ভারতে বিক্ষোভে ‘গোদি মিডিয়ার’ সাংবাদিকেরা কেন তোপের মুখে
· Prothom Alo

শনিবার ককরোচ জনতা পার্টি (সিজিপি) ও বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলোর ডাকা ভোট কারচুপিবিরোধী বিক্ষোভ ঠেকাতে সম্ভাব্য সব পদক্ষেপ নেয় নরেন্দ্র মোদি সরকার। বিক্ষোভকারীদের আটক করার পাশাপাশি আটক করা হয় বেশ কয়েকজন সাংবাদিককেও। কয়েকটি ঘটনায় পুলিশ সাংবাদিকদের মারধরও করে।
সাংবাদিকেরা পেশাগত দায়িত্ব পালন করছিলেন। তা সত্ত্বেও কেন মোদি সরকার তাঁদের বিরুদ্ধে এভাবে ব্যাপক ধরপাকড় চালাল, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতো কিছু পরিস্থিতিগত প্রমাণ রয়েছে। যেমন, পুলিশের অভিযানে সরকারের সমর্থক কোনো সংবাদমাধ্যমকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি।
Visit forestarrow.help for more information.
অন্যদিকে, বিক্ষোভকারীদের হাতে কয়েকটি ঘটনায় হেনস্তার শিকার হয়েছেন ‘গোদি মিডিয়া’র সাংবাদিকেরা। ভারতে বিজেপি সরকারপন্থী সংবাদমাধ্যমকে ব্যঙ্গ করে ‘গোদি মিডিয়া’ বলা হয়।
এ ধরনের ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। জুলাইয়ে মোদির শিক্ষামন্ত্রীকে অপসারণের দাবিতে তরুণদের বিক্ষোভের সময়ও ‘গোদি মিডিয়া’র সাংবাদিকদের হেনস্তা করা হয়েছিল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে সরকারপন্থী টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকেরা বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে নিজেদের পরিচয় আড়াল করতে শুরু করেন। তাঁরা এমনকি লোগোযুক্ত মাইক্রোফোনও ব্যবহার করছিলেন না।
ভারতের সংবাদমাধ্যম কীভাবে ‘গোদি মিডিয়া’ ও স্বাধীন সংবাদমাধ্যম—এই দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ল? আর সরকারপন্থী সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে মানুষের এত ক্ষোভ কেন?
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনরত এক বিক্ষোভকারীকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছেন পুলিশের এক সদস্য। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতেমোদির সংবাদমাধ্যম
এ পরিস্থিতি বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সংযুক্ত প্রগতিশীল মোর্চা (ইউপিএ) সরকারের শেষ বছরগুলোয়। ২০১১ সাল থেকে সংবাদমাধ্যমের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে সেই সরকার।
এর জন্য অনেকাংশে দায়ী ছিল সরকার নিজেই। কেন্দ্রীয়ভাবে শক্ত নিয়ন্ত্রণ না থাকায় মন্ত্রী ও আমলারা বিভিন্ন শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছিলেন। সংবাদমাধ্যমও সেই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সুযোগ নিতে পিছপা হয়নি। একই সময়ে মধ্যবিত্তের নেতৃত্বে কিছু বিক্ষোভ গড়ে ওঠে। সংবাদমাধ্যম এসব আন্দোলনের খবর গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করায় সরকার আরও চাপে পড়ে।
২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময় পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে ক্ষমতাসীন মনমোহন সিং সরকারের পরাজয় অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে যায়। নির্বাচনে হেরে ক্ষমতা ছাড়ে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার। প্রধানমন্ত্রী হন নরেন্দ্র মোদি।
যে পরিস্থিতি তাঁকে ক্ষমতায় এনেছিল, তা থেকে মোদি একটি বড় শিক্ষা নেন। পুরস্কার ও চাপ—দুই কৌশল ব্যবহার করে তিনি সরকারপন্থী সংবাদমাধ্যমের একটি শক্তিশালী বলয় গড়ে তোলেন।
মোদির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজন ধনকুবের বড় বড় সংবাদমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ নেন। অন্যদিকে, যেসব সংবাদমাধ্যমের মালিকদের মোদির বিরোধী হিসেবে দেখা হতো, তাঁদের অনেককে বিভিন্নভাবে সরে যেতে বাধ্য করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার চাপও এতে ভূমিকা রেখেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই কৌশল সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও ভারতের গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর ছিল। তবে মোদির রাজনৈতিক সাফল্যের ক্ষেত্রে এটি কার্যকর হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর সাফল্যের পেছনে সংবাদমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ অন্যতম বড় কারণ।
ককরোচরা মোদির ‘তিলে তিলে’ গড়া ভাবমূর্তি চুরমার করে দিয়েছেজিওর প্রভাব
তবে মোদির জন্য পরিস্থিতি বদলে দেয় সস্তা ইন্টারনেটের বিস্তার। ভারতে রিলায়েন্স জিওর সাশ্রয়ী ইন্টারনেট–সেবা চালুর পর অনলাইনে সংবাদ ও অন্যান্য কনটেন্ট দেখার সুযোগ অনেক বেড়ে যায়। এর ফলে ছোট ও দ্রুতগতিতে কাজ করা সংবাদমাধ্যম এবং স্বাধীন কনটেন্ট নির্মাতাদের উত্থান ঘটে। তাঁদের অনেকেই সরকারপন্থী সংবাদমাধ্যমের বলয়ের বাইরে ছিলেন।
এটি মোদি সরকারের জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীনদের প্রশ্নবিদ্ধ করে এমন সাংবাদিকতার অভাব বোধ করছিলেন ভারতের অনেক মানুষ। স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ও কনটেন্ট নির্মাতাদের অনুষ্ঠান ও ভিডিও তাঁদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ইউটিউবের তথ্যও ইঙ্গিত করে, ভারতের শীর্ষ রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের মধ্যে সরকারপন্থী অ্যাকাউন্টের সংখ্যা খুবই কম।
