ব্যভিচার প্রতিরোধে নবীজির ৭ নির্দেশনা

· Prothom Alo

ব্যভিচার শুধু ব্যক্তিগত পাপ নয়; এর ক্ষত পৌঁছে যায় পরিবার, সমাজ ও পরবর্তী প্রজন্মে। একটি অবৈধ সম্পর্ক ভেঙে দিতে পারে একটি পরিবার, নষ্ট করতে পারে পারস্পরিক বিশ্বাস এবং তৈরি করতে পারে সামাজিক অস্থিরতা।

তাই ব্যভিচার প্রতিরোধ শুধু অপরাধ দমনের বিষয় নয়; এটি নৈতিকতা ও পারিবারিক স্থিতি রক্ষারও প্রশ্ন।

Visit sports24.club for more information.

ইসলামের অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, ব্যভিচার সংঘটিত হওয়ার পর শুধু শাস্তির কথা বলা হয়নি; বরং মানুষ যে পথ ধরে ধীরে ধীরে এ অপরাধের দিকে এগিয়ে যায়, সেই পথও বন্ধ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

মানুষের অন্তর, দৃষ্টি, পোশাক, কথাবার্তা, নারী-পুরুষের সম্পর্ক এবং বিবাহব্যবস্থাকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নৈতিক কাঠামোর মধ্যে আনা হয়েছে। নবীজির নির্দেশনায় তাই ব্যভিচার প্রতিরোধের একটি পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা পাওয়া যায়।

১. তাকওয়া: প্রতিরোধের প্রথম প্রাচীর

রাসুল (সা.) এমন মানুষ তৈরি করতে চেয়েছেন, যে শুধু মানুষের চোখকে ভয় করবে না; বরং নির্জনেও আল্লাহকে ভয় করবে।

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা না দেখেও তাদের প্রতিপালককে ভয় করে, তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার’ (সুরা মুলক, আয়াত: ১২)

ইতিহাসবিদ ডব্লিউ. মন্টগোমারি ওয়াট উল্লেখ করেছেন যে শাস্তির ভয় ও পুরস্কারের আশা ব্যক্তিকে ভেতর থেকে নৈতিক নিয়ন্ত্রণে রাখে। (ডব্লিউ. মন্টগোমারি ওয়াট, মুহাম্মদ: প্রফেট অ্যান্ড স্টেটসম্যান, পৃষ্ঠা ৫৩, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, অক্সফোর্ড, ১৯৬১)

ব্যভিচারের অনেক পথের শুরু একটি দৃষ্টি থেকে। তাই ইসলাম অপরাধের শেষ পর্যায়ে গিয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি; শুরুতেই দৃষ্টিকে সংযত করার নির্দেশ দিয়েছে।

২. দৃষ্টি সংযত রাখা

ব্যভিচারের অনেক পথের শুরু একটি দৃষ্টি থেকে। তাই ইসলাম অপরাধের শেষ পর্যায়ে গিয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি; শুরুতেই দৃষ্টিকে সংযত করার নির্দেশ দিয়েছে।

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘মুমিন পুরুষদের বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।’ (সুরা নুর, আয়াত: ৩০)

পরের আয়াতেই মুমিন নারীদেরও দৃষ্টি সংযত ও লজ্জাস্থান হেফাজতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। (সুরা নুর, আয়াত: ৩১)

রাসুল (সা.) চোখ, কান, জিব, হাত ও পায়ের ব্যভিচার থেকেও সতর্ক করেছেন। কেননা, এসবরে মধ্য দিয়েই অন্তরে কামনা তৈরি হয় এবং লজ্জাস্থান তা বাস্তবায়ন করে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৫৮)

অর্থাৎ পবিত্রতা রক্ষার শিক্ষা শুরু হয় চোখ, কান, জিব ও অন্তর থেকেই।

পাপ আসলে কী, পাপের ক্ষতি কী, কীভাবে বুঝব কোনটা পাপ

৩. পর্দা ও শালীনতা

ইসলাম সামাজিক শালীনতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। নারী-পুরুষ উভয়ের পোশাক, আচরণ ও মেলামেশায় সংযমের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তারা যেন তাদের ওপর তাদের চাদরের কিছু অংশ টেনে দেয়’ (সুরা আহজাব, আয়াত: ৫৯)

মুমিন নারীদের দৃষ্টি সংযত রাখা, লজ্জাস্থান হেফাজত করা এবং সৌন্দর্য প্রকাশে সংযমের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। (সুরা নুর, আয়াত: ৩১)

এটি শুধু পোশাকের বিধান নয়; বরং একটি শালীন সামাজিক পরিবেশ তৈরির নির্দেশনা।

৪. নির্জনতার দরজা বন্ধ করা

নারী-পুরুষের নির্জন অবস্থান ব্যভিচারের সম্ভাব্য পরিবেশ তৈরি করতে পারে। তাই রাসুল (সা.) এই পথও বন্ধ করে দিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে অবস্থান না করে, যতক্ষণ না তার সঙ্গে কোনো মাহরাম (যাকে বিয়ে নিষিদ্ধ) থাকে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২৩৩)

