কাউকে টক্সিক বলার আগে নিজেকে যে প্রশ্নগুলো করবেন

· Prothom Alo

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘টক্সিক’ ও ‘ট্রমা’ নিয়ে আলোচনা দিন দিন বাড়ছে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই দুটি ধারণাকে একই অর্থে ব্যবহার করা হয়। ট্রমার কারণে তৈরি কোনো আচরণকে সহজেই ‘টক্সিক’ বলে চিহ্নিত করা হয়। অথচ সব খারাপ আচরণ টক্সিক নয়, আবার কোনো কঠিন আচরণ মানেই যে তা ইচ্ছাকৃত বা বিদ্বেষপূর্ণ, এমনও নয়। কখনো কখনো বাইরে থেকে টক্সিক মনে হওয়া আচরণের পেছনে থাকতে পারে অমীমাংসিত ট্রমা, পুরোনো মানসিক ক্ষত কিংবা নিরাপত্তাহীনতা।

Visit esporist.com for more information.

অভিজ্ঞতা কেন গুরুত্বপূর্ণ
মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতা চারপাশের ঘটনা দেখা ও সেগুলোর প্রতি কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো হবে, তা প্রভাবিত করে। বিশেষ করে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অতীত অভিজ্ঞতা অন্য ব্যক্তির কথা বা আচরণের উদ্দেশ্য কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে, সেটিও নির্ধারণ করতে পারে।

একই আচরণ একজনের কাছে ভয় বা কষ্টের কারণ হতে পারে, আবার অন্য কেউ সেটিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন। ফলে কোনো আচরণকে টক্সিক বলার আগে তার পটভূমি বোঝা জরুরি। আচরণের পেছনে ট্রমা, পুরোনো মানসিক ক্ষত কিংবা অন্য কোনো অভিজ্ঞতা কাজ করতে পারে।

কোনো আচরণের কারণ বোঝা মানে সেটিকে সমর্থন করা নয়। বরং এটি বুঝতে সাহায্য করে, কোনো সম্পর্ক মেরামত করা সম্ভব কি না, কোথায় সীমারেখা প্রয়োজন এবং কখন সম্পর্ক থেকে বের হয়ে আসা ভালো। এ ক্ষেত্রে চারটি বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে—
• সম্পর্ক: অন্য ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কটি কেমন?
• প্রতিক্রিয়া: তাঁর আচরণের প্রতি নিজের প্রতিক্রিয়া কী?
• ভূমিকা: দ্বন্দ্বে নিজের ভূমিকা কী?
• সম্পর্ক মেরামত: সম্পর্কটি ঠিক করার কোনো সুযোগ বা চেষ্টা আছে কি না?

কাউকে টক্সিক হিসেবে চিহ্নিত করলে সম্পর্ক থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত সহজ মনে হতে পারে। কিন্তু তার আগে কিছু প্রশ্ন করা প্রয়োজন:
• কী ঘটেছিল?
• তিনি এমন আচরণ করলেন কেন?
• তাঁর জীবনের কোনো অভিজ্ঞতা কি আচরণটিকে প্রভাবিত করেছে?
• এবং এই পরিস্থিতিতে নিজের ভূমিকা কী ছিল?

সব কঠিন সম্পর্ক টক্সিক নয়। শুধু অস্বস্তি হচ্ছে বলেই কোনো সম্পর্ক শেষ করে দিতে হবে, এমনও নয়। মতবিরোধ সামলানো, নিজের অস্বস্তি নিয়ন্ত্রণ করা এবং ভিন্নমতের সঙ্গে কথা বলতে শেখাও সুস্থ সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

পটভূমি বোঝা জরুরি
সুস্থ সম্পর্কের জন্য নিজের আচরণ ও ভূমিকা নিয়ে নিয়মিত ভাবা প্রয়োজন। মানুষের আচরণ নিজের কাছে একভাবে মনে হলেও অন্যের কাছে সেটি ভিন্নভাবে মনে হতে পারে। তাই নিজের সম্পর্কে সমালোচনা বা মতামত অস্বস্তিকর হলেও তা থেকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা নেওয়া সম্ভব।

একইভাবে অন্য ব্যক্তির আচরণের কারণ বোঝার চেষ্টাও জরুরি। কারও ক্ষতিকর আচরণের পেছনে ট্রমা বা কঠিন অভিজ্ঞতা থাকতে পারে। তবে সেই কারণ জানা মানেই আচরণটি মেনে নেওয়া নয়। কারও অভিজ্ঞতার প্রতি সহানুভূতিশীল থাকা এবং একই সঙ্গে নিজের সীমারেখা বজায় রাখা—দুটিই সম্ভব। আচরণের প্রভাবও বিবেচনায় রাখতে হবে। পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করলে কখন সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা করা উচিত, কখন সীমারেখা তৈরি করা প্রয়োজন এবং কখন সম্পর্ক থেকে সরে আসা উচিত, তা নির্ধারণ করা সহজ হয়।

বড় সিদ্ধান্ত কীভাবে নেবেন? সহজ উপায়

ট্রমা আর টক্সিক আচরণ এক নয়
ট্রমা মানুষের আচরণ ও সম্পর্কের ধরনে প্রভাব ফেলতে পারে। অতীতে বিশ্বাসভঙ্গ বা অন্য কোনো আঘাতের অভিজ্ঞতা থাকলে কেউ হয়তো অন্যকে সহজে বিশ্বাস করতে পারেন না, বারবার নিরাপত্তা খুঁজতে পারেন বা সম্পর্কের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্ক হয়ে উঠতে পারেন।

