পথে হাঁটছে।স্থায়ী ক্যাম্পাস ৮ বছরেও হয়নি, শিক্ষক ও অবকাঠামোর সংকট
এই পরিস্থিতি শুধু একটি সরকারি মেডিকেল কলেজের নয়। দেশে মোট মেডিকেল কলেজ ১১০টি। এর মধ্যে সরকারি মেডিকেল কলেজ ৩৭টি। নিজস্ব জমি, অবকাঠামো ও শিক্ষকস্বল্পতা বা সংকটের মধ্যে আছে, এমন ১৬টি সরকারি মেডিকেল কলেজ ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করেছে প্রথম আলো। এসব কলেজ তুলনামূলকভাবে নতুন, প্রতিষ্ঠাকাল ২০০৮ থেকে ২০২০ সাল। আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর মাসে এসব মেডিকেল কলেজ ঘুরে দেখেছেন প্রথম আলোর প্রতিনিধিরা।
কলেজগুলোর মধ্যে আছে পাবনা, গোপালগঞ্জ, যশোর, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, জামালপুর, পটুয়াখালী, হবিগঞ্জ, নীলফামারী, নেত্রকোনা, নওগাঁ, মাগুরা, চাঁদপুর ও সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ।
প্রথম আলোর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কলেজগুলো বিপুল ঘাটতি নিয়ে চলছে। পাঁচটি কলেজের নিজস্ব জমি নেই, তাই ভবনও নেই। শিক্ষকের ঘাটতি সব কলেজেই, মাগুরা মেডিকেল কলেজের শিক্ষকের ৬২ শতাংশ পদ খালি। আবাসনের ব্যবস্থা না হওয়ায় পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজের ৬৭ জন ছাত্রী অব্যবহৃত একটি ভবনে থাকেন।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ব্যক্তির ইচ্ছায়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা প্রতিটি জেলায় একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করার কথা বলেছিলেন। তাঁর ক্ষমতাচ্যুতির পর মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা বন্ধ হয়নি। বিভিন্ন সংকট দূর না করেই অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারও মেডিকেল কলেজের অনুমোদন দিয়েছে। বিএনপি সরকারও পুরোনো পথে হাঁটছে।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সাজ্জাদুল হাসানের ইচ্ছায় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সমর্থনে নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৮ সালে। অথচ সরকারি এই কলেজের নামে কোনো জমি নেই। হাসপাতালটি নেত্রকোনায় কোথায় হবে, জমি কীভাবে পাওয়া যাবে—এসব ঠিক না করেই কলেজটি প্রশাসনিক ও একাডেমিক অনুমোদন পায়। কলেজটি প্রতিষ্ঠার আট বছর পরও নিজস্ব কোনো ভবন নেই, হাসপাতাল নেই। কোনো কলেজ ক্যাম্পাস নেই। অথচ এখান থেকে এমবিবিএস পাস করে চিকিৎসক হয়ে অনেকে পেশা চর্চা করছেন।
পরের বাড়িতে কলেজ
বেসরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করতে হয় আইন ও বিধি মেনে। তাতে নিজস্ব জমি, নিজস্ব ভবন এবং নিজস্ব হাসপাতাল থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু সরকারি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় কোনো আইন বা বিধি নেই। প্রভাবশালী ব্যক্তির ইচ্ছায় আর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সমর্থনে একের পর এক মেডিকেল কলেজ গড়ে উঠছে। প্রয়োজন আছে কি নেই, এমন মূল্যায়নের ভিত্তিতে মেডিকেল কলেজ হচ্ছে না।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সাজ্জাদুল হাসানের ইচ্ছায় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সমর্থনে নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৮ সালে। অথচ সরকারি এই কলেজের নামে কোনো জমি নেই। হাসপাতালটি নেত্রকোনায় কোথায় হবে, জমি কীভাবে পাওয়া যাবে—এসব ঠিক না করেই কলেজটি প্রশাসনিক ও একাডেমিক অনুমোদন পায়। কলেজটি প্রতিষ্ঠার আট বছর পরও নিজস্ব কোনো ভবন নেই, হাসপাতাল নেই। কোনো কলেজ ক্যাম্পাস নেই। অথচ এখান থেকে এমবিবিএস পাস করে চিকিৎসক হয়ে অনেকে পেশা চর্চা করছেন।
