মালয়েশিয়া ভ্রমণ: কালের যাত্রাধ্বনি-১

· Prothom Alo

পেট্রোনাসের আলোয় রাতের কুয়ালালামপুর

বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা সেরে ট্যাক্সি নিলাম। কুয়ালালামপুরে তখন বিকেল। হোটেলে পৌঁছে জানালার পাশে দাঁড়ালাম। কাচের দেয়ালে বিকেলের আলো মেখে চারপাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে একের পর এক অট্টালিকা। দূর থেকে শহরটাকে দেখতে দেখতে মনে হলো, এই আধুনিক নগরীর চেহারা বুঝতে হলে অতীতেও ফিরে তাকাতে হবে। যে শহর আজ আকাশ ছুঁতে চায়, তার শুরুটা কোথায়?

Visit casino-promo.biz for more information.

আকরিক লোহা, খনিজ নিয়েই কুয়ালালামপুরের গোড়াপত্তন। উনিশ শতকে খনিজ সম্পদের সন্ধানে এখানে এসেছিলেন শ্রমিকেরা। পরে রবারবাগান ও ঔপনিবেশিক বাণিজ্য মালয়ের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করে। তবে অর্থনীতির চরিত্র বদলেছে দেশটির স্বাধীনতার পর। শিল্পায়ন, প্রযুক্তি আর আন্তর্জাতিক ব্যবসা বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে দেশটির নগরজীবনও।

সন্ধ্যা নাগাদ পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার দেখতে বেরুলাম। ছবিতে বহুবার দেখেছি। তবে সামনে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা আলাদা। দুটি টাওয়ার পাশাপাশি উঠে গেছে ৪৫২ মিটার উচ্চতায়। মাঝে স্কাই ব্রিজ। স্টেইনলেস স্টিলের আবরণে রাতের আলো পড়েছে। সে এক অভিনব দৃশ্য! উঁচু স্থাপত্যের সামনে দাঁড়ালে দৃষ্টিরও একটা সীমা তৈরি হয়। মাথা তুলে একনজরে পুরোটা দেখা যায় না।

চারদিকে পর্যটকের ভিড়। ছবি তোলার জন্য প্রত্যেকেই নিজের মতো করে জায়গা খুঁজছেন। সেই ভিড়ের ভেতরে দাঁড়িয়ে আমার আগ্রহ অবশ্য অন্যদিকে।

এত বড় স্থাপত্য বানানোর সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হয়েছিল? নকশায় কীভাবে একটি দেশের পরিচয় যুক্ত হলো?

ফুড স্ট্রিট জালান আলোর। রাতভর হইচই, আলো আর মানুষের ঢল

টুইন টাওয়ারের স্থপতি সিজার পেল্লি (১৯২৬-২০১৯)। আর্জেন্টাইন বংশোদ্ভূত এই মার্কিন স্থপতি আধুনিক বাণিজ্যিক স্থাপত্যের সঙ্গে মালয়েশিয়ার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে যুক্ত করেছিলেন। সিজারের নকশায় বিশেষত্ব, টাওয়ার দুটির প্রতিটি তলার মূল বিন্যাস তৈরি করা হয়েছে দুটি পরস্পরছেদী বর্গক্ষেত্র থেকে। ভিত্তিগত নকশায় আছে আট কোণা তারা, ইসলামিক শিল্প ও স্থাপত্যের পরিচিত ঐতিহ্য। কাচ ও ইস্পাতের আধুনিক কাঠামোর মধ্যে এমন নকশা ভবন দুটিকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে।

নব্বইয়ের দশকে মালয়েশিয়া দ্রুত অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার সেই সময়েরই নির্মাণ, যখন দেশটি আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে চাইছিল। তবে আধুনিকতার প্রকাশ ঘটাতে গিয়ে এখানে মালয়েশিয়ার সাংস্কৃতিক পরিচয় বাদ দেওয়া হয়নি।

রাতের আলোয় টাওয়ার দুটি দেখে মনে হলো, কয়েক ঘণ্টা আগে হোটেলের জানালা দিয়ে যে শহরটিকে দেখেছিলাম, এটা সেই ইতিহাসের একটি দৃশ্যমান অধ্যায়। স্থাপত্যের উচ্চতা চোখে পড়ে সহজেই। কিন্তু সেই উচ্চতার পেছনে যে সময়, অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক ভাবনা কাজ করে, তার পাঠ নিতে হয় একটু থেমে। কুয়ালালামপুরে প্রথম সন্ধ্যায় আমার সেই পাঠ শুরু হলো।

নীল আকাশের নিচে পেট্রোনাস। কুয়ালালামপুরের চেনা দৃশ্য, তবু প্রতিবারই নতুন

রাত সাড়ে আটটার দিকে গেলাম জালান আলোর, কুয়ালালামপুরের খ্যাতনামা ফুড স্ট্রিটে। রাস্তার দুই পাশে খাবারের দোকান। বাইরে টেবিল পেতে খাওয়াদাওয়ার আয়োজন। কোথাও আগুনের আঁচে চিকেন উইংস তৈরি হচ্ছে। কোথাও সাতে, চার কুয়ে তেও আর হকিয়েন মি তৈরির ব্যস্ততা।

সামুদ্রিক খাবারের পসরা ছাড়িয়ে চোখ গেল বাহারি ফলের দিকে। রাস্তার এক পাশে লাইভ মিউজিক চলছে। গানের সুর, মানুষের কথাবার্তা আর খাবারের গন্ধ মিলিয়ে রাতের জালান আলোরের একটা নিজস্ব আমেজ আছে। এমন পরিবেশেই রাতের খাবার খেলাম। একটা শহরের রাতের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য এর চেয়ে সহজ উপায় আর কী হতে পারে!

সামনে পেট্রোনাস, পেছনে কুয়ালালামপুরের ব্যস্ত শহর। ভ্রমণের অ্যালবামে এমন মুহূর্তই থেকে যায়

পরদিন সকালে দিনের আলোয় আবার টুইন টাওয়ার দেখতে গেলাম। একই জায়গায় দ্বিতীয়বার এলে একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য বোঝা যায়। প্রথম দেখায় বিস্ময় চোখকে ব্যস্ত রাখে। দ্বিতীয়বার চোখ কিছুটা ধাতস্থ হয়। তখন ভবনের বাইরের সৌন্দর্যের সঙ্গে ভেতরের যুক্তিটাও বোঝা যায়। মালয়েশিয়ার আধুনিকতার গল্পটি বুঝতে হলে শুধু পেট্রোনাসের উচ্চতা দেখলে হবে না। জানতে হবে সেই অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কথা, যা এমন একটি নির্মাণকে সম্ভব করেছে। চলবে...

*অমৃতা ইশরাত: ব্যাংকার ও লেখক

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

Read full story at source