ক্যাম্পাসেরও ছুটি হয়

· Prothom Alo

ক্যাম্পাসের পিচঢালা পথটায় নেই নীল-সাদা বাসের আনাগোনা, টিএসসিতে নেই বন্ধুদের আড্ডা। হাজারো শিক্ষার্থীর পদচারণে মুখর আব্দুল জব্বার মোড় কিংবা কে আর মার্কেটের চিরচেনা কোলাহলটা হঠাৎ করেই যেন থেমে গেছে। পূজার দীর্ঘ ১০ দিনের ছুটিতে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) যেন ফিরে গেছে অন্য এক রূপে। চারপাশে সেই চিরচেনা সবুজ, গাছের ফাঁকে রোদ আর মৃদু বাতাস। শুধু নেই পরিচিত মানুষগুলোর ব্যস্ত পদচারণ।

Visit aportal.club for more information.

ছুটির এক সকালে ক্যাম্পাসে ঘুরতে বেরিয়েছিলাম। রাস্তাঘাট এতটাই ফাঁকা যে হাঁটতে হাঁটতে বারবার চোখে পড়ছিল চারপাশের দৃশ্য। সাধারণ দিনে যেসব পথে শিক্ষার্থীদের ব্যস্ততা চোখে পড়ে, সেসব পথেই আজ নেমেছে নীরবতা। কোথাও ক্লাসে যাওয়ার তাড়া নেই, নেই বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হওয়ার ব্যস্ততা। মনে হচ্ছিল, ক্যাম্পাসটা একই আছে, শুধু প্রতিদিনের চেনা ছন্দটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।

আব্দুল জব্বার মোড় আর কে আর মার্কেটের কথা আলাদা করে বলতেই হয়। এই জায়গাগুলো শুধু চলাচলের পথ নয়, শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনের জীবনেরও অংশ। একটু সময় পেলেই বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে গল্প কিংবা ক্লাসের ফাঁকে কিছুক্ষণ বসে থাকা কত পরিচিত দৃশ্য এখানে। অথচ ছুটির দিনে সেই চিরচেনা কোলাহল নেই। টিএসসিও ফাঁকা। মনে হয় আড্ডাগুলো বুঝি ছুটি শেষে আবার ফিরে আসবে।

তবে মানুষের ব্যস্ততা কমে গেলেও ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য কমেনি। বরং সবুজ প্রকৃতিকে যেন আরও নিবিড়ভাবে দেখা যায়। গাছপালার দিকে তাকালে চোখ জুড়িয়ে যায়, পাখিদের আনাগোনাও নজরে পড়ে বেশি। মৃদু বাতাসে পাতার নড়াচড়া আর পাখির ডাক নিরিবিলি পরিবেশটাকে অন্য রকম করে তোলে। প্রতিদিনের ব্যস্ততায় হয়তো এসব দৃশ্যের দিকে তেমন মনোযোগ দেওয়া হয় না। ছুটির দিনে সেই সুযোগটাই পাওয়া যায়। মনে হয় ক্যাম্পাসের এই সবুজ শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যস্ততার জন্যই নয়, তারও আলাদা একটা জীবন আছে।

কিন্তু এই শান্ত পরিবেশের মধ্যেও একটা শূন্যতা অনুভব হয়। মেয়েদের হলের সামনে গিয়ে দেখি, ছুটির কারণে ফটক তালাবদ্ধ। বাইরে থেকে হলের বারান্দার দিকে তাকিয়ে ব্যস্ত দিনে কাটানো সময়গুলোর কথা মনে পড়ে। এই বারান্দাতেই কত গল্প, কত হাসি, কত আড্ডা। আজ সেখানে পরিচিত মুখের আনাগোনা নেই। হলের বারান্দা, ফ্যাকাল্টির করিডর কিংবা লাইব্রেরি সবই আছে, শুধু নেই প্রতিদিন দেখা হওয়া মানুষগুলো।

বিশেষ করে গ্রুপ সি-র মানুষগুলোর কথা ভীষণভাবে মনে পড়ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রতিদিন দেখা হওয়া, একসঙ্গে ক্লাস করা কিংবা অল্প সময়ের আড্ডা এসব যে কখন অভ্যাস হয়ে যায়, তা ব্যস্ততার মধ্যে বোঝা যায় না। ছুটির দিনে পরিচিত জায়গাগুলো ফাঁকা দেখলে সেই ছোট ছোট মুহূর্তের গুরুত্ব আরও বেশি অনুভব করি। ফ্যাকাল্টির করিডরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়, কয়েক দিন পরই আবার এখানে পরিচিত কণ্ঠস্বর শোনা যাবে, জমবে গল্প।

ব্রহ্মপুত্রের পাড়েও ছুটির দিনে মানুষের আনাগোনা কম চোখে পড়ে। চারপাশের সবুজ আর শান্ত পরিবেশ মনকে কিছুটা স্বস্তি দেয়। তবু মনে হয় প্রকৃতির সৌন্দর্য যতই মন ভরিয়ে দিক, মানুষের উপস্থিতি ছাড়া ক্যাম্পাসের গল্পটা যেন অসম্পূর্ণ। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয় শুধু তার ভবন, রাস্তা কিংবা গাছপালা দিয়ে তৈরি নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে হাজারো মানুষের অভ্যাস, স্মৃতি আর সম্পর্ক।

ছুটি শেষ হলে আবার শিক্ষার্থীরা ফিরবে। নীল–সাদা বাস চলবে বাকৃবির চেনা পথে, আব্দুল জব্বার মোড় আর কে আর মার্কেট জমে উঠবে আড্ডায়। টিএসসি, হলের বারান্দা আর ফ্যাকাল্টির করিডর ফিরে পাবে পরিচিত ব্যস্ততা। ক্যাম্পাস আবার হয়ে উঠবে প্রাণবন্ত।

তত দিন এই নীরবতাও থেকে যাবে বাকৃবির জীবনের অংশ হয়ে। ছুটির সকালে দেখা সেই ফাঁকা রাস্তা, পাখিদের আনাগোনা আর তালাবদ্ধ হলের দৃশ্য হয়তো কিছুদিন পর স্মৃতি হয়ে যাবে। ক্যাম্পাসেরও ছুটি হয়, তবে তার চেনা মানুষগুলোর ফিরে আসার অপেক্ষা যেন থেকেই যায়।

*লেখক: শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ-২২০২

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

Read full story at source