সাংবাদিকদের থামিয়ে সন্তানদের জন্য লাঞ্চ বানালেন চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেলজয়ী কার্ল ডাইসেরথ
· Prothom Alo
৫ অক্টোবর গভীর রাতে সুখবরটি পান বিজ্ঞানী কার্ল ডাইসেরথ। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক যুগান্তকারী ভূমিকার জন্য তিনি ২০২৬ সালের নোবেল পুরস্কার জিতেছেন। নোবেল ঘোষণার পর থেকে একের পর এক অভিনন্দনবার্তা আসতে থাকে ক্যালিফোর্নিয়ার এই বিজ্ঞানীর কাছে।
Visit afnews.co.za for more information.
কেউ জানতে চান তাঁর অনুভূতি, কেউ আবার নিতে চান সাক্ষাৎকার। এত কিছুর মধ্যে একটু বিরতি চাইলেন কার্ল ডাইসেরথ। কারণ জানতে চাইলেন এক সাংবাদিক। কার্ল ডাইসেরথ জানান, এখন গভীর রাত। তাঁর সন্তানেরা ঘুমাচ্ছে। সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে তাদের টিফিন বানিয়ে দেওয়াটাই এখন তাঁর সবচেয়ে বড় কাজ।
৫৪ বছর বয়সী বিজ্ঞানী কার্ল ডাইসেরথ ‘অপটোজেনেটিকস’ নামের নতুন এক প্রযুক্তির গবেষণার জন্য জার্মানির দুই বিজ্ঞানীর সঙ্গে যৌথভাবে এই নোবেল পান। এটি এমন এক পদ্ধতি, যার সাহায্যে আলো ব্যবহার করে মস্তিষ্কের ভেতরের নিউরন বা কোষকে সুইচের মতো অন–অফ করা যায়।
সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে তাদের টিফিন বানিয়ে দেওয়াটাই এখন তাঁর সবচেয়ে বড় কাজকার্ল ডাইসেরথ স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। গবেষণা কাজটা রাতের বেলা করতে পছন্দ করেন তিনি। রাতের কাজ আর শিক্ষার্থীদের ই–মেইলের উত্তর শেষে যখন ঘুমাতে যাবেন, ঠিক তখনই স্টকহোমের নোবেল কমিটির কাছ থেকে ফোন আসে তাঁর কাছে।
পরীক্ষার ফল ভালো করব কীভাবেএক সাক্ষাৎকারে ডাইসেরথ বলেন, ‘ফোনটি পেয়ে মুহূর্তের জন্য আমি ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলাম। তবে দুই মিনিটের মধ্যেই নিজেকে সামলে নিয়ে আবার স্বাভাবিক হই।’
তখন অনলাইনে সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্য ডক্টর ডাইসেরথ খুব দ্রুতই তৈরি হয়ে যান। এ কাজে দারুণভাবে সহায়তা করে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য ও যোগাযোগ টিম। তারা চটপট ই–মেইল আদান–প্রদান করে সাংবাদিকদের সঙ্গে ডাইসেরথের কথা বলার ব্যবস্থা করে দেয়।
এরপর তাঁর ছেলেকেও এই আনন্দের খবর জানানো হয়নোবেল জয়ের ঘোষণা আসার এক ঘণ্টা পর ডাইসেরথ বলেন, ‘আজ রাতে আর একদমই ঘুমানো হলো না।’ ফোন আর জুম অ্যাপের মাধ্যমে সাংবাদিকেরা যখন তাঁর সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন, তখন এক ফটোগ্রাফার ও ভিডিওগ্রাফার দ্রুত তাঁর বাড়ির দিকে রওনা হন।
রাত সাড়ে তিনটার দিকে স্ট্যানফোর্ডের সেই বাড়িতে পৌঁছে ফটোগ্রাফার কিছুটা ঘাবড়ে যান। বাড়ির বাইরে হ্যালোইনের সাজসজ্জা ঝুলছিল, আর ভেতরে কেবল একটিমাত্র আলো জ্বলছিল। ভুল জায়গায় এলেন কি না, এই ভেবে তিনি দরজায় কড়া নাড়বেন কি না ভাবছিলেন।
ঠিক তখনই বিজ্ঞানীর স্ত্রী ডক্টর মিশেল মঞ্জ দরজা খুলে তাঁদের ভেতরে নিয়ে যান। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, নতুন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী সোফায় বসে একটার পর একটা ফোনকল ধরে কথা বলে যাচ্ছেন।
