সংবিধান সংশোধন: রাষ্ট্রের সংজ্ঞায় বিচার বিভাগ থাকুক
· Prothom Alo
আমি তখন বরিশালের ম্যাজিস্ট্রেট, সময় ১৯৯৮ সাল। শাহবাগের বিসিএস প্রশাসন একাডেমির পাঁচ মাস মেয়াদি এক আবাসিক কোর্স করছি। সংবিধান পড়ানো হতো আমাদের। এ সময় নজরে এল আইনজীবী গাজী শামসুর রহমানের একটি বই। চক্ষু চড়কগাছ! বলে কী? বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রের ব্যাখ্যায় বিচার বিভাগ নেই! সেই শুরু। তারপরে কত বিজ্ঞজনের কাছে জানতে চেয়েছি, ব্যাপারটা কী? কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা পাইনি।
সম্প্রতি সংবিধান সংশোধনবিষয়ক বিশেষ কমিটির বৈঠক হলো দেশের জ্যেষ্ঠ সম্পাদক ও সাংবাদিকদের সঙ্গে। সাংবাদিকতার শিক্ষক হিসেবে আমন্ত্রিত হয়ে সে বৈঠকে একই প্রশ্ন করেছি। সদুত্তর পাইনি। সেই সূত্রেই কিছু কথা সবার বিবেচনার জন্য তুলে ধরছি।
Visit afrikasportnews.co.za for more information.
বাংলাদেশে আবার সংবিধান সংশোধনের কথা উঠেছে। কিন্তু একটা ছোট বিষয় প্রায়ই মনোযোগ পায় না। অনুচ্ছেদ ১৫২-এ ‘রাষ্ট্র’ বলতে কী বোঝায়, সে সম্পর্কে বলা আছে, রাষ্ট্র মানে সংসদ, সরকার আর সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ। বিচার বিভাগ বাদ।
এই বাদ পড়া তুচ্ছ নয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তিনটি অংশে চলে। সংসদ আইন তৈরি করে, সরকার তা বাস্তবায়ন করে আর বিচার বিভাগ আইন ব্যাখ্যা করে ও অন্য দুই অংশকে নিয়ন্ত্রণ করে। আমাদের সংবিধান এটা মানে। বিচার বিভাগের জন্য আলাদা অংশ আছে। বিচারকদের স্বাধীনতার কথা স্পষ্ট লেখা আছে। অনুচ্ছেদ ২২ বলে, রাষ্ট্র বিচার বিভাগকে নির্বাহী থেকে আলাদা রাখবে।
মাসদার হোসেন মামলার রায়েও বলা হয়েছে, বিচার বিভাগীয় চাকরি প্রজাতন্ত্রের চাকরি হলেও তা সাধারণ সরকারি চাকরির মতো নয়। আদালতও সরকারের কাজ পরীক্ষা করার সময় বিচার বিভাগকে রাষ্ট্রের অংশ হিসেবেই দেখে।
১৯৭২ সালে সংবিধান লেখকেরা গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও ক্ষমতা পৃথক্করণ চেয়েছিলেন। বাস্তবে সব সময় তা হয়নি। রাষ্ট্রের সংজ্ঞায় বিচার বিভাগ যোগ করলে সব সমস্যার সমাধান হবে না। কিন্তু একটা অপ্রয়োজনীয় নীরবতা শেষ হবে।
তবু রাষ্ট্রের সংজ্ঞায় বিচার বিভাগ নেই। অন্য দেশেও এমন লেখা পাওয়া যায়। কিন্তু আমাদের সংবিধানে পৃথক্করণ ও স্বাধীনতার কথা যখন এত জোরালো, তখন এই অনুপস্থিতি বেমানান। ‘রাষ্ট্র কী করবে’, এমন কথা বলার সময় বিচার বিভাগের উল্লেখ থাকে না। ফলে একধরনের অভ্যাস তৈরি হয়। আদালতকে সমান অংশীদার না দেখে প্রয়োজনমতো ব্যবহারের জায়গা হিসেবে দেখা হয়।
সংবিধান বা গণভোট বিতর্কের সমাধান কীভাবে হবেসম্প্রতিও এর উদাহরণ পাওয়া গেছে। অন্তর্বর্তী সরকার সুপ্রিম কোর্টের অধীনে একটি সচিবালয় গঠনের অধ্যাদেশ জারি করেছিল। মাসদার হোসেন মামলার চেতনায় অধস্তন আদালতের প্রশাসন যাতে সুপ্রিম কোর্টের হাতে থাকে। নতুন সরকার সেই অধ্যাদেশ বাতিল করেছে। প্রশাসনিক যুক্তি নিয়ে তর্ক করা যায়। কিন্তু যে ধারা বারবার দেখা যায়, তা হলো: বিচার বিভাগ যখন নিজের প্রশাসনিক স্বাধীনতা চায়, রাজনৈতিক ক্ষমতা তখন প্রায়ই তাকে ফিরিয়ে আনে। রাষ্ট্রের সংজ্ঞায় বিচার বিভাগ থাকলে মতভেদ বন্ধ হতো না। তবে স্বাধীনতাকে ঐচ্ছিক মনে করার সুযোগ কমে যেত।