নেত্রকোনার ২৫০ শয্যার সদর হাসপাতালের উত্তর পাশে চিকিৎসকদের থাকার জন্য তৈরি করা চারটি ভবনকে একাডেমিক ভবন হিসেবে ব্যবহার করছে মেডিকেল কলেজটি। বাস্তবে বাড়ির মধ্যে মেডিকেল কলেজ। এ নিয়ে অসন্তোষ আছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। তাঁরা স্থায়ী ক্যাম্পাসের দাবিতে মানববন্ধনও করেছেন।
৩১ আগস্ট পাবনা মেডিকেল কলেজের একাধিক শিক্ষার্থী প্রথম আলোকে বলেন, ২০০৮ সালে কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হলেও কলেজের নিজস্ব হাসপাতাল এখনো নেই। কলেজ থেকে জেলা সদর হাসপাতালের দূরত্ব প্রায় আট কিলোমিটার। প্রতিদিন বাসে যেতে হয়। রাস্তায় খানাখন্দ। ২৪০ জন শিক্ষার্থীর জন্য বাস মাত্র একটি। কলেজ থেকে হাসপাতালে যাওয়া-আসা যন্ত্রণার মতো।
হবিগঞ্জ ও নেত্রকোনা ছাড়া একেবারে জায়গাজমিবিহীন আরও তিনটি মেডিকেল কলেজ আছে। এই তালিকায় আছে নওগাঁ, মাগুরা ও নীলফামারী মেডিকেল কলেজ। এসব কলেজের ক্লাস হচ্ছে জেলার সদর হাসপাতালে। চাঁদপুর মেডিকেল কলেজের জন্য জমি কেনার প্রক্রিয়া চলছে। কলেজটি সদর হাসপাতালের কয়েকটি কক্ষে চলছে।
বাকি ১০টি কলেজের জমি ও নিজস্ব কলেজ ভবন আছে। এগুলো হলো পাবনা, গোপালগঞ্জ, যশোর, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, জামালপুর, পটুয়াখালী ও সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ। তবে এর মধ্যে পাবনা, যশোর ও জামালপুর মেডিকেল কলেজের এখনো কোনো নিজস্ব হাসপাতাল নেই।
৩১ আগস্ট পাবনা মেডিকেল কলেজের একাধিক শিক্ষার্থী প্রথম আলোকে বলেন, ২০০৮ সালে কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হলেও কলেজের নিজস্ব হাসপাতাল এখনো নেই। কলেজ থেকে জেলা সদর হাসপাতালের দূরত্ব প্রায় আট কিলোমিটার। প্রতিদিন বাসে যেতে হয়। রাস্তায় খানাখন্দ। ২৪০ জন শিক্ষার্থীর জন্য বাস মাত্র একটি। কলেজ থেকে হাসপাতালে যাওয়া-আসা যন্ত্রণার মতো।
দেখা গেছে, ১৬টি মেডিকেল কলেজই শিক্ষকসংকটের মধ্যে আছে। সবচেয়ে বেশি সংকট মাগুরা মেডিকেল কলেজে। এই কলেজে শিক্ষকের পদ আছে ৮৪টি, কাজ করছেন ৩২ জন। ৫২টি শিক্ষকের পদ শূন্য। অর্থাৎ ৬২ শতাংশ শিক্ষকের পদ খালি রেখে কলেজটিতে শিক্ষাদান চলছে। শ্রেণিকক্ষে কারা পড়াচ্ছেন, কীভাবে কোর্স শেষ করা হচ্ছে, হাতে-কলমে কারা শেখাচ্ছেন, কারা পরীক্ষা নিচ্ছেন—এসব স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দেখছে না।
নেই শিক্ষক
মেডিকেল কলেজে শ্রেণিকক্ষে পড়া বা পড়ানো এবং হাতে-কলমে শেখা বা শেখানো সমান গুরুত্বপূর্ণ। দুটোর জন্যই প্রয়োজন পর্যাপ্তসংখ্যক শিক্ষক। ছোট-বড় নিয়মিতভাবে নানা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয় মেডিকেল শিক্ষার্থীদের। এর জন্য দরকার শিক্ষকদের নিবিড় তদারকি। শিক্ষক কম থাকলে জানাবোঝা এবং হাতে-কলমে শেখায় কমতি থাকে। তদারকি ঠিকমতো হয় না।
দেখা গেছে, ১৬টি মেডিকেল কলেজই শিক্ষকসংকটের মধ্যে আছে। সবচেয়ে বেশি সংকট মাগুরা মেডিকেল কলেজে। এই কলেজে শিক্ষকের পদ আছে ৮৪টি, কাজ করছেন ৩২ জন। ৫২টি শিক্ষকের পদ শূন্য। অর্থাৎ ৬২ শতাংশ শিক্ষকের পদ খালি রেখে কলেজটিতে শিক্ষাদান চলছে। শ্রেণিকক্ষে কারা পড়াচ্ছেন, কীভাবে কোর্স শেষ করা হচ্ছে, হাতে-কলমে কারা শেখাচ্ছেন, কারা পরীক্ষা নিচ্ছেন—এসব স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দেখছে না।
সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজে শিক্ষকের পদ ৯৪টি, কাজ করছেন ৫২ জন। ৪৫ শতাংশ পদ খালি। সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজে পদ ১০৩টি, ৩৯ শতাংশ পদ খালি। বাকি ১৩টি মেডিকেল কলেজেরও পরিস্থিতি ভালো বলার কোনো সুযোগ নেই।
পাবনা মেডিকেল কলেজের দুজন ছাত্রী প্রথম আলোকে বলেন, ভর্তি হওয়ার আগে তাঁদের কোনো ধারণা ছিল না যে সরকারি মেডিকেল কলেজে এত সমস্যা। ক্লাস নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত শিক্ষকই নেই। তাঁরা বলেন, তাঁদের ‘আইটেম’ ও ‘কার্ড’ পরীক্ষা যেনতেনভাবে শেষ হয়।