তবে ট্রমা কোনো ক্ষতিকর আচরণের অজুহাত নয়। একইভাবে ট্রমা থাকলেই কোনো আচরণকে টক্সিক বা ট্রমাজনিত বলে ধরে নেওয়াও ঠিক নয়। নিয়ন্ত্রণমূলক বা আবেগগতভাবে দূরত্ব তৈরি করা আচরণের পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তাই শুধু আচরণ দেখে সিদ্ধান্তে না গিয়ে এর ধারাবাহিকতা, পরিস্থিতি ও পটভূমি বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ট্রমার কারণে এমন আচরণ তৈরি হতে পারে, যা বাইরে থেকে টক্সিক মনে হয়। সেই অভিজ্ঞতাটি বোঝা গুরুত্বপূর্ণ হলেও অন্য ব্যক্তির আচরণ সামলানোর দায়িত্ব নিজের ওপর নেওয়ার প্রয়োজন নেই।

কাউকে টক্সিক বলার আগে সতর্কতা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মনোবিজ্ঞানের অনেক ধারণা সহজলভ্য হয়েছে। তবে জটিল মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলোকে কয়েকটি সহজ শব্দ বা ‘লেবেলে’ নামিয়ে আনার প্রবণতাও বেড়েছে। যেমন—স্বার্থপর, মানসিকভাবে প্রভাবিত করা, চালাকি করে নিজের কথা মানানো, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ করা ও টক্সিক।

কিন্তু একটি আচরণ খুব কম ক্ষেত্রেই পুরো মানুষটির পরিচয় তুলে ধরে। কোনো আচরণের অর্থ বুঝতে তার পটভূমি ও ধারাবাহিকতা বিবেচনা করা দরকার।
একইভাবে ‘নিজের মানসিক শান্তিকে গুরুত্ব দিন’, ‘সম্পর্ক ছিন্ন করুন’, ‘কোনো যোগাযোগ রাখবেন না’ কিংবা ‘ব্লক করে জীবন থেকে সরিয়ে দিন’—এ ধরনের পরামর্শও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে দেখা যায়।

নির্যাতন বা গুরুতর ক্ষতিকর সম্পর্কের ক্ষেত্রে দূরে সরে যাওয়া এবং সীমারেখা তৈরি করা প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সাধারণ মতবিরোধ, হতাশা, কষ্ট বা সমালোচনাকেও যদি একইভাবে দেখা হয়, তাহলে সম্পর্কের স্বাভাবিক জটিলতাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করার ঝুঁকি থাকে। মতবিরোধ সামলানো, গঠনমূলক সমালোচনা গ্রহণ করা, নিজের ভুলের দায়িত্ব নেওয়া, ক্ষমা চাওয়া এবং সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা করাও মানসিক পরিপক্বতার অংশ।

কেউ যখন বলে ‘আমি ভালো নেই’, আমরা কি সত্যিই শুনি

অন্যকে বিচার করার আগে নিজেকেও দেখা দরকার
মানুষের একটি সাধারণ মানসিক প্রবণতা হলো, অন্যের আচরণকে তাঁর চরিত্রের ফল হিসেবে দেখা। কিন্তু নিজের আচরণের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি, উদ্দেশ্য বা পারিপার্শ্বিকতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া। মনোবিজ্ঞানে এই প্রবণতাকে ‘অ্যাট্রিবিউশনাল বায়াস’ বলা হয়।

তাই কোনো আচরণকে টক্সিক হিসেবে চিহ্নিত করার আগে কয়েকটি প্রশ্ন করা যেতে পারে—
• নিজের অতীত অভিজ্ঞতা কি অন্যের আচরণকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করছে?
• বর্তমান মানসিক অবস্থা কি তাঁর আচরণের ব্যাখ্যায় কোনো ভূমিকা রাখছে?
• নিজের কোনো আচরণে কি অন্য কেউ কষ্ট পেয়ে থাকতে পারে?
• যাঁকে টক্সিক মনে হচ্ছে, তাঁর আচরণের পেছনে কি কোনো ট্রমা বা পুরোনো অভিজ্ঞতা কাজ করছে?

নিজের ভূমিকা খতিয়ে দেখা কঠিন হলেও সুস্থ সম্পর্কের জন্য তা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তি বা পরিস্থিতি কখনো এমন পুরোনো ক্ষতকে সামনে নিয়ে আসতে পারে, যা সেই সম্পর্কের অনেক আগেই তৈরি হয়েছিল। তাই অন্যকে বিচার করার পাশাপাশি নিজের প্রতিক্রিয়ার উৎসও বোঝা প্রয়োজন।

শেষ পর্যন্ত দুটি প্রশ্নই গুরুত্বপূর্ণ:
• ‘সে কি টক্সিক?’ এবং
• ‘তার এই আচরণ আমাকে এভাবে প্রভাবিত করছে কেন?’

দুটির উত্তর খোঁজার মধ্যেই সম্পর্ককে আরও পরিষ্কারভাবে বোঝার সুযোগ রয়েছে।

উদ্দেশ্য কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা নয়। বরং ক্ষতিকর আচরণ শনাক্ত করা, নিজের ভূমিকা বোঝা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সীমারেখা তৈরি, সম্পর্ক মেরামত কিংবা সরে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এ বিষয়ে কিছু দৃষ্টিভঙ্গি দিতে পারে, কিন্তু মানুষের আচরণ বোঝার একমাত্র উৎস হওয়া উচিত নয়। সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রেক্ষাপট, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং আত্মবিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ।

লেখা: ড. লিসা লিগিন্স-চেম্বার্স/সাইকোলজি টুডে

Read full story at source