মানুষের বেঁচে থাকার গল্প

· Prothom Alo

মানুষের গতি আর সংগতি সমানতালে চলছে না। তাঁদের বেঁচেবর্তে থাকা কঠিনতর হচ্ছে। কীভাবে বেঁচে আছেন মানুষেরা, কী তাঁদের উদ্যম ও জীবনীশক্তি, জীবন চালিয়ে নিতে কতটুকু সচেষ্ট তাঁরা—এসব অভিজ্ঞতা নিয়ে এই বিশেষ ক্রোড়পত্রের বিষয়।

এসব লেখায় সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের গল্প উঠে এসেছে। তাঁদের চাওয়া খুব বেশি নয়। তাঁরা চান স্বাভাবিক স্বস্তির জীবন। স্বস্তির নিশ্চয়তার জন্য প্রয়োজন সংগতি বা জোগান। জোগান আসে ব্যবস্থা বা কাঠামো থেকে। সেই ব্যবস্থা বা কাঠামো গড়ে তোলার মূল কারিগর রাষ্ট্র। মানুষের জীবন ও অধিকার সুরক্ষায় মানবিক রাষ্ট্রের ভূমিকার দাবি অনায্য নয়।

Visit newsbetting.bond for more information.

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মূলনীতি সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। জনগণের স্বপ্ন ছিল সব অশুভ দূর করে একটি সহনশীল রাষ্ট্র বিনির্মাণের। ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের মূল চেতনা ছিল বৈষম্যহীন বাংলাদেশ বিনির্মাণ। অর্থাৎ জাতি, বর্ণ, ধর্ম ও আঞ্চলিকতা–নির্বিশেষে সব নাগরিকের জন্য মানবিক, সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা আজও মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যায়নি।

রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাহীন জীবন বৃহৎ অর্থে অধিকারহীন জীবন। গ্রামের একজন কৃষক, যাঁর সেই অর্থে কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নেই, তাঁকে এক বস্তা সার পেতে রাজনৈতিক নেতার কাছে ধরনা দিতে হয়।

সব নাগরিকের জন্য মানবিক ও সহনশীল রাষ্ট্র গড়ে তোলা গেল না। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরতে পরতে সামাজিক–অর্থনৈতিক বৈষম্যসহ নানা ধরনের বৈষম্য ক্রিয়াশীল। প্রান্তিক মানুষ, সমাজের নিচের দিকের মানুষ ক্রমেই রাষ্ট্রীয় আবেশের বাইরে চলে যাচ্ছেন। তাঁদের কাছে রাষ্ট্র যেন এক স্বাদহীন সত্তা। তাঁরা দৈনন্দিন জীবনে রাষ্ট্রের উপস্থিতি তেমন উপলব্ধি করতে পারেন না।

নাগরিক সেবার নামে সমাজের নিচের দিকে যা যাচ্ছে, সেটার রাজনীতিকরণ এক ভয়াবহ প্রবণতা হিসেবে দেখা যাচ্ছে। ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের মধ্যে না থাকলে একজন মানুষের পক্ষে রাষ্ট্রীয় সুবিধা ভোগ করা সহজ নয়। রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাহীন জীবন বৃহৎ অর্থে অধিকারহীন জীবন। গ্রামের একজন কৃষক, যাঁর সেই অর্থে কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নেই, তাঁকে এক বস্তা সার পেতে রাজনৈতিক নেতার কাছে ধরনা দিতে হয়।