যেকোনো ছোট একটি বিষয় (যেমন হাতের একটি আঙুল অথবা হাতের তালু) পড়ানোর পর সেগুলোর ওপর নেওয়া পরীক্ষা হচ্ছে ‘আইটেম’ পরীক্ষা। ছোট ছোট অনেক বিষয়ে পড়ানোর পর অনেক আইটেম পরীক্ষা শেষে সমগ্র বিষয় নিয়ে ‘কার্ড’ পরীক্ষা হয় (যেমন পুরো হাত)। মেডিকেল শিক্ষায় বছরজুড়ে আইটেম আর কার্ড পরীক্ষা চলতে থাকে।
একটি আন্তর্জাতিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত একজন গবেষক নাম প্রকাশ না করে প্রথম আলোকে বলেন, বাস্তবে আইটেম ও কার্ড পরীক্ষা ঠিকঠাক হচ্ছে না। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের যাওয়ার ব্যবস্থা করেনি রাষ্ট্র। এটি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ফাঁকিবাজি।
মৌলিক বিষয়ের শিক্ষকসংকট
মেডিকেল শিক্ষায় আটটি বিষয়কে মৌলিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিষয়গুলো হচ্ছে অ্যানাটমি, বায়োকেমিস্ট্রি, কমিউনিটি মেডিসিন, ফরেনসিক মেডিসিন, মাইক্রোবায়োলজি, প্যাথলজি, ফার্মাকোলজি ও ফিজিওলজি। আটটি বিষয়ে শিক্ষকের তীব্র সংকট এই ১৬টি মেডিকেল কলেজে।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই ১৬ মেডিকেল কলেজে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপকের পদ আছে ২৭২টি। কাজ করছেন ১০০ জন। অর্থাৎ মৌলিক বিষয়ে ১৭২টি বা ৬৩ শতাংশ পদ খালি।
সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি নওগাঁ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এই কলেজে মৌলিক বিষয়গুলোতে অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপকের পদ আছে ১৪টি। সব পদ খালি। এরপর খারাপ অবস্থা মাগুরা মেডিকেল কলেজের। এই কলেজে পদ আছে ১৪টি, খালি ১৩টি। সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজে ১৪টি পদের ১২টি এবং হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের ১৪টি পদের ১১টি খালি।
পাবনা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ২০০৮ সালে। এখনো কলেজটিতে মৌলিক বিষয়ের শিক্ষকসংকট কাটেনি। মৌলিক বিষয়ের শিক্ষকের ৫০ শতাংশ পদ খালি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দায়িত্ব পায় অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। সংস্কার করা বা সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়াই ছিল ওই সরকারের মূল কাজ। তবে অন্য অনেক খাতের মতো অন্তর্বর্তী সরকার মেডিকেল শিক্ষার কোনো সংস্কার করে যেতে পারেনি।
পাবনা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. রুহুল কুদ্দুস প্রথম আলোকে বলেন, কলেজটির বয়স ১৮ বছর হলেও আটটি মৌলিক বিষয়ের শিক্ষকসংকট আছে। বায়োকেমিস্ট্রিতে ২০১৬ সাল থেকে শিক্ষক মাত্র একজন, তিনি নিজে। গাইনিতে কোনো শিক্ষকই নেই।
যেসব মেডিকেল কলেজে আট বিষয়ে একজনও শিক্ষক নেই, অথবা সাত বিষয়ে একজনও শিক্ষক নেই, সেখানে কোন শিক্ষকেরা পড়ান? এই বিষয়গুলোর টিউটোরিয়াল ক্লাস ও পরীক্ষা কীভাবে হয়? এই প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক নাজমুল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, এটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা, তবে কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যেমন অবসরে যাওয়া শিক্ষকদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, প্রণোদনার পরিমাণ বেতনের ১০০ শতাংশ করা, মৌলিক বিষয়ে পড়তে চাওয়া শিক্ষার্থীদের মাসে ২০ হাজার টাকা বৃত্তি দেওয়া। এ ছাড়া এসব বিষয়ে একই শিক্ষকের একাধিক মেডিকেলে পড়ানো ও অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার ব্যাপারেও সক্রিয়ভাবে ভাবা হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নরসিংদী মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হলেও মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক অনুমোদন পায় বিএনপি সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর। কিন্তু এই কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য জমি এখনো ঠিক হয়নি। আপাতত ১০০ শয্যাবিশিষ্ট নরসিংদী জেলা হাসপাতালে নরসিংদী মেডিকেল কলেজের কাজ শুরু হবে বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
