চলনবিল এখন অচেনা, কেন এই অবস্থা, বিপদ কোথায়
· Prothom Alo
ভূগর্ভস্থ পানির সম্ভাবনা ‘খুব বেশি’ মাত্র ১ শতাংশ এলাকায়। ৭৭ শতাংশ এলাকায় সম্ভাবনা মাঝারি, ২২ শতাংশে কম।
ছোটবেলায় দেখা চলনবিলকে এখন আর চিনতে পারেন না মোহাম্মদ লিটন। দেশের এই বিশাল জলাভূমির ভেতরের গ্রাম বড়িয়ায় তাঁর বাড়ি। গ্রামটি নাটোরের সিংড়া উপজেলার চৌগ্রাম ইউনিয়নে। আশ্বিন মাসে তো বটেই, অগ্রহায়ণ পর্যন্ত গ্রামের আশপাশে পানি থাকত, এখন এই সময়ে প্রায় পানিশূন্য হয়ে পড়ে। লিটনের ভাষায়, ‘ছোটবেলায় চলনবিল আমাদের কাছে ছিল সমুদ্রের মতো। এখন পানি কম, মাছ তো কমছেই।’
Visit saltysenoritaaz.com for more information.
বছরের বড় একটা সময় পানি ধরে রাখা চলনবিলের ভূগর্ভস্থ পানির সম্ভাবনাও কম। এ অঞ্চলের মাত্র ১ শতাংশ এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির সম্ভাবনা ‘খুব বেশি’। চলতি মাসে প্রকাশিত এক গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ডিসকভার জিওসায়েন্স সাময়িকীতে। এতে কাজ করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের গবেষকেরা।
রাজশাহী বিভাগের নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলার বিস্তীর্ণ নিম্নভূমি নিয়ে চলনবিল গঠিত। বর্ষায় বিলের বিস্তৃতি বাড়ে। শুকনা মৌসুমে অনেক জায়গায় পানি কমে গিয়ে কৃষিজমি জেগে ওঠে। গবেষণার আওতাভুক্ত এলাকায় নাটোরের সিংড়া ও গুরুদাসপুর, পাবনার চাটমোহর ও ভাঙ্গুড়া এবং সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, রায়গঞ্জ ও উল্লাপাড়া উপজেলা রয়েছে।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ডিসকভার জিওসায়েন্স সাময়িকীতে। এতে কাজ করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের গবেষকেরা।
১৭টি বিষয় বিশ্লেষণ
ভূগর্ভস্থ পানির সম্ভাব্য এলাকা চিহ্নিত করতে গবেষকেরা স্যাটেলাইটের ছবি, ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা (জিআইএস) এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও ভূতাত্ত্বিক উপাত্ত একত্র করেছেন। তাঁরা বৃষ্টিপাত, মাটির ধরন ও পানি শোষণক্ষমতা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর, জলাধারের গভীরতা, ভূমির উচ্চতা ও ঢাল, নদী থেকে দূরত্ব, ভূমির ব্যবহার, উদ্ভিদ ও পানির বিস্তার, ভূপ্রকৃতি, নদী-নালার ঘনত্বসহ ১৭টি বিষয় বিশ্লেষণ করেছেন। ১৯৯০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত স্যাটেলাইটের ছবিতে উদ্ভিদের অবস্থার পরিবর্তনও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
ভূমির উচ্চতা ও ঢালের তথ্য নেওয়া হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা থেকে। ভূমির ব্যবহার, উদ্ভিদ ও পানির বিস্তার বোঝার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে ল্যান্ডস্যাট-৮ স্যাটেলাইটের ছবি। বৃষ্টিপাতের তথ্য এসেছে ক্লাইমেট রিসার্চ ইউনিট থেকে। মাটির তথ্য বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ও জলাধারের গভীরতার তথ্য নেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছ থেকে।
সম্ভাবনা বেশি, মাঝারি ও কম
গবেষণায় ৫ হাজার ৯৭ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে ৬৫ বর্গকিলোমিটারকে ভূগর্ভস্থ পানির ‘খুব বেশি’ সম্ভাবনার শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। ৩ হাজার ৯৩৩ বর্গকিলোমিটার বা ৭৭ শতাংশ এলাকায় সম্ভাবনা মাঝারি। আর ১ হাজার ৯৯ বর্গকিলোমিটার বা ২২ শতাংশ এলাকায় সম্ভাবনা কম।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন গবেষণা দলের সদস্য ওয়াহিদুল আলম। তিনি বলেন, ‘ভালো বা বেশি সম্ভাবনার এলাকায় বর্ষা মৌসুমে সর্বনিম্ন ৮ মিটার গভীরে পানি পাওয়া যায়। এ মৌসুমে মাঝারি ও কম সম্ভাবনার এলাকায় যথাক্রমে সর্বনিম্ন ১০ ও ১৫ মিটার নিচে পানি পাওয়া যায়। শুকনা মৌসুমে ভালো সম্ভাবনার এলাকায় ২০ মিটারে পানি মেলে। মাঝারি ও কম সম্ভাবনার এলাকায় তা যথাক্রমে ২৫ ও ৪০ মিটার গভীরে।’
গবেষকেরা বলছেন, চলনবিলের ভূগর্ভস্থ পানির সম্ভাবনা কম হওয়ার পেছনে শুধু প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য দায়ী নয়। বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া, ব্যাপক সেচের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া এবং বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণও এর কারণ।
চলনবিলে কেন এ অবস্থা
গবেষকদের হিসাবে, এলাকার ৪৪ শতাংশে কাদামাটি, ৩৩ শতাংশে এঁটেল দোআঁশ এবং ১৫ শতাংশে পলিমাটি রয়েছে। মোটা ও মাঝারি বালুমাটি আছে ৭ শতাংশের কম এলাকায়। কাদামাটি পানিকে মাটির গভীরে যেতে বাধা দিতে পারে। কিছু বালুমাটির স্তর দিয়ে পানি তুলনামূলক সহজে নিচে যেতে পারে।
চলনবিলের ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণে কাদামাটির স্তর বড় বাধা—এমনটাই বলেন ওয়াহিদুল আলম। তবে গবেষকেরা বলছেন, চলনবিলের ভূগর্ভস্থ পানির সম্ভাবনা কম হওয়ার পেছনে শুধু প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য দায়ী নয়। বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া, ব্যাপক সেচের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া এবং বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণও এর কারণ।
গবেষণার প্রধান অধ্যাপক চৌধুরী সারোয়ার জাহান বলেন, চলনবিলের একদিকে পদ্মা, আরেক দিকে যমুনা নদী। এর মধ্যে পদ্মার প্রবাহ অনেকটাই কমে গেছে। যমুনার প্রবাহিত পানির পরিমাণও কমছে। চলনবিলের ভূগর্ভস্থ পানি পদ্মা টেনে নিচ্ছে। আর শুষ্ক মৌসুমে কৃষিতে ব্যাপক হারে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন হচ্ছে। এই দুইয়ে মিলে এখানকার ভূগর্ভস্থ পানি কমছে। তাঁর মতে, জলাভূমিতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া পরিবেশগত বিপর্যয়ের লক্ষণ।
সেচের জমি বেড়েছে, কমেছে বৃষ্টি
চলনবিলে বোরো ধান চাষে শুষ্ক মৌসুমে সেচের প্রয়োজন হয়। গবেষণায় ২০টি স্থায়ী পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১৫টিতে বর্ষায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বাড়ার স্বাভাবিক প্রবণতা থাকলেও পরে তা অনেকটাই কমে গেছে।
দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ১৬ জেলা নিয়ে ১৯৮৫ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত করা আরেক গবেষণায় দেখা যায়, প্রধান ফসলের সেচ-আওতাধীন জমির পরিমাণ ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৬৭৫ হেক্টর থেকে বেড়ে ২৪ লাখ ৪৬ হাজার ৪২৮ হেক্টর হয়েছিল।
পানির স্তর দীর্ঘ মেয়াদে নামতে থাকলে সেচের জন্য আরও গভীর থেকে পানি তুলতে হতে পারে। এতে পাম্প চালানোর খরচ বাড়ার ঝুঁকি আছে। নদী ও জলাভূমিতে শুকনা মৌসুমে পানিপ্রবাহ কমলে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর আবাসেও প্রভাব পড়তে পারে। তবে এসব প্রভাব এই গবেষণায় সরাসরি মাপা হয়নি।
বৃষ্টি কমে যাওয়া এবং কৃষি সেচে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার—দুটিই চলনবিলের পানির সংকটের পেছনে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মতিন উদ্দিন খান।
নাটোর জেলার বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ক্ষুদ্র সেচ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯–২০ সালের বোরো মৌসুমে বিদ্যুৎ ও ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র ছিল মোট ৩৬ হাজার ৫০৫টি। ২০২৫–২৬ সালে এর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪৪ হাজার ২২৯। ক্ষুদ্র সেচ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, দিন দিন সেচের পরিমাণ বাড়ছে। এর প্রভাব চলনবিলের ভূগর্ভস্থ পানিতে পড়া অস্বাভাবিক নয়।
চলনবিল এলাকায় বৃষ্টি কমেছে। তিনটি জেলাতেই এ প্রবণতা দেখা গেছে। ১৯৯০ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত তিন জেলায় বছরে গড় বৃষ্টি ছিল ১ হাজার ৫৯৫ মিলিমিটার। ২০২৪ সালে তা কমে হয়েছে ১ হাজার ৩৭০ মিলিমিটার।
বৃষ্টি কমে যাওয়া এবং কৃষি সেচে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার—দুটিই চলনবিলের পানির সংকটের পেছনে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মতিন উদ্দিন খান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও এ গবেষণায় দেখানো হয়েছে, চলনবিলের মতো জলাভূমিতেও ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। সেচে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার আরও বাড়াতে হবে।