কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি ও আমার রঙিন স্কুলব্যাগের দিনগুলো
· Prothom Alo
একসময় ঢাকার অন্যতম জনপ্রিয় শপিংমল ছিল কাকরাইলের কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি। গত ১ অক্টোবর দোকান মালিক সমিতি থেকে মার্কেটটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই কর্ণফুলী মার্কেট নিয়ে তাঁদের স্মৃতিচারণা করেন। নিজের শৈশবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা তেমনি কিছু মুহূর্তের স্মৃতিচারণা করলেন জাহিন যাঈমাহ্ কবির
Visit saltysenoritaaz.org for more information.
রাজধানীর কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির শপিং মলের সামনে এখন ঝুলছে একটি পিভিসি ব্যানার, তাতে লেখা ‘১ অক্টোবর থেকে শপিং কমপ্লেক্স বন্ধ’তখন হয়তো ক্লাস ফাইভে পড়ি। আশপাশে বন্ধুদের কাঁধে নানা রংঢঙের স্কুলব্যাগ। ট্রলি, রেসিং কার, বারবি আরও কত কী। এই যখন অবস্থা, তখন কি আর সাধাসিধে ব্যাগে মন ভরে? মায়ের কাছে হাজির হলাম নতুন বায়না নিয়ে। মায়েরও এক কথা, আগে পরীক্ষায় ভালো করতে হবে।
যেই বলা, সেই কাজ। ফলাফল পেয়ে নতুন ব্যাগ বাছাই করতে রওনা হলাম। মস্ত বড় (২০ তলা) এক ভবনের নিচে গিয়ে থামলাম। ভবনের সামনে লাল আলোয় বড় করে লেখা, ‘কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি’।
অনলাইন থেকে যেভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠল দেশি পোশাকের ব্র্যান্ড ‘খুঁত’১০ বছরের বেশি সময় ধরে শপিং মলটিতে বেচাবিক্রি ধীরে ধীরে কমেছেশান্তিনগর-কাকরাইল মোড়ের কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির এই মলটির সঙ্গে আমার মতো অনেকেরই এমন নানা স্মৃতি জড়িয়ে আছে। আশপাশে নানা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর শিক্ষার্থীদের আনাগোনা থাকায় একসময় তুঙ্গে ছিল মার্কেটটির জনপ্রিয়তা। ক্লাস শেষে মায়ের হাত ধরে যাওয়া, এরপর ঘুরে ঘুরে টুকটাক কেনাকাটা আর সবশেষে চারতলায় গিয়ে এক প্লেট দইফুচকা।
এত সব স্মৃতি জড়ানো সেই শপিং মলের সামনে এখন ঝুলছে একটি পিভিসি ব্যানার, তাতে লেখা ‘১ অক্টোবর থেকে শপিং কমপ্লেক্স বন্ধ’। দীর্ঘ ২৮ বছরের পথচলার ইতি টানল কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি। একসময়ের আলোঝলমলে এই মলে শেষমেশ খোলা ছিল ২৫টি দোকান।
শুরুর দিনগুলো
১৯৯৮ সালে ২০ তলা ভবনের বেজমেন্ট ও চারতলা নিয়ে চালু হয় কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি। ওপরের তলাগুলো অ্যাপার্টমেন্ট। শপিং কমপ্লেক্সটি নির্মাণ করেছিল কর্ণফুলী গ্রুপ। ১৯৮টি দোকান নিয়ে শপিং মলটির যাত্রা শুরু হয়েছিল। ক্যাপসুল লিফট, নিজস্ব জেনারেটর আর শীতাতপনিয়ন্ত্রিত পরিবেশ তখন রাজধানীর মার্কেটগুলোর মধ্যে এই মলকে বেশ আলাদা করে তুলেছিল।
উপহারসামগ্রী, প্রসাধনী, শাড়ি, থ্রি–পিস, ছেলেদের পোশাক, গয়না, ওপরে ফুডকোর্ট; ঈদ বা উৎসবের মৌসুমে এক ছাদের নিচে সবই এখানে মিলত। তবে আমার জন্য ছোটবেলা থেকেই কর্ণফুলী মানে ছিল নতুন ব্যাগ, আর মজার মজার খাবারের জায়গা।
শীতে ছাদবাগানের জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নেবেন যেভাবেযেকোনো উপলক্ষে ক্রেতারা কেনাকাটা করতে কর্ণফুলী গার্ডেন সিটিতে ভিড় করতেনশপিং মলটিতে দুপুর আর সন্ধ্যায় ভিড় হতো সবচেয়ে বেশি। কেউ কেনাকাটা করছেন, কেউ পরিবার বা বন্ধুদের নিয়ে খেতে বসেছেন। সেফটিপিন থেকে জুতা, ব্যাগ, শাড়ি, গয়না, খেলনা—কী ছিল না! আর তাই দৈনন্দিন থেকে শুরু করে উৎসব—যেকোনো উপলক্ষে বিভিন্ন শ্রেণির ক্রেতারা এখানে ভিড় করতেন।
দশ বছর ধরে হারিয়েছে জৌলুস
শুরুতে নজর কাড়লেও ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা হারাতে থাকে কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি। অন্য সব বড় বড় শপিং মলের ভিড়ে চাপা পড়ে যায়। কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির দোকানমালিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাকী বিল্লাহ ওসমানী প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, ১০ বছরের বেশি সময় ধরে শপিং মলটিতে বেচাবিক্রি ধীরে ধীরে কমেছে। তাঁর ভাষ্যমতে, বেশ কয়েকটি কারণে মার্কেট ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়ে। প্রথমে মগবাজার-মালিবাগ উড়ালসড়ক নির্মাণের সময় তীব্র যানজট, পরে করোনা মহামারি।
শুধু করোনার সময়ই শতাধিক দোকান বন্ধ হয়ে যায়, পরে আর যেগুলো চালু হয়নি। শপিং মলটি বন্ধের পেছনে এমন আরও নানা সমস্যার কথা জানা যায়।
ক্রেতা না থাকায় দোকানমালিকেরা মার্কেট বন্ধ ও মালিকানা বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ওসমানী জানান, জায়গাটি বিক্রি করতে হাসপাতাল, ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে। শিগগিরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
পুরোনো মানেই কি বাতিল
কর্ণফুলী গার্ডেন সিটিতে শেষবার গিয়েছিলাম বছর তিনেক আগে, ফের ব্যাগ কিনতে। এরপর বাইরে থেকে উঁকি দিলেও কেনাকাটার খুব একটা সুযোগ হয়নি। ধীরে ধীরে একের পর এক দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কেনাকাটায়ও সীমাবদ্ধতা আসতে শুরু করে। ফলে ক্রেতাও কম আসতে থাকে।
এককালের এমন জনপ্রিয় শপিং মলের এভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া আসলে কিসের ইঙ্গিত! ক্রেতার রুচি, কেনাকাটার ধরন আর বড় শপিং মলের প্রতিযোগিতায় পুরানোদের টিকে থাকার লড়াইয়ে হেরে যাওয়া দেখে নিজেকেই প্রশ্ন করি, সময়ের সঙ্গে আপডেটেড না হলে মানুষও কি এভাবে পিছিয়ে পড়ে? কী জানি!
তারপরও আমার মতো অনেকের কাছে হয়তো ছোটবেলার রঙিন স্কুলব্যাগের স্মৃতি হয়ে থেকে যাবে কর্ণফুলী মল।