অন্তর্বর্তী অব্যবস্থা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দায়িত্ব পায় অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। সংস্কার করা বা সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়াই ছিল ওই সরকারের মূল কাজ। তবে অন্য অনেক খাতের মতো অন্তর্বর্তী সরকার মেডিকেল শিক্ষার কোনো সংস্কার করে যেতে পারেনি।
অন্তর্বর্তী সরকার যেসব মেডিকেল কলেজের জমি নেই, অন্যের জায়গায় থেকে চলে, তাদের জমির ব্যবস্থা করেনি। যেসব মেডিকেল কলেজে শিক্ষকসংকট চরমে, সেসব কলেজে শিক্ষক পদায়নের উদ্যোগ নেয়নি; বরং তারা নতুন নতুন সরকারি মেডিকেল কলেজের অনুমোদন দেওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিল।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বরাষ্ট্র ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর জেলা মুন্সিগঞ্জে একটি সরকারি মেডিকেল কলেজের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। নথিপত্রে দেখা যায়, এই মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানের সুপারিশ ছিল। তবে এই কলেজের উদ্যোগ এখন পুরোপুরি থেমে গেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে একটি মেডিকেল কলেজ করার অনুমোদন দেওয়া হয়। এই কলেজ চট্টগ্রামের বিমানবন্দর সড়কে হাসপাতাল গেট এলাকায়।
এ ছাড়া নরসিংদীতে একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক কাজ শুরু হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা এলাকা ঘুরে এসে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার পক্ষে মতামত দেন।
জমি, হাসপাতাল বা শিক্ষক থাকুক না থাকুক, বিএনপি সরকার আরও সরকারি মেডিকেল কলেজ করতে চায়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ভোলা ও জয়পুরহাটে দুটি মেডিকেল কলেজ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এই দুটি জেলা ঘুরে এসেছেন।
বিএনপি একই পথে হাঁটছে
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নরসিংদী মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হলেও মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক অনুমোদন পায় বিএনপি সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর। কিন্তু এই কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য জমি এখনো ঠিক হয়নি। আপাতত ১০০ শয্যাবিশিষ্ট নরসিংদী জেলা হাসপাতালে নরসিংদী মেডিকেল কলেজের কাজ শুরু হবে বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
সাধারণত যেকোনো মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য কমপক্ষে ২৫০ শয্যার একটি হাসপাতাল থাকার প্রয়োজন হয়; কিন্তু নরসিংদীতে তেমন কোনো হাসপাতাল নেই। ১০০ শয্যার যে হাসপাতাল আছে, তারই জনবল ঠিকমতো নেই। সেই হাসপাতালকেই ২৫০ শয্যার হাসপাতালে উন্নীত করার কাজ চলছে।
বিএনপি সরকার গঠন করার পরপরই ঠাকুরগাঁও মেডিকেল কলেজের অনুমোদন দেওয়া হয়। এই কলেজের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) চূড়ান্ত হওয়ার পথে। ঠাকুরগাঁও শহর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে ঠাকুরগাঁও-দিনাজপুর মহাসড়কের পাশে এই কলেজ হবে। ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে ঠাকুরগাঁও ও নরসিংদী মেডিকেল কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তি করার উদ্যোগ আছে।