গত সপ্তাহে দিল্লির রাস্তায় ‘গোদি মিডিয়া’র সাংবাদিকদের হেনস্তার পেছনে এ পরিস্থিতির ভূমিকা রয়েছে। বিক্ষোভকারীরা তাঁদের স্বাধীন সাংবাদিক হিসেবে দেখেননি; বরং সরকারের মুখপাত্র হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তাঁদের ক্ষোভের লক্ষ্য সেই সরকার, যে সরকার সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করতে গিয়ে তাঁদের পুলিশের ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর সহিংসতার মুখে ঠেলে দিয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ।
‘গোদি মিডিয়া’র প্রভাব ক্রমেই কমছে। অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজেপিবিরোধী কনটেন্টের উপস্থিতি বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে আগামী দিনগুলোয় জনমত ও রাজনৈতিক বয়ান নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে মোদি সরকারকে আরও বেশি জায়গা ছেড়ে দিতে হতে পারে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে কিছু কনটেন্ট নির্মাতার কারণে। তাঁরা ‘গোদি মিডিয়া’র সাংবাদিকদের হেনস্তার দৃশ্য ধারণ করে অনলাইনে ছড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁদের ধারণা, মোদিবিরোধী কনটেন্ট দেখতে আগ্রহী লাখ লাখ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর কাছে এসব ভিডিও জনপ্রিয় হবে।
মোদি একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিক হিসেবে সম্ভবত বুঝতে পারছেন, নিজেদের রাজনৈতিক বার্তা ছড়িয়ে দিতে বড় সংবাদমাধ্যমকে কাজে লাগানোর কৌশল আগের মতো ফল দিচ্ছে না। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা উল্টো ফলও দিচ্ছে।
জুলাইয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের পর মোদি নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় হন। তিনি সাধারণ মানুষের তৈরি ভিডিওর মতো দেখতে কিছু সেলফি ভিডিও প্রকাশ করেন। মন্ত্রীদেরও ইনস্টাগ্রামে আরও বেশি ভিডিও প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়।
জ্ঞানেশ কুমার নিয়ে চাপে নরেন্দ্র মোদি সরকারসামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেন চ্যালেঞ্জের মুখে মোদি?
এ পরিস্থিতি মোদির জন্য রাজনৈতিক বার্তা প্রচারের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ধাক্কা। এত দিন বড় সংবাদমাধ্যম তাঁকে এমন একটি প্রচারমাধ্যমের সুবিধা দিত, যেখানে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীরা সমানভাবে প্রতিযোগিতা করতে পারতেন না।
কিন্তু ইনস্টাগ্রাম তুলনামূলকভাবে সবার জন্য উন্মুক্ত একটি জায়গা। সেখানে সরকারের কাঠামোগত সুবিধা কম। কেন্দ্রীয় সরকারের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ বা সরিয়ে দেওয়ার ব্যাপক ক্ষমতা থাকলেও মূলধারার সংবাদমাধ্যমের পক্ষপাতিত্বের কারণে ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে বিজেপি আগের মতো সুবিধা পায় না।
এ কারণেই সরকারপন্থী অনেক ভাষ্যকার মোদিকে ইনস্টাগ্রাম নিষিদ্ধ করার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁদের প্রস্তাব, এর বদলে এমন ভারতীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম চালু করা হোক, যেগুলো দিল্লি থেকে সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি যেভাবে তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে, এই কৌশলও অনেকটা সে রকম।
এমন ব্যবস্থা চালু হলে মোদি আবারও তথ্যপ্রবাহের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন এবং মূলধারার সংবাদমাধ্যমের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নিজের দলের পক্ষে সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরি করতে পারবেন—এমনটাই মনে করছেন এসব ভাষ্যকার।
জ্ঞানেশেই কি গণেশ ওলটাবে মোদির?তবে বিজেপির জন্য সমস্যা হলো, ভারতে এখনো এমন কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নেই, যা কার্যকারিতার দিক থেকে মেটা বা এক্সের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারে। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভারতীয় বাজার থেকে নিষিদ্ধ করার মতো কূটনৈতিক শক্তি মোদি সরকারের এখন আছে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এখানে একটি পরিহাসও আছে। ভারতের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইনস্টাগ্রামের গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ার পেছনে ভূরাজনীতিরও ভূমিকা রয়েছে। ২০২০-২১ সালে ভারত-চীন সীমান্তে উত্তেজনার পর মোদি সরকার চীনের স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও তৈরির প্ল্যাটফর্ম টিকটক নিষিদ্ধ করে। এর ফলে ইনস্টাগ্রামের মতো অন্য প্ল্যাটফর্মগুলোর গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
টিকটক নিষিদ্ধ করে মোদি সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছিল, এখন সেই সিদ্ধান্তের কারণে বিকল্প প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সরকারের হাতে বিকল্প খুব বেশি নেই।
‘গোদি মিডিয়া’র প্রভাব ক্রমেই কমছে। অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজেপিবিরোধী কনটেন্টের উপস্থিতি বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে আগামী দিনগুলোয় জনমত ও রাজনৈতিক বয়ান নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে মোদি সরকারকে আরও বেশি জায়গা ছেড়ে দিতে হতে পারে।
শোয়েব দানিয়াল ভারতীয় সংবাদমাধ্যম স্ক্রল.ইন-এর কর্মী।
স্ক্রল.ইন থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুদিত।