যাত্রাবাড়ী থেকে উত্তরা: বায়ুদূষণ মেপে যা পেলেন গবেষকেরা

· Prothom Alo

রাজধানীর উত্তরার খালপাড় এলাকায় বাতাসে অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা পিএম ২.৫-এর উপস্থিতি প্রতি ঘনমিটারে ১৪৪ মাইক্রোগ্রাম। বিপরীতে, সবচেয়ে নির্মল বাতাস পাওয়া গেছে নিকুঞ্জ এলাকায়। সেখানে পিএম ২.৫-এর উপস্থিতি প্রতি ঘনমিটারে ৩৫ মাইক্রোগ্রামের নিচে। অর্থাৎ ১০ কিলোমিটারের ব্যবধানে রাজধানীর দুটি এলাকার বাতাসে দূষণের মাত্রায় বিরাট পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।

রাজধানীর উত্তরা থেকে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত দূরত্ব ২৭ কিলোমিটার। সড়কপথে বায়ুমানের দূষণ মেপে এই তথ্য জানিয়েছে বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়নকেন্দ্র (ক্যাপস)। তাদের এক গবেষণায় দেখা গেছে, খালপাড়ের পর সবচেয়ে দূষিত এলাকাগুলোর একটি যমুনা ফিউচার পার্ক। সেখানে প্রতি ঘনমিটার বাতাসে পিএম ২.৫-এর উপস্থিতি ১১৭ মাইক্রোগ্রাম। মালিবাগ থেকে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত পুরো এলাকাজুড়েও বায়ুদূষণের উচ্চমাত্রা পাওয়া গেছে।

Visit fishroad-app.com for more information.

গবেষণায় পিএম ১০-এর উপস্থিতিও উদ্বেগজনক মাত্রায় পাওয়া গেছে। উত্তরার খালপাড়ে প্রতি ঘনমিটার বাতাসে পিএম ১০-এর পরিমাণ ৮১৩ মাইক্রোগ্রাম। যমুনা ফিউচার পার্ক এলাকায় তা ৫৫৭ মাইক্রোগ্রাম এবং নতুন বাজার এলাকায় ৩৯৯ মাইক্রোগ্রাম।

বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা অনুযায়ী, প্রতি ঘনমিটার বাতাসে পিএম ২.৫-এর মানমাত্রা ৩৫ মাইক্রোগ্রাম। অর্থাৎ খালপাড়ে এর উপস্থিতি নির্ধারিত মানমাত্রার চার গুণের বেশি। অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশক মান অনুযায়ী, পিএম ২.৫-এর বার্ষিক গড় ঘনত্ব প্রতি ঘনমিটারে ৫ মাইক্রোগ্রামের বেশি হওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

—জিয়াউল হক, সাবেক পরিচালক, পরিবেশ অধিদপ্তরের বায়ুমান শাখা।‘সড়কের ধুলার সঙ্গে গাড়ির কালো ধোঁয়া মিশে বায়ুমানের যথেষ্ট অবনতি ঘটায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কারণে মাটির ধুলাও বাতাসে মেশে। ট্রাফিক পুলিশ ও গণপরিবহনের যাত্রীরা সরাসরি এসব দূষিত বাতাসের সংস্পর্শে আসেন।’

গত ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত গবেষণায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বায়ুমানের পাশাপাশি গণপরিবহনের ভেতরের দূষণ এবং ট্রাফিক পুলিশদের কর্মস্থলের আশপাশের বায়ুমানও পরীক্ষা করা হয়। ক্যাপসের গবেষক দল লোকাল বাসে উত্তরা থেকে যাত্রাবাড়ী এবং যাত্রাবাড়ী থেকে উত্তরা যাতায়াত করে বাসের ভেতরের বায়ুমান পরীক্ষা করে।

ক্যাপসের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা শহরের লক্ষাধিক মানুষ গণপরিবহনে যাতায়াত করেন। গণপরিবহনের ভেতরের বায়ুমানের পরিস্থিতি কেমন, তা জানতে এটাই প্রথম উদ্যোগ। এ উদ্যোগে ক্যাপসকে সহযোগিতা করছে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)।

সড়কের ধুলা ও গাড়ির ধোঁয়ায় বাড়ছে দূষণ

বিশ্বব্যাংকের ‘দ্য বাংলাদেশ কান্ট্রি এনভায়রনমেন্ট অ্যানালাইসিস (সিইএ) ২০২৩’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে ১ লাখ ৫৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ার প্রতিদিন বিশ্বের বিভিন্ন শহরের বায়ুমান সূচক (একিউআই) প্রকাশ করে। এতে বায়ুদূষণের শীর্ষ শহরগুলোর মধ্যে প্রায়ই ঢাকার নাম উঠে আসে।

—অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার, প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, ক্যাপস ‘ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের দীর্ঘ সময় বিভিন্ন মোড়ে দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে তাঁরা বায়ুদূষণের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকেন। বিশেষ করে মোড়গুলোতে যানজট তৈরি হলে বায়ুমানের আরও অবনতি ঘটে।’

পরিবেশ অধিদপ্তরের বায়ুমান শাখার সাবেক পরিচালক ও সদ্য অবসরে যাওয়া অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল হক প্রথম আলোকে বলেন, সড়কের ধুলার সঙ্গে গাড়ির কালো ধোঁয়া মিশে বায়ুমানের যথেষ্ট অবনতি ঘটায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কারণে মাটির ধুলাও বাতাসে মেশে। ট্রাফিক পুলিশ ও গণপরিবহনের যাত্রীরা সরাসরি এসব দূষিত বাতাসের সংস্পর্শে আসেন।

জিয়াউল হক আরও বলেন, সাময়িক সমাধান হিসেবে সড়কে পানি ছিটাতে হবে। পাশাপাশি উন্মুক্ত মাটিতে ঘাস লাগানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এতে বায়ুদূষণের পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হতে পারে।

ঢাকার ৯ স্থানে বায়ুদূষণ অনেক বেশি

১০টি বাসের ৮টিই যাত্রী পরিবহনের অনুপযোগী

গবেষণায় শুধু বাসের ভেতরের বায়ুমান পরীক্ষা করা হয়নি, বাসগুলোর কাঠামোগত ও পরিবেশগত ফিটনেসও যাচাই করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, পরীক্ষা করা ১০টি বাসের মধ্যে ৮টিই যাত্রী পরিবহনের অনুপযোগী। এসব বাসকে লাল কার্ড দেওয়া হয়েছে। বাকি দুটি বাস পেয়েছে হলুদ কার্ড। কোনো বাসই সবুজ কার্ড পায়নি।

বাসগুলোর মূল্যায়নে পাঁচটি শ্রেণিতে মোট ২৫টি প্রশ্ন রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল চালক ও কন্ডাক্টরের কেবিনে ধোঁয়া প্রবেশ করে কি না, ইঞ্জিন থেকে কালো ধোঁয়া বের হয় কি না, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ফিটনেস সনদ আছে কি না, চালকের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স রয়েছে কি না এবং চালকের চোখ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয় কি না। এসব প্রশ্নের উত্তরের ভিত্তিতে প্রতিটি বাসকে ১০০ নম্বরের মধ্যে মূল্যায়ন করা হয়।

ঢাকার দরিদ্র এলাকায় ৮ স্থানে বসছে বায়ুদূষণ মাপার যন্ত্র

পুলিশ বক্সের আশপাশেও দূষণের উচ্চমাত্রা

রাজধানীর বিভিন্ন মোড়ে দায়িত্ব পালন করা ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরাও বায়ুদূষণের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন। ক্যাপসের গবেষণায় রাজধানীর ৯টি মোড়ে থাকা পুলিশ বক্সের আশপাশের বায়ুমান পরীক্ষা করা হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি দূষণ পাওয়া গেছে গুলশান-২ মোড়ে। সেখানে প্রতি ঘনমিটার বাতাসে পিএম ২.৫-এর উপস্থিতি ২৭১ মাইক্রোগ্রাম।

আবদুল্লাহপুর মোড়ে দিনের বেলায় বায়ুমানের পরিস্থিতি কিছুটা ভালো থাকলেও সন্ধ্যার পর তা খারাপ হতে থাকে। এ সময় এই প্রবেশপথ দিয়ে প্রচুর বাস ও পণ্যবাহী ট্রাক ঢাকায় প্রবেশ করে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যায় সেখানে প্রতি ঘনমিটার বাতাসে পিএম ১০-এর উপস্থিতি ৪০০ মাইক্রোগ্রামে পৌঁছে যায়।

শান্তিনগর এলাকায় রাত ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে বায়ুমানের অবনতি শুরু হয়। এ সময় প্রতি ঘনমিটার বাতাসে পিএম ২.৫-এর উপস্থিতি পাওয়া যায় ১৫৯ থেকে ১৭৯ মাইক্রোগ্রাম। এ ছাড়া গাবতলী, মিরপুর-১০, শাহবাগ, ধানমন্ডি-৩২, সদরঘাট ও সচিবালয়ের পুলিশ বক্সের আশপাশেও অস্বাস্থ্যকর বায়ুমান পাওয়া গেছে।

অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের দীর্ঘ সময় বিভিন্ন মোড়ে দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে তাঁরা বায়ুদূষণের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকেন। বিশেষ করে মোড়গুলোতে যানজট তৈরি হলে বায়ুমানের আরও অবনতি ঘটে।

ঢাকার বায়ু আজ ‘দুর্যোগপূর্ণ’, দূষণ থেকে বাঁচতে কী করবেন

ঢাকা বসবাসের কতটা উপযোগী

যুক্তরাজ্যভিত্তিক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট গ্রুপের গবেষণা বিভাগ ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) তৈরি করা ২০২৬ সালের বৈশ্বিক বাসযোগ্যতা সূচকে বিশ্বের সবচেয়ে কম বাসযোগ্য শহরের তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ঢাকা। সূচকে বিশ্বের ১৭৩টি শহরের মধ্যে বাসযোগ্যতার দিক দিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দামেস্ক ও ত্রিপোলি শহরের পরেই রয়েছে ঢাকা।

গত ৬ জুলাই প্রকাশিত সূচকটি প্রকাশ করা হয়েছে। স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা এবং অবকাঠামো—এই পাঁচ দিক বিবেচনা করে এ সূচক প্রকাশ করা হয়। সূচকে ঢাকার মোট স্কোর ১০০-এর মধ্যে ৪২ আর শহরগুলোর তালিকায় অবস্থান ১৭১তম। গত বছরের সূচকেও বাংলাদেশের অবস্থান একই ছিল। তলানিতে থাকা সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের স্কোর ৩২। আর ১৭২তম স্থানে থাকা লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলির স্কোর ৪১।

সূচকটি তৈরি করা হয়েছে ১ থেকে ১০০ স্কোরের ভিত্তিতে। স্কোর ৮০-এর ওপরে হলে গ্রহণযোগ্য আর ৪০-এর নিচে হলে সেই শহরকে অসহনীয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ৪২ স্কোর নিয়ে ঢাকা অসহনীয় শহরের চেয়ে সামান্য ভালো আছে।

Read full story at source