৫৪ বছর বয়সী বিজ্ঞানী কার্ল ডাইসেরথ ‘অপটোজেনেটিকস’ নামের নতুন এক প্রযুক্তির গবেষণার জন্য জার্মানির দুই বিজ্ঞানীর সঙ্গে যৌথভাবে এই নোবেল পানউৎসবের আনন্দ ভাগ করে নিতে স্ট্যানফোর্ডের যোগাযোগ টিমের সদস্যরা সেখানে উপস্থিত হন। তাঁদের আপ্যায়ন করছিলেন ডক্টর মিশেল মঞ্জ। তিনিও শিশু–নিউরোনোকোলজিস্ট ও গবেষক। ডাইসেরথ জানান, নিজের এই কাজের জন্য নোবেল পাওয়ার খবরে তিনি হয়তো অবাক হয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর স্ত্রী একদমই অবাক হননি।
যেসব দেশে বিড়ালের সংখ্যা বেশি, সেখানকার মানুষ বেশি সুখী, নতুন গবেষণানিজের সহ–নোবেলজয়ী গবেষণা সঙ্গী পিটার হেগেম্যান ও গেওর্গ নাগেলের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা এবং চিকিৎসাজগতে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাবের কথা তুলে ধরেন ডাইসেরথ।
৫ অক্টোবর গভীর রাতে সুখবরটি পান বিজ্ঞানী কার্ল ডাইসেরথডাইসেরথ বলেন, ‘আমি একজন ডাক্তার ও গবেষক। মনোরোগবিশেষজ্ঞ হিসেবে আমি অটিজম বা মানসিক বিষণ্নতায় ভোগা রোগীদের কষ্টের কথা ভাবি। এই গবেষণা তাদের মনে যে নতুন আশা জাগিয়েছে, তা আমার কাছে অনেক বড় এক পাওয়া। তবে এর পাশাপাশি আমি মৌলিক গবেষণার একজন অনুরাগী। তাই আমাদের এই অবিশ্বাস্য মানবমস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে, কীভাবে তথ্য মনে রাখে আর কীভাবে আমাদের পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে, তা বুঝতে পারাটাও আমার কাছে সমান জরুরি।’
সাক্ষাৎকার শেষ হওয়ার মুহূর্তে ডাইসেরথ স্ট্যানফোর্ডের সংবাদকর্মীদের জানান, সকাল সাড়ে ছয়টা থেকে এক ঘণ্টার জন্য তাঁর একটু বিরতি লাগবে। কারণ, ঠিক সেই সময়েই তাঁর সন্তানেরা ঘুম থেকে উঠবে। আর স্কুলে রওনা হওয়ার আগে তাদের দুপুরের টিফিন বানিয়ে দেওয়াটা বাবা হিসেবে তাঁর প্রধান দায়িত্ব।
৪০ বছর পর এশিয়ান গেমসে ব্যক্তিগত পদক, জিন্নাতের মনে পড়ছে বাবাকেগভীর রাতে এত লোকজনের আসা–যাওয়া আর সাংবাদিকদের ভিড়ে প্রতিবেশীদের কোনো অসুবিধা হচ্ছে কি না, এ নিয়ে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মী চিন্তায় পড়ে যান। কিন্তু বিজ্ঞানীর স্ত্রী মিশেল তা শুনে হেসেই উড়িয়ে দিলেন।
নিজের এই কাজের জন্য নোবেল পাওয়ার খবরে তিনি হয়তো অবাক হয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর স্ত্রী একদমই অবাক হননিমিশেল বললেন, তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবাসন এলাকায় থাকেন। আর সেই পাড়ায় এমন নোবেলজয়ী গুণী মানুষ আরও অনেকেই বাস করেন। তাই গভীর রাতে এমন হইচই কিংবা সাংবাদিকদের ভিড় জমানো সেখানে একদমই নতুন কোনো ঘটনা নয়।
এরপর ভোরের আলো ফোটে। তখনো ভিডিওগ্রাফার সেই বাড়িতেই উপস্থিত। সকাল হতেই ঘুম থেকে উঠে ড্রয়িংরুমে চলে আসে বিজ্ঞানীর দুই ছোট মেয়ে। খবরটি জানাতে মেয়েদের কাছে যান তিনি। মৃদু হেসে বলেন, ‘রাতে আমাকে কল করে জানিয়েছে, আমি নোবেল পুরস্কার পেয়েছি।’
এ কথা শোনামাত্র আনন্দে এক লাফে বাবার কোলে উঠে পড়ে এক মেয়ে, আর অন্যজন পাশ থেকে জড়িয়ে ধরে খুশিতে চিৎকার করে ওঠে। এরপর তাঁর ছেলেকেও এই আনন্দের খবর জানানো হয়। বাবা ও সন্তানদের দারুণ এই মিষ্টি মুহূর্তের ভিডিওটি পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ ভাইরাল হয়।
সূত্র: এবিসি নিউজ১৩ বছরের সাঁতারুর এশিয়ান গেমসে স্বর্ণ জেতার হ্যাটট্রিক