আবু জামিল ফয়সাল, জনস্বাস্থ্যবিদঅধিকাংশ মেডিকেল কলেজ হয়েছে রাজনৈতিক কারণে। প্রতিষ্ঠার পর অনেক বছর পার হলেও অনেকগুলো পরিপূর্ণ মেডিকেল কলেজের রূপ নেয়নি। এসব কলেজের পক্ষে মান বজায় রেখে মেডিকেল শিক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়, মানসম্পন্ন চিকিৎসক তৈরি করাও সম্ভব নয়।জমি, হাসপাতাল বা শিক্ষক থাকুক না থাকুক, বিএনপি সরকার আরও সরকারি মেডিকেল কলেজ করতে চায়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ভোলা ও জয়পুরহাটে দুটি মেডিকেল কলেজ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এই দুটি জেলা ঘুরে এসেছেন।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক নাজমুল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা মোট ১২টি জেলা থেকে আবেদন পেয়েছি।’ নতুন মেডিকেল প্রতিষ্ঠার বিষয়ে মূল্যায়নের জন্য স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীকে প্রধান করে সাত সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় ২০৪১ সাল পর্যন্ত মেডিকেল শিক্ষায় ২৫টি বিষয়ে কী পরিমাণ জনবল লাগবে, তা নিয়ে চাহিদা বা প্রয়োজন নিরূপণের কাজ হচ্ছে। অক্টোবরের মধ্যে রিপোর্ট হাতে আসবে। রিপোর্টের ভিত্তিতে ওই কমিটি মেডিকেল কলেজের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। তবে ঠাকুরগাঁও ও নরসিংদীর পর আর নতুন কোনো সরকারি মেডিকেল কলেজের অনুমোদন সরকার আপাতত দিচ্ছে না।’
মানসম্পন্ন চিকিৎসক তৈরি করা সম্ভব কি
দেশে প্রথম মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৬ সালে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ। স্বাধীনতার আগে মেডিকেল কলেজ ছিল সাতটি। সব কটিই সরকারি। স্বাধীনতার পর সরকারি-বেসরকারি আরও ১০৩টি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বর্তমানে এর মধ্যে সরকারি মেডিকেল কলেজ ৩৭টি, সশস্ত্র বাহিনীর অধীনে ৭টি (একটি আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজ, ৫টি আর্মি মেডিকেল কলেজ ও ১টি নৌবাহিনী মেডিকেল কলেজ)। বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ৬৬টি। এই ১১০টি মেডিকেল কলেজের অধিকাংশের অবকাঠামোসংকট, প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষকের ঘাটতি ও শিক্ষাসামগ্রীর স্বল্পতা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে আপস না করলে অনেক মেডিকেল কলেজ চালু থাকার কথা নয়।
আবু জামিল ফয়সাল ১৯৭৬ সালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন। পাস করার পর সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। সরকারি চাকরি ছেড়ে বেসরকারি খাতে যোগ দিয়ে দীর্ঘ সময় গবেষণার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এই জনস্বাস্থ্যবিদ প্রথম আলোকে বলেন, অধিকাংশ মেডিকেল কলেজ হয়েছে রাজনৈতিক কারণে। প্রতিষ্ঠার পর অনেক বছর পার হলেও অনেকগুলো পরিপূর্ণ মেডিকেল কলেজের রূপ নেয়নি। এসব কলেজের পক্ষে মান বজায় রেখে মেডিকেল শিক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়, মানসম্পন্ন চিকিৎসক তৈরি করাও সম্ভব নয়। এ কথা তো ঠিক যে দেশে চিকিৎসার মান নিয়ে জনমনে গভীর অসন্তোষ রয়েছে। এই অসন্তোষের পেছনে রয়েছে এই কলেজগুলো।
[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, কুষ্টিয়া, টাঙ্গাইল, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ; যশোর অফিস এবং প্রতিনিধি, সাতক্ষীরা, গোপালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, পটুয়াখালী, জামালপুর, চাঁদপুর, নেত্রকোনা, মাগুরা, নীলফামারী, পাবনা ও নওগাঁ]