একটা আপত্তি শোনা যায়। বিচার বিভাগকে অন্তর্ভুক্ত করলে ‘রাষ্ট্র বনাম অমুক’ মামলায় সমস্যা হবে। আদালত নিজে পক্ষ হয়ে যাবে। এই যুক্তি ঠিক নয়। ফৌজদারি মামলায় ‘রাষ্ট্র’ শব্দটি শুধু জনস্বার্থের প্রতীক। এর মানে সংসদ বা সব সরকারি সংস্থা মামলার পক্ষ নয়। আসল পক্ষ সরকার। ‘সরকার বনাম অমুক’ বলাই বেশি সঠিক। সংজ্ঞায় বিচার বিভাগ যোগ করলে বিচারক মামলার পক্ষ হয়ে যান না। আগের মতো প্রসঙ্গ অনুসারে ব্যতিক্রম রাখা যায়। আন্তর্জাতিক মামলাতেও সমস্যা নেই। বিদেশে বাংলাদেশকে এক রাষ্ট্র হিসেবেই দেখা হয়। ভেতরের ক্ষমতা ভাগ আমাদের নিজস্ব বিষয়।
বিচার বিভাগ সংস্কারে বিএনপির অবস্থান অসংগতিপূর্ণসদিচ্ছা থাকলে সংশোধনী খুব সহজই হতে পারে। অনুচ্ছেদ ১৫২-এ বিচার বিভাগ যোগ করে বলা যেতে পারে, রাষ্ট্র মানে সংসদ, সরকার, বিচার বিভাগ ও সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ। এক লাইন যোগ করা যায় যে, সাধারণ বিচারিক রায় শুধু এই কারণেই সরকারি সিদ্ধান্তের মতো চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। এতে বিচারকদের নিরপেক্ষ ভূমিকা অক্ষুণ্ন থাকে। এই পরিবর্তন অনুচ্ছেদ ২২ ও ষষ্ঠ ভাগের সঙ্গেও মিলে যায়।
এটা বড় কোনো পরিবর্তন নয়। এর ফলে নতুন সচিবালয় তৈরি হয় না, নিয়োগ পদ্ধতিও বদলায় না। শুধু একটা দীর্ঘদিনের পুরোনো নীরবতা কাটে। যে সংবিধান পৃথক্করণ ও স্বাধীনতার কথা বলে, সেখানে বিচার বিভাগকে বাদ রাখা আর ঠিক হবে বলে মনে হয় না।
বিচার বিভাগ পৃথক্করণের আসল কাজটাই হয়নিসংবিধানের শব্দ মানুষের চিন্তা গড়ে। এক ধারায় সব বদলাবে না। কিন্তু পাঠ্য যখন বিচার বিভাগকে বাইরে রাখে, তখন তার স্বাধীনতাকে ভিত্তি নয়, অনুগ্রহ হিসেবে দেখার সুযোগ বাড়ে। বাংলাদেশ এই অসম্পূর্ণতার দাম অনেক দিন দিয়েছে। এখন সংবিধান নিয়ে আলোচনা চলছে। এই ছোট ফাঁকটা বন্ধ করার সুযোগ আছে। অনুচ্ছেদ ১৫২-এ বিচার বিভাগ যোগ করা মানে স্বীকার করা যে সংবিধানে তিনটি পূর্ণ অংশই সমান। অনুচ্ছেদ ২২-এর নীতিকে আরও মজবুত করা। বিচার প্রশাসন রক্ষার ভবিষ্যৎ কাজকে সহজ করা।
১৯৭২ সালে সংবিধান লেখকেরা গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও ক্ষমতা পৃথক্করণ চেয়েছিলেন। বাস্তবে সব সময় তা হয়নি। রাষ্ট্রের সংজ্ঞায় বিচার বিভাগ যোগ করলে সব সমস্যার সমাধান হবে না। কিন্তু একটা অপ্রয়োজনীয় নীরবতা শেষ হবে। স্পষ্ট হবে যে রাষ্ট্র মানে প্রজাতন্ত্রের সব প্রতিষ্ঠান। দেশ যখন তার মৌলিক আইন নিয়ে ভাবছে, তখন এটি একটি সহজ, বাস্তব ও দরকারি পদক্ষেপ।
রিজওয়ান-উল-আলম সহযোগী অধ্যাপক, গণমাধ্যম, যোগাযোগ এবং সাংবাদিকতা বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
মতামত লেখকের নিজস্ব