অন্য হাদিসে এসেছে, কোনো পুরুষ যখন কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে থাকে, তখন তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২১৬৫)

ইসলামের নির্দেশনা হলো, অপরাধ ঘটার অপেক্ষা না করে অপরাধের অনুকূল পরিবেশও নিয়ন্ত্রণ করা।

সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৬৬হে যুবসমাজ, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি বিবাহের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিবাহ করে। কারণ, তা দৃষ্টিকে অধিক সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে হেফাজত করে। আর যে ব্যক্তি বিবাহের সামর্থ্য রাখে না, সে যেন রোজা রাখে।

৫. বিবাহকে সহজ করা

মানুষের স্বাভাবিক যৌন চাহিদার জন্য বৈধ ও মর্যাদাপূর্ণ পথ তৈরি করেছে বিবাহ। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘হে যুবসমাজ, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি বিবাহের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিবাহ করে। কারণ, তা দৃষ্টিকে অধিক সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে হেফাজত করে। আর যে ব্যক্তি বিবাহের সামর্থ্য রাখে না, সে যেন রোজা রাখে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৬৬)

বিবাহকে সহজ করার প্রতিও নবীজি (সা.) উৎসাহ দিয়েছেন। এক সাহাবির সামর্থ্য কম থাকলে লোহার আংটির সমপরিমাণ মহর দিয়েও বিবাহের ব্যবস্থা করার কথা এসেছে। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২১১১)

নামাজ: গোপন পাপ থেকে মুক্তির প্রধান উপায়

৬. ধমক নয়, বিবেক জাগানো

ব্যভিচার প্রতিরোধে নবীজির একটি অনন্য পদ্ধতি দেখা যায় এক যুবকের ঘটনায়। এক যুবক তাঁর কাছে ব্যভিচারের অনুমতি চেয়েছিল। সাহাবিরা এতে ক্ষুব্ধ হলেও রাসুল (সা.) তাকে অপমান করেননি। কাছে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কি এটি তোমার মায়ের জন্য পছন্দ করবে?’ যুবক বলল, ‘না।’

নবীজি (সা.) বললেন, ‘অন্য মানুষও তাদের মায়েদের জন্য এটি পছন্দ করবে না।’ এরপর কন্যা, বোন ও চাচির প্রসঙ্গ তুলেও একই উত্তর পেলেন। তারপর তাঁর বুকে হাত রেখে দোয়া করলেন, আল্লাহ যেন তাঁর পাপ ক্ষমা করেন, অন্তর পবিত্র করেন এবং তাঁকে সংযমী করেন।

বর্ণনাকারী বলেন, এরপর ওই যুবক আর কখনো এমন অন্যায়ের দিকে পা বাড়াননি। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২২২১১)

নবীজির শিক্ষা থেকে বোঝা যায়, অপরাধপ্রবণ মানুষকে শুধু ধমক নয়, তার বিবেক ও মানবিকতাকেও জাগিয়ে তুলতে হয়।

নবীজির পদ্ধতি আমাদের শেখায়, অপরাধ প্রতিরোধ করতে হলে শুধু অপরাধীর দিকে তাকালে হবে না; তাকাতে হবে অপরাধের কারণ, পরিবেশ ও প্রবণতার দিকেও।

৭. অপরাধের বিচার, সংশোধনের সুযোগ

অপরাধীর তওবা ও সংশোধনের পথও বন্ধ করা যাবে না। কেউ নিজেকে সংশোধন করতে চাইলে তাঁকে সুযোগ দেওয়া হবে।

এক নারী ব্যভিচারের অপরাধ স্বীকার করে শাস্তি চেয়েছিলেন। পরে তাঁর ওপর দণ্ড কার্যকর হয়। খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) তাঁকে অভিশাপ দিলে নবীজি (সা.) তাঁকে নম্র হতে বলেন এবং ওই নারীর আন্তরিক তওবার প্রশংসা করেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬৯৫)

অপরাধের বিচার হবে, কিন্তু অপরাধীকে সংশোধনের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত করা হবে না।

শেষ কথা

বর্তমান সময়ে অশ্লীল কনটেন্ট, পর্নোগ্রাফি, অনিয়ন্ত্রিত যোগাযোগ ও যৌন উত্তেজক সংস্কৃতির সহজলভ্যতা নৈতিকতার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এ বাস্তবতায় শুধু আইন করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

প্রয়োজন পরিবারে নৈতিক শিক্ষা, তরুণদের আত্মসংযম, বিবাহকে সহজ করা, শালীন সামাজিক পরিবেশ এবং ডিজিটাল জগতে দায়িত্বশীলতা।

নবীজির পদ্ধতি আমাদের শেখায়, অপরাধ প্রতিরোধ করতে হলে শুধু অপরাধীর দিকে তাকালে হবে না; তাকাতে হবে অপরাধের কারণ, পরিবেশ ও প্রবণতার দিকেও।

  • ইবরাহীম আল খলীল : শিক্ষক, জামিয়া আরাবিয়া আশরাফুল মাদারিস, তেজগাঁও

মুমিন কেন পাপ করে: ইবনে আতাউল্লাহর বিস্ময়কর দর্শন

Read full story at source