লাখ টাকায় শুরু, ৫ বছরে আড়াই কোটি টাকার কোটপিনের ব্যবসা খালেদা বেগমের

· Prothom Alo

পাঁচ বন্ধু মিলে দেড় দশক আগে শুরু করেছিলেন সম্মাননা স্মারক ক্রেস্ট তৈরির ব্যবসা। ২০২০ সালে করোনা মহামারির ধাক্কায় অন্য সব ব্যবসার মতো বড় ধরনের লোকসানে পড়ে পাঁচ বন্ধুর ক্রেস্টের ব্যবসা। লোকসানের ধাক্কা সইতে না পেরে ব্যবসা ছেড়ে দেন অংশীজনদের কয়েকজন। কিন্তু হাল ছাড়েননি নারী উদ্যোক্তা খালেদা বেগম লুনা। ধাক্কা সামলাতে কিছুটা বিরতি নেন। এরপর পাল্টে ফেলেন ব্যবসার ধরন। শুরু করেন কোটপিন তৈরির নতুন ব্যবসা।

মাত্র লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করা খালেদা বেগমের ছোট সেই উদ্যোগটি এখন বছরে ব্যবসা করে প্রায় আড়াই কোটি টাকা। কোটপিন ছাড়াও মেটাল ব্যাজ, অ্যাওয়ার্ড, ট্রফি, ক্রেস্ট প্রভৃতি পণ্যও তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি। এরই মধ্যে বেশ সুনামও কুড়িয়েছে। করোনায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হওয়া প্রতিষ্ঠানটিতে এখন কর্মসংস্থান হয়েছে ২৫ জন মানুষের।

Visit catcross.biz for more information.

‘কোট পিন বিডি’র কোটপিন

সম্প্রতি রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে ‘কোট পিন বিডি’ নামের প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে কথা হয় স্বত্বাধিকারী খালেদা বেগমের সঙ্গে। এ সময় তিনি শোনান তাঁর উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা এবং ব্যবসার নানা চ্যালেঞ্জ ও সফলতার কথা। খালেদা বেগমের জন্ম পটুয়াখালীর কলাপাড়ায়। সেখানে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পড়াশোনা শেষে ২০০৫ সালে ভর্তি হন বরিশাল সরকারি বিএম কলেজে মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগে। তৃতীয় বর্ষে থাকাকালে তাঁর বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের পর খালেদা ঢাকায় চলে আসেন; তবে পড়ালেখা বন্ধ করেননি। ঢাকায় থেকে বরিশাল গিয়ে তাঁর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। পরে ঢাকার বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেন।

অতিরিক্ত মুনাফার চেয়ে গ্রাহকের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সুসম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দিই আমরা। তাই বছরজুড়েই আমরা ক্রেতাদের সঙ্গে ভালো ব্যবসা করছি।—খালেদা বেগম, স্বত্বাধিকারী, কোট পিন বিডি

ব্যবসার শুরুর কথা

২০১১ সাল। খালেদা বেগমের স্বামী এস এম আবদুস শাকুর এবং তাঁর চার বন্ধু মিলে রাজধানীর কাঁটাবনে শুরু করেন ক্রেস্ট তৈরির ব্যবসা। শুরুতে পুঁজি ছিল এক লাখ টাকা। শুরুতে বিভিন্ন ধরনের ট্রফি, ক্রেস্ট, মগ ও চাবির রিং বিক্রি করতেন তাঁরা। একপর্যায়ে খালেদা বেগমও সেই ব্যবসায় যুক্ত হন।

শুরুর প্রথম কয়েক বছর সেই ব্যবসা মোটামুটি ভালো চলেছিল। কিন্তু বড় ধাক্কা লাগে ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময়। সে সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি–বেসরকারি সব ধরনের অনুষ্ঠান বলতে গেলে সম্পূর্ণ বন্ধ। তাতে ট্রফি ও ক্রেস্টের চাহিদা একেবারে শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। ফলে মারাত্মক আর্থিক সংকটে পড়ে ব্যবসাটি। আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাড়তে থাকে ঋণের বোঝা। একপর্যায়ে অংশীদারেরা ব্যবসা ছেড়ে দেন। কিন্তু কর্মীদের কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখার চিন্তা থেকে যেকোনো উপায়ে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন খালেদা ও তাঁর স্বামী। ব্যবসার ধরন পাল্টে নতুন করে কী করা যায় ভাবতে থাকেন স্বামী–স্ত্রী দুজন মিলে। তত দিনে করোনার প্রথম ধাক্কাও কিছুটা কমে এসেছে। এর মধ্যে দুজনে মিলে ধাতব মুদ্রা (কয়েন) দিয়ে বিভিন্ন স্মারক পণ্য তৈরির পরিকল্পনা করেন। শুরুতে ফেসবুকে ‘কোট পিন বিডি’ নামে একটি পেজ খুলে ব্যবসা শুরু করেন। পরে সেটিকেই প্রতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়। খালেদার স্বামী আবদুস শাকুর চাকরি করেন। তাই ব্যবসা দেখভাল করেন মূলত খালেদা বেগম নিজেই।

