‘মহি সীমান্ত’ প্রজাপতির খোঁজে মাধবকুণ্ডে
· Prothom Alo
পতঙ্গটিকে খুঁজছি এক যুগের বেশি সময় ধরে। ওর খোঁজে কোথায় না গেছি—লাউয়াছড়া, সাতছড়ি, রেমা-কালেঙ্গা, আদমপুর, কাপ্তাই, হাজারিখিল; আরও কত জায়গায়। কিন্তু দেখা পাইনি কোথাও। ডিসেম্বর ২০২৩-এর মাঝামাঝি ছয়জনের টিমে মৌলভীবাজারের বিভিন্ন স্থানে পাখি-প্রাণী-প্রজাপতি খুঁজতে গেলাম। ১৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় বড়লেখার মাধবকুণ্ডে এলাম। রাতটা জেলা পরিষদের ডাকবাংলোয় কাটিয়ে সকালে মাধবকুণ্ড ঝরনায় ঢুকলাম সাদাটুপি লালগির্দির ছবি তুলতে। সকাল থেকেই ঘন কুয়াশা। তাই পাখিটির ছবি তুলে রোদ ওঠার অপেক্ষায় থাকলাম। একদিকে ঢাকা ফেরার তাড়া, অন্যদিকে পতঙ্গটিকে দেখার ইচ্ছে, কী যে করি?
Visit mwafrika.life for more information.
শেষমেশ কুয়াশার চাদর ভেদ করে সাড়ে এগারোটায় সূর্য মামা উঁকি দিলেন। সূর্যের আলো পেয়ে রঙিন ডানার পতঙ্গগুলোও বেরিয়ে আসতে থাকল লুকানো স্থান থেকে। দুপুর ঠিক ১২টায় গাইড রাসেল দেববর্মা বলে উঠল, ‘দেখেন স্যার, আপনার প্রজাপতি এসে গেছে।’ প্রথমবারের মতো পতঙ্গটিকে দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়লাম! কিন্তু ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে যেই না শাটারে ক্লিক করতে যাব, অমনি পতঙ্গটি পালিয়ে গেল। ওর ফেরার আশায় আরও আধা ঘণ্টা অপেক্ষা করলাম। কিন্তু ফল শূন্য। তাই ঢাকার দিকে পা বাড়ালাম।
২৮ নভেম্বর ২০২৫-এ এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বিরল পরিযায়ী নীলচে লালগির্দির ছবি তুলতে বার্ডিংবিডি ট্যুরসের সঙ্গে আবারও গেলাম মাধবকুণ্ড। সকাল থেকেই চমৎকার রোদ। মাধবকুণ্ড ঝরনা থেকে খানিকটা আগেই পরীকুণ্ডে পাখিটিকে পেয়ে গেলাম সকাল নয়টার মধ্যেই। ফিরতি বাস সন্ধ্যায়। হাতে সময় বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত।
মাধবকুণ্ড প্রজাপতির আখড়া। কাজেই সময় নষ্ট না করে শাহাদাৎকে নিয়ে ওদের খুঁজতে বেরিয়ে পড়লাম। পরের ২ ঘণ্টা ২০ মিনিটে ১৫ প্রজাতির প্রজাপতি, ১২ প্রজাতির পাখি ও ২ প্রজাতির কাঠবিড়ালির ছবি তুললাম। বেলা সোয়া ১১টায় পরীকুণ্ডে ফিরলাম। এবার ঝরনা ও পাথুরে ছড়ায় পতঙ্গগুলোকে খুঁজব। পরীকুণ্ডে আসার সঙ্গে সঙ্গেই ইকবাল বাবুর ডাক, ‘স্যার, এদিকে আসেন, আপনার প্রজাপতিটি মাটিতে বসে আছে।’ সঙ্গে সঙ্গে পড়ি মরি হয়ে ওখানে গেলাম। এমনিতেই নতুন কিছু ক্লিক করতে গেলে আমার হাঁত কাঁপে, তার ওপর প্রজাপতিটি অতিরিক্ত চঞ্চল। তাই প্রথম ছবিটি তুলতে তিন মিনিট লাগল। এরপর সব ঠিকঠাক। সেদিন অতি আরাধ্য প্রজাপতিটিসহ ১০ প্রজাতির নতুন প্রজাপতি পেয়েছিলাম।
এক যুগের বেশি সময় খোঁজার পর মাধবকুণ্ডে পাওয়া বিরল পতঙ্গটি এ দেশের বিপন্ন প্রজাপতি মহি সীমান্ত। পশ্চিমবঙ্গে বলে কাগজি। ইংরেজি নাম কমন ম্যাপ/ম্যাপউইং। ডানাজুড়ে থাকা সূক্ষ্ম রেখায় তৈরি জালিকার কারুকাজ থেকেই ইংরেজি নামের উৎপত্তি। কারণ, রেখাগুলো দেখতে অনেকটা ভৌগোলিক মানচিত্রের অক্ষাংশ, দ্রাঘিমাংশ ও সীমানা নির্দেশক রেখার মতো। নিম্ফালিডি গোত্রের পতঙ্গটির বৈজ্ঞানিক নাম Cyrestis thyodamas। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া ও জাপানে দেখা যায়।
মহি সীমান্ত মাঝারি আকারের প্রজাপতি। দেহ সরু ও ডানা প্রশস্ত। দেহের ওপরটা ফ্যাকাশে ঘিয়ে-সাদা। ডানার বিস্তার ৫০-৬০ মিলিমিটার। আধা স্বচ্ছ ডানাগুলো সাদা। ডানার ওপর লম্বালম্বিভাবে অনিয়মিত, সরু, গাঢ় চকলেট-বাদামি বা কালো ঢেউখেলানো রেখাগুলোকে নকশার মতো লাগে। ডানার প্রান্ত ও নিচের কোণগুলোর কাছে ছোট ছোট কমলা ও কালো চোখসদৃশ নকশা রয়েছে। পুরুষের ডানার নিচটা ফ্যাকাশে সাদা। কালো শিরাসহ স্ত্রীরটা ফ্যাকাশে হলদে।
এরা শীতল, আর্দ্র ও ছায়াঘেরা বনের বাসিন্দা। সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের মিশ্র চিরসবুজ বনের ঝরনা, জলপ্রপাত, স্যাঁতসেঁতে বনপথ, পাথুরে ছড়া বা জলধারা ও আর্দ্র বন প্রান্তের কাছাকাছি বাস করে। সচরাচর ডানা ঝাপটা দিয়ে চিলের মতো ধীরগতিতে ওড়ে। বিরক্ত হলে দ্রুত উড়ে চলে যায়। পানির কাছাকাছি বসে, ফুলে তেমন আগ্রহ নেই।
সারা বছরই প্রজনন করতে পারে। স্ত্রী বট, ডুমুর, অশ্বত্থ (পিপল/পিপুল) ও অন্যান্য বটজাতীয় গাছের পাতার নিচের দিকে একটি করে গম্বুজাকৃতির ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে শূককীট বের হয় ৩-৫ দিনে। শূককীট ১২-১৮ দিনে পাঁচবার খোলস পাল্টে শক্ত মূককীটের খোলসে নিজেকে আবৃত করে ফেলে। মূককীটের খোলস কেটে ৭-১০ দিন পর পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতি বের হয়। বয়স্কগুলো ২-৪ সপ্তাহ বাঁচে। তাপমাত্রা ও জলবায়ুর ওপর নির্ভর করে ৬-১০ সপ্তাহে জীবনচক্র শেষ হয়।
আ ন ম আমিনুর রহমান: পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ,
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর