নোবেল পাওয়ার আগেই যিনি স্টকহোমের টিকিট কেটেছিলেন
· Prothom Alo

সে বছরের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার কে পাবেন, তা জানা যাবে আরও কয়েক মাস পরে। কিন্তু কলকাতার এক বিজ্ঞানী এরই মধ্যে নিজের ও স্ত্রীর জন্য ইউরোপ যাওয়ার জাহাজের টিকিট কেটে ফেললেন। তবে এই নোবেলের গল্প শুরু হয়েছিল নয় বছর আগের অন্য একটি জাহাজে।
প্রতিবছর অক্টোবর মাস আসার আগে আগে আমি খোঁজ নিতে শুরু করি, এবার নোবেল পুরস্কার কারা পেতে পারেন। এখন অনেক সংবাদমাধ্যমেই সম্ভাব্য নোবেলজয়ীদের নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা চলে। মজার ব্যাপার হলো, শেষ পর্যন্ত সেগুলো খুব কমই মেলে। এবার অবশ্য সেই খোঁজ নেওয়া হয়নি। তার একটা কারণ, আন্তর্জাতিক গণিত ও বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে অংশ নেওয়া বাংলাদেশের ১৬ জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে এখন ইন্দোনেশিয়ায় আছি। প্রতিযোগিতা আর ওদের নিয়ে ব্যস্ততায় নোবেলের খোঁজ রাখা হয়ে ওঠেনি। আজ একটু খোঁজ নিতে গিয়ে দেখি, পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল তো এরই মধ্যে ঘোষণা হয়ে গেছে!
Visit syntagm.co.za for more information.
পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছেন বেলজিয়ামে জন্ম নেওয়া বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হালজেনএবার পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছেন বেলজিয়ামে জন্ম নেওয়া বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হালজেন। দক্ষিণ মেরুর বরফের গভীরে স্থাপিত IceCube Neutrino Observatory-তে তাঁর নির্ণায়ক অবদান এবং মহাকাশের উৎস থেকে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো আবিষ্কারের জন্য এই স্বীকৃতি। মহাবিশ্বকে জানার জন্য তাঁর কাজ জ্যোতির্বিজ্ঞানের নতুন একটি জানালা খুলে দিয়েছে।
পদার্থবিজ্ঞানের নোবেলের কথা ভাবতে গিয়ে আমার মনে পড়ল দুটি জাহাজের কথা। দুই জাহাজের যাত্রার মধ্যে ব্যবধান নয় বছর। আর দুটির সঙ্গেই জড়িয়ে আছেন একজন নোবেলজয়ী। দুই জাহাজের সঙ্গে নোবেল পুরস্কারের কী সম্পর্ক? সেটাই জানা যাক।
View this post on Instagram
যে জাহাজের টিকিট কাটা হয়েছিল নোবেল ঘোষণার আগেই
দ্বিতীয় জাহাজটির গল্প আগে বলি। ১৯৩০ সালের জুলাই মাস। সে বছরের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার কে পাবেন, তা জানা যাবে আরও কয়েক মাস পরে। কিন্তু কলকাতার এক বিজ্ঞানী এরই মধ্যে নিজের ও স্ত্রীর জন্য ইউরোপ যাওয়ার জাহাজের টিকিট কেটে ফেললেন। গন্তব্য স্টকহোম। তাঁর ধারণা, এবার পদার্থবিজ্ঞানের নোবেলটি তিনিই পাচ্ছেন। আর নোবেল কমিটির সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করলে ভারত থেকে দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা শেষে ১০ ডিসেম্বরের পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে সময়মতো পৌঁছানো যাবে না।
বিজ্ঞানীর নাম চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রামন - সি ভি রামন নামে তিনি পরিচিত। এটাকে আত্মবিশ্বাস বলব, নাকি অহংকার? প্রশ্নটা একেবারে অমূলক নয়। ছয় বছর আগে, ১৯২৪ সালে রয়্যাল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, এরপর কী? রামনের উত্তর ছিল, “The Nobel Prize, of course!”
শেষ পর্যন্ত তাঁর আত্মবিশ্বাস ভুল প্রমাণিত হয়নি। ১৯৩০ সালের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনিই, আলোর বিচ্ছুরণ নিয়ে তাঁর কাজ এবং তাঁর নামেই পরিচিত রামন ইভেক্ট আবিষ্কারের জন্য। তবে এই নোবেলের গল্প শুরু হয়েছিল নয় বছর আগের অন্য একটি জাহাজে।
সমুদ্র এত নীল কেন
রামন ইফেক্টের কথা আমি প্রথম জানতে পারি স্কুলে, সম্ভবত নবম বা দশম শ্রেণিতে পড়ার সময়। কে আমাকে বুঝিয়েছিলেন, এখন আর মনে নেই। তবে কথাটা মনে আছে। বলা হয়েছিল, সমুদ্রের পানি কেন নীল, তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন ভারতীয় বিজ্ঞানী সি ভি রামন। অনেক বছর গল্পটা আমি এভাবেই জেনেছি। পরে বুঝেছি, কথাটা পুরোপুরি ঠিক নয়, আবার একেবারে ভুলও নয়। বরং সত্যিকারের গল্পটা আরও মজার।
১৯২১ সালে ইউরোপ থেকে ভারতে ফিরছিলেন রামন। জাহাজের নাম এস এস নারকুন্ডা। জাহাজ যখন ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিচ্ছে, সমুদ্রের গভীর নীল রং তাঁর নজর কাড়ে।
সে সময় প্রচলিত ব্যাখ্যা ছিল, আকাশের নীল রঙের প্রতিফলনের কারণেই সমুদ্র নীল দেখায়। রামন তাতে সন্তুষ্ট হলেন না। সঙ্গে থাকা ছোটখাটো অপটিক্যাল যন্ত্রপাতি দিয়েই জাহাজে পরীক্ষা শুরু করলেন। তাঁর মনে হলো, পানির অণুর সঙ্গে আলোর বিচ্ছুরণেরও ভূমিকা রয়েছে।
সমুদ্র কেন নীল - এই কৌতূহল তাঁকে পরের কয়েক বছর আলোর বিচ্ছুরণ নিয়ে গবেষণায় ডুবিয়ে রাখলজাহাজ এডেনে থামলে সেখান থেকেই নিজের পর্যবেক্ষণ লিখে Nature পত্রিকায় পাঠালেন। লেখায় ঠিকানা পর্যন্ত দেওয়া হয়েছিল—SS Narkunda, near Aden।
জাহাজ এডেনে থামলে সেখান থেকেই নিজের পর্যবেক্ষণ লিখে Nature পত্রিকায় পাঠালেন। লেখায় ঠিকানা পর্যন্ত দেওয়া হয়েছিল—SS Narkunda, near Aden।
সমুদ্র কেন নীল - এই কৌতূহল তাঁকে পরের কয়েক বছর আলোর বিচ্ছুরণ নিয়ে গবেষণায় ডুবিয়ে রাখল।
রামন ইফেক্ট
খুব সহজ করে বললে, কোনো পদার্থের ওপর আলো ফেললে তার বেশির ভাগ একই শক্তি নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু খুব সামান্য কিছু আলো পদার্থের অণুর সঙ্গে শক্তি আদান-প্রদান করে। ফলে ফিরে আসা আলোর কম্পাঙ্ক বা রং সামান্য বদলে যায়।
এই সামান্য পরিবর্তন থেকেই পদার্থটির অণু সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়। অনেকটা তার নিজস্ব আঙুলের ছাপের মতো। এটাই রামন ইফেক্ট। ১৯২৮ সালে রামন ও তাঁর সহযোগীদের পরীক্ষায় এই নতুন ধরনের আলোর বিচ্ছুরণ ধরা পড়ে। মাত্র দুই বছরের মধ্যে এই আবিষ্কার তাঁকে নোবেল এনে দেয়।
হিমালয়সম অহং
কিন্তু রামনকে শুধু সমুদ্রের নীল রং দেখে প্রশ্ন করা কৌতূহলী বিজ্ঞানী হিসেবে দেখলে মানুষটার পুরোটা দেখা হয় না। তাঁর অসাধারণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রবল অহংবোধ এবং তীক্ষ্ণ মেজাজের কথাও তাঁর জীবনীকারেরা লিখেছেন। তাঁর জীবনীকার গণেশন ভেঙ্কটরামন একে বলেছেন “Himalayan ego and sharp tongue”।
এই মানুষটির জীবনের আরেকটি ঘটনা আমাকে বিশেষভাবে ভাবায়। ১৯৩৩ সালে কমলা ভাগবত, যিনি পরে কমলা সোহনি নামে পরিচিত হন, ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সে গবেষণা করতে চাইলেন। তখন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক সি ভি রামন। বোম্বে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণিতে পাস করা কমলাকে রামন গবেষণার সুযোগ দিতে রাজি হলেন না। কারণ তিনি নারী। ভাবা যায়?
বোম্বে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণিতে পাস করা কমলাকে রামন গবেষণার সুযোগ দিতে রাজি হলেন নাযে মানুষটি কয়েক বছর আগে বিজ্ঞানের জগতে ভারতের জন্য প্রথম নোবেল এনে দিয়েছেন, তিনিই যদি একজন নারীর গবেষণা করার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তাহলে সেই সময় ভারতবর্ষের একজন সাধারণ মানুষের কাছে মেয়েদের বিজ্ঞানচর্চার সম্ভাবনা কেমন মনে হওয়ার কথা? কিন্তু কমলা মাথা নিচু করে বাড়ি ফিরে যাননি। নিজের যোগ্যতার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। রামনের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে তাঁর অফিসের সামনে সত্যাগ্রহ করেছেন। শেষ পর্যন্ত রামনকে সিদ্ধান্ত বদলাতে হয়েছে। যদিও কঠিন কিছু শর্তে, কমলা গবেষণার সুযোগ পেয়েছেন। পরে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডিও করেছেন।
আমাদের অনেক কমলা দরকার
কমলার এই গল্পটি আমার কাছে আরও একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। মেয়েদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য আমরা অনেক বছর ধরে #missingDaughter নামে একটি উদ্যোগ চালাচ্ছি। আমাদের প্রশ্নটি খুব সাধারণ; আমাদের মেধাবী মেয়েরা কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে? প্রায় একশো বছর পরও কমলা সোহনির গল্পটি তাই আমার কাছে পুরোনো গল্প মনে হয় না।
আমাদের অনেক কমলা দরকারএখন হয়তো মেয়েদের সামনে রামন বসে সরাসরি বলছেন না, “তুমি নারী, তাই গবেষণা করতে পারবে না।” কিন্তু “এটা মেয়েদের বিষয় নয়”, “প্রোগ্রামিং করে কী হবে”, “এত দূরে গিয়ে পড়ার দরকার কী”—এমন অনেক ছোট-বড় দেয়াল এখনো আছে।
এই দেয়াল শুধু প্রতিষ্ঠান বা সমাজকে বদলে ভাঙা যাবে না। আমাদের কমলাদেরও দরকার। যে মেয়েরা বুক চিতিয়ে দাঁড়াবে। “তুমি পারবে না”—শত বছর ধরে জমে থাকা এই জগদ্দল পাথরের বিরুদ্ধে ধাক্কা দেবে। এক শ বছর আগে কমলার হাতিয়ার ছিল তাঁর মেধা, জেদ আর নিজের সক্ষমতার ওপর বিশ্বাস। নতুন এই লড়াইয়ে আমাদের মেয়েদের হাতে আরও কিছু শক্তিশালী হাতিয়ার আছে—প্রযুক্তি, প্রোগ্রামিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। আমাদের কাজ তাদের হয়ে লড়াইটা করে দেওয়া নয়। আমাদের কাজ তাদের জন্য সুযোগ তৈরি করা, তাদের হাতে নতুন হাতিয়ারগুলো তুলে দেওয়া এবং তারা যখন দাঁড়াবে, তখন তাদের পাশে দাঁড়ানো।
আবার সেই দুই জাহাজ
রামনের গল্পে ফিরে আসি। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার ব্যাপারে তাঁর আগ্রহ বা আত্মবিশ্বাস কোনোটাই গোপন ছিল না। ১৯২৯ সালে তিনি বিজ্ঞানী নিলস বোরকে ১৯৩০ সালের নোবেলের জন্য তাঁর সমর্থন চেয়ে লিখেছেন। অথচ রামন তখন জানতেন না, বোর আগের বছরই তাঁকে নোবেলের জন্য মনোনয়ন দিয়েছেন। ১৯৩০ সালেও দিয়েছেন। সে বছর রামনকে মনোনয়ন দেওয়া বিজ্ঞানীদের মধ্যে আর্নেস্ট রাদারফোর্ড ও লুই দ্য ব্রগলিও ছিলেন।
রামনের আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে অহংকার মিশে থাকতে পারে, কিন্তু নিজের কাজের গুরুত্ব সম্পর্কে তাঁর ধারণা ভুল ছিল নাকাজেই রামনের আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে অহংকার মিশে থাকতে পারে, কিন্তু নিজের কাজের গুরুত্ব সম্পর্কে তাঁর ধারণা ভুল ছিল না। শেষ পর্যন্ত তাই আমার মনে থাকে সেই দুটি জাহাজ। ১৯২১ সালের একটি জাহাজে বসে একজন মানুষ ভূমধ্যসাগরের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন, সমুদ্র এত নীল কেন? নয় বছর পর আরেকটি জাহাজে তিনি স্ত্রীকে নিয়ে রওনা দিলেন স্টকহোমের দিকে। নোবেল কমিটি তখনো জানায়নি পুরস্কারটি তিনি পাচ্ছেন। একটি জাহাজের যাত্রা শুরু হয়েছিল একটি প্রশ্ন দিয়ে। আর অন্যটির যাত্রা নিজের কাজের ওপর প্রায় অবিশ্বাস্য বিশ্বাস নিয়ে। সি ভি রামনের গল্পে সম্ভবত দুটোই দরকার ছিল।
ছবি: ইন্সটাগ্রাম