ভুল বুঝতে পেরে ছেলে বললেন, ‘মাকে এক দিনের জন্যও দূরে থাকপ্যার দেব না’
· Prothom Alo

‘রাগের মাথায় মাকে আমার সাথে না নেওয়ার কথা বলিছিল্যাম। কিন্তু এর পর থেকে অনুশোচনায় তিন দিন ঘুমাব্যার পারিনাই। এখন ভুল বুঝব্যার পারিছি। যত দিন বাঁইচ্যা থাকব, মাকে এক দিনের জন্যও আমার কাছের থ্যা দূরে থাকপ্যার দেব না।’
Visit rouesnews.click for more information.
আজ সোমবার সাঁথিয়া ইউএনও কার্যালয়ে মায়ের সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছিলেন ছেলে সাগর হোসেন। তিনি পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) গ্রাম পুলিশ।
৮ অক্টোবর ইউএনওর কার্যালয়ে মাকে নিজের সঙ্গে রাখতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আলোচনায় এসেছিলেন সাগর। মাকে সঙ্গে রাখতে ইউএনওসহ সবাই তাঁকে বোঝালেও মন গলছিল না তাঁর। সেই সাগরই আজ হাজির হলেন মাকে সঙ্গে নিয়ে। মা–ছেলে দুজনের মুখেই ছিল স্বস্তি ও আনন্দের ছাপ।
সাগর হোসেনআদালত ও ইউএনও স্যারের উদ্যোগে বিষয়টি বুঝব্যার পারিছি। এখন মাকে নিজের কাছে রাখব্যার পাইর্যা খুব ভালো লাগতেছে। সারা জীবন তাঁর দেখাশোনা করব, আর কোনো দিন তাঁকে দূরে সরায়া দেব না।মাকে সারাজীবন নিজের কাছে রাখার অঙ্গীকার করেছেন ছেলে সাগর হোসেন। আজ দুপুরে ইউএনওর কার্যালয়ে অসুস্থ মায়ের আকুতি, ‘আমি তোর সাথে যাবোরে, ও সোনার বাজানরে’, নিলেন না ছেলেসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, গতকাল রোববার বিকেলে পাবনা আদালতের হস্তক্ষেপে মা-ছেলের বিরোধের সমাধান হয়। এর পর থেকে মুন্নি খাতুন ছেলের সঙ্গেই আছেন।
আজ দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সাগর মাকে সঙ্গে নিয়ে সাঁথিয়ার ইউএনও সেলিম আহমেদের কার্যালয়ে আসেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন সাগরের মামা জাকির হোসেন ও খালু মাসুদ রানা। সেখানে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও সাংবাদিকদের সামনে সাগর মাকে সারা জীবন নিজের কাছে রাখার অঙ্গীকার করেন। এ সময় মা-ছেলে একে অপরকে মিষ্টিমুখ করান।
উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে সাগর হোসেন বলেন, ‘আদালত ও ইউএনও স্যারের উদ্যোগে বিষয়টি বুঝব্যার পারিছি। এখন মাকে নিজের কাছে রাখব্যার পাইর্যা খুব ভালো লাগতেছে। সারা জীবন তাঁর দেখাশোনা করব, আর কোনো দিন তাঁকে দূরে সরায়া দেব না।’
ছেলেকে পাশে পেয়ে মা মুন্নি খাতুনের চোখেমুখেও ছিল আনন্দের ঝিলিক। ছেলের জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়ে তিনি বলেন, ‘পাবনার আদালত ছেলেসহ আমাকে গতকাল (রোববার) ডাইক্যা নিয়্যা গেছিল। ছেলে সেখানেই আমার কাছে মাফ চাইছে। ছেলের প্রতি আমার কোনো রাগ-অভিমান নাই। গতকালের থ্যা ছেলের বাসায়ই আছি। ছেলে, ছেলের বউ আমাকে খুব যত্ন করতেছে। আমার ছেলের জন্য সবার কাছে দোয়া চাই।’