খালেদা বেগম বলেন, ‘করোনার পর আমরা খোঁজখবর নিয়ে দেখলাম ধাতব কয়েন থেকে কোটপিন, ব্যাজসহ নানা পণ্য তৈরি করা যায়। করপোরেট প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা ও সাধারণ গ্রাহক পর্যায়েও এসব পণ্যের চাহিদা আছে। কিন্তু বাজারে ভালো পণ্য তৈরির প্রতিষ্ঠান কম। তাই কোটপিন তৈরির ব্যবসা শুরু করি আমরা। শুরুর দিকে ছোট ছোট ক্রয়াদেশ (অর্ডার) আসতে শুরু করে। তবে প্রথম বড় ক্রয়াদেশ আসে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। ওই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের শতবর্ষ পালনের অনুষ্ঠানে কোটপিনসহ সুভ্যেনির বানিয়ে দেন তাঁরা। ৫০ লাখ টাকার ওই কাজটির পর তাঁদের আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

শোরুমে হরেক রকমের কোটপিন

যেসব পণ্য তৈরি করেন

বর্তমানে খালেদার প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সরকারি–বেসরকারি সংস্থার জন্য হ্যাঙ্গিং ব্যাজ, শোল্ডার ব্যাজ তৈরি করে। পাশাপাশি সেট আকারে কাস্টমাইজড কোটপিন, টাইপিন, কাফলিং ও নেমপ্লেট তৈরির কাজও করেন তাঁরা। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনের পণ্য সরবরাহ করে ‘কোট পিন বিডি’। এ ছাড়া রয়েছে ডায়েরি, নোটবুক, ওয়ালেট, কাস্টমাইজড পাওয়ার ব্যাংক, পেনড্রাইভ, পানির বোতল ও পেপারওয়েটের ব্যবসাও। এসব পণ্যের বেশির ভাগই ‘কোট পিন বিডি’ নিজেরা বানায়; অল্প কিছু পণ্য অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে বানিয়ে সরবরাহ করা হয়। দেশের ক্রীড়াঙ্গনেও কোট পিন বিডির ব্যবসায়িক উপস্থিতি রয়েছে। স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের বড় প্রতিযোগিতাগুলোর মেডেল, ট্রফি প্রভৃতি তৈরি করে দেয় প্রতিষ্ঠানটি। মেটালের পাশাপাশি কাঠের তৈরি ক্রেস্ট, ফটোফ্রেম, চাবির রিং, টিস্যু হোল্ডার, কলমদানি, কার্ড হোল্ডারের মতো পণ্য বানান খালেদা।

এ ছাড়া বহুজাতিক সংস্থা ও দূতাবাসের জন্য পণ্য তৈরি করে কোট পিন বিডি। অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাধ্যমে নিউজিল্যান্ড, হংকং, যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশে নিয়মিত কোট পিন বিডির পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। খালেদা বেগম বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা প্রায় তিন হাজারের বেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করেছি। প্রতি মাসে গড়ে ২০ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করি আমরা।’

চীন থেকেও আসে তৈরি পণ্য

খালেদা বেগম বলেন, ‘যেকোনো পণ্যের নকশা আমরাই করি। কোটপিন বা এ ধরনের স্মারক পণ্য আকর্ষণীয় হয় মূলত নিখুঁত মসৃণতার (ফিনিশিং) কারণে। তাই গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী সরাসরি চীন থেকেও নানা পণ্য বানিয়ে এনে দিই। আবার গ্রাহকের অবস্থা বুঝে আমাদের নিজস্ব কারখানাতেও পণ্য বানাই। এলিফ্যান্ট রোডেই রয়েছে আমাদের একটি ছোট কারখানা। কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে নিজেদের নকশা অনুযায়ী পণ্য বানাই।’

খালেদা বেগম আরও বলেন, ‘অনলাইনে নিয়মিত পণ্য বিক্রি করে কোট পিন বিডি। গ্রাহক এক পিস পণ্য চাইলেও সেটি বিক্রি করা হয়। আবার বেশি সংখ্যায় পণ্য কিনতে চাইলে সেই সক্ষমতাও রয়েছে। অতিরিক্ত মুনাফার চেয়ে গ্রাহকের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সুসম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দিই আমরা। তাই বছরজুড়েই আমরা ক্রেতাদের সঙ্গে ভালো ব্যবসা করছি।’

এই ধরনের ব্যবসায় কিছু চ্যালেঞ্জের কথাও জানান খালেদা বেগম। তিনি বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি, ডলার ও চীনের মুদ্রার দর বৃদ্ধিও আমাদের ব্যবসার খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। তবে গ্রাহক ধরে রাখতে পণ্যের দাম খুব একটা না বাড়িয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছি আমরা। ভবিষ্যতে মেটাল পণ্য তৈরির বড় একটি কারখানা স্থাপনের স্বপ্নের কথাও জানালেন এই উদ্যোক্তা। পাশাপাশি ঢাকায় নিজ প্রতিষ্ঠানের নামে কয়েকটি বিক্রয়কেন্দ্র চালু করতে চান তিনি।

Read full story at source