মুন্নি খাতুনপাবনার আদালত ছেলেসহ আমাকে গতকাল ডাইক্যা নিয়্যা গেছিল। ছেলে সেখানেই আমার কাছে মাফ চাইছে। ছেলের প্রতি আমার কোনো রাগ-অভিমান নাই। গতকালের থ্যা ছেলের বাসায়ই আছি। ছেলে, ছেলের বউ আমাকে খুব যত্ন করতেছে। আমার ছেলের জন্য সবার কাছে দোয়া চাই।আজ মাকে সঙ্গে নিয়ে ইউএনওর কার্যালয়ে উপস্থিত হন সাগর হোসেনসেলিম আহমেদ, ইউএনও, সাঁথিয়াআজ সাগর আমার কার্যালয়ে এসে আমার, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও সাংবাদিকদের সামনে মাকে সারা জীবন তাঁর কাছে রাখার অঙ্গীকার করেছেন। মা-ছেলে একে অপরকে মিষ্টি খাইয়েছেন। তাঁরা দুজনেই এখন খুব খুশি। এ জন্য আদালতকে ধন্যবাদ জানাই।যেভাবে হলো বিরোধের সমাধান
মুন্নি খাতুনের স্বামী সিরাজুল ইসলাম অনেক আগেই মারা গেছেন। দুই সন্তানের মধ্যে মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় জীবনের শেষ সময়ে ছেলে সাগরের সঙ্গে থাকতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ছেলের বিয়ের পর থেকে পুত্রবধূ ও শাশুড়ির মধ্যে বনিবনা হচ্ছিল না। বাড়তে থাকে পারিবারিক অশান্তি। একপর্যায়ে মাকে নিজের সঙ্গে রাখতে অস্বীকৃতি জানান সাগর। বিষয়টি সমাধানের জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা একাধিকবার চেষ্টা করেও সফল হননি।
মায়ের আশ্রয় ও ভরণপোষণের দাবিতে মুন্নি খাতুন সাঁথিয়ার ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। ৮ অক্টোবর ইউএনওর কার্যালয়ে শুনানিতে সাগর মাকে মাসিক খরচ দিতে রাজি হলেও নিজের সঙ্গে রাখতে অস্বীকৃতি জানান। একপর্যায়ে মাকে সঙ্গে রাখলে আত্মহত্যা করবেন বলেও মন্তব্য করেন। শুনানির ঘটনাটি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে।
ইউএনও সেলিম আহমেদ জানান, ৮ অক্টোবরের শুনানিতে তিনি সাগরকে মায়ের দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেন। পরে তাঁকে ১২ অক্টোবর আবার শুনানিতে হাজির হওয়ার জন্য সময় দেওয়া হয়েছিল। এর আগেই সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনা আদালতের নজরে আসে। গতকাল রোববার আদালত মা ও ছেলেকে ডেকে তাঁদের বক্তব্য শোনেন এবং বিরোধের সমাধানে উদ্যোগ নেন।
সেলিম আহমেদ বলেন, ‘আজ সাগর আমার কার্যালয়ে এসে আমার, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও সাংবাদিকদের সামনে মাকে সারা জীবন তাঁর কাছে রাখার অঙ্গীকার করেছেন। মা-ছেলে একে অপরকে মিষ্টি খাইয়েছেন। তাঁরা দুজনেই এখন খুব খুশি। এ জন্য আদালতকে ধন্যবাদ জানাই।’
আদালতের নির্দেশে মা ও ছেলেকে পুলিশের গাড়িতে করে আদালতে নেওয়া হয় বলে জানান সাঁথিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনিছুর রহমান। তিনি বলেন, আদালত দুজনের বক্তব্য শুনে তাঁদের বিরোধের সমাধান করে দেন। পরে মা ও ছেলেকে একসঙ্গে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়। এরপরও তাঁদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।