নীতিহীন ও আদর্শহীন রাজনীতি নাগরিক জীবনকে বিষিয়ে তুলেছে। এখানে নাগরিক অধিকার বলে বিশেষ কিছু গড়ে উঠল না। সবই রাজনীতিজীবীদের ভাষায় জনগণকে দেওয়া বিশেষ ‘সুযোগ’। ‘সুযোগ’ দেওয়ার প্রবণতায় রয়েছে বশীকরণ প্রচেষ্টা। নাগরিকদের ‘সুযোগ’ দিয়ে নিজের দলের বশীকরণ প্রক্রিয়ার ভেতর আনা হচ্ছে, যাকে একাডেমিক ভাষায় বলা হয় ‘ক্লায়েন্টেলিজম’ বা মক্কেলতন্ত্র। রাজনীতিকদের আজ প্রচুর মক্কেল, অনুগত লোক, ভোটার ও সমর্থক লাগছে। তাদের প্রধানতম তত্পরতা হচ্ছে মানুষকে বিপদে ফেলে আনুগত্যপ্রবণ হতে বাধ্য করা। বিভিন্ন সরকারের সময় নানা রকম ভাতা ও কার্ড প্রদানের উদ্যোগগুলো খেয়াল করলে সহজেই তা বোঝা যাবে। কার্যকর ব্যবস্থা বা কাঠামো না থাকায় রাজনীতিজীবীরাও পাচ্ছেন বিস্তর বাধ্য জনমানুষ। উন্নত শাসন বা পরিচালনব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় রাজনীতিকদের ওপর মানুষের নির্ভরতা বাড়ছে।

রাষ্ট্র আর জনগণের প্রতিদিনের জীবন সমান্তরাল গতিতে চলে না। যে মানুষের পাশে বৃহৎ অর্থে রাষ্ট্র নেই, তিনি কীভাবে চালিয়ে নিচ্ছেন তাঁর জীবন, তা এক দারুণ প্রশ্ন। 

এ অপচর্চা পুরোনো, তা বলা যাবে না। স্বাধীনতার পর থেকে জনগণ এ বিশেষ ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। রাজনীতি হলো চূড়ান্ত এক পরিশীলিত আচরণ, যার মূল দর্শন নৈতিকতা, আদর্শ ও জনকল্যাণ। সস্তা ও তাৎক্ষণিক রাজনীতির চর্চা অসহনীয় হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক দলগুলো এর দায় কিছুতেই এড়াতে পারবে না। অনেকে বলেন জনগণ তো নাগরিক হয়ে উঠতে পারল না, এ কারণে কার্যকর রাষ্ট্র গড়া যাচ্ছে না। কিন্তু জনগণ যে নাগরিক হয়ে উঠতে পারল না, সেই দায় কি রাজনৈতিক শ্রেণি এড়িয়ে যেতে পারবেন?

কুড়িগ্রামের কৃষক মো. অপিয়লের মতো শ্রমজীবী মানুষেরাই এই রাষ্ট্রের মূল কারিগর

রাজনৈতিক কদর্যতা চর্চার ক্লাসরুম হলো রাষ্ট্রকাঠামো। সর্বজনীন রাষ্ট্র গড়া গেল না, রাষ্ট্র হলো শক্তিমান ও বিত্তবানদের। দেশের সিংহভাগ মানুষ রাষ্ট্রীয় আবেশহীন জীবন কাটায়। রাষ্ট্রের নিবর্তনমূলক প্রভাব ছাড়া সদর্থক বিশেষ কিছু তাদের জীবনকে স্পর্শ করে না। রাষ্ট্র আর জনগণের প্রতিদিনের জীবন সমান্তরাল গতিতে চলে না। যে মানুষের পাশে বৃহৎ অর্থে রাষ্ট্র নেই, তিনি কীভাবে চালিয়ে নিচ্ছেন তাঁর জীবন, তা এক দারুণ প্রশ্ন। 

সাধারণ মানুষের অদম্য শক্তি তাঁদের সাফল্যের ভিত্তি। রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে এ আরেক গতিশীল সত্তা। তাঁরা উদ্যমী, কর্মমুখর ও সৃজনশীল। বিশেষ কোনো অবলম্বন ছাড়া তাঁরা নিজেদের ভাগ্য বদলে দিতে পারেন।

রাষ্ট্র আইন, নীতিপরিকল্পনার মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক বোনে। কিন্তু এসব আইন ও নীতিপরিকল্পনা বৃহৎ অর্থে জনজীবনকে স্পর্শ করে না। এ কারণে বিস্তর দলিলপত্র ক্রমেই নিষ্ফলা হয়ে উঠছে। জনগণ বা নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক সংযোগ, অবলম্বন আর আশ্রয়ের। সেই মোহনায় না হেঁটে রাষ্ট্র হয়ে উঠছে প্রতিবন্ধক। জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের দারুণ এক বিচ্যুতি ঘটে গেছে। সাধারণ মানুষ, বিশেষত প্রান্তিক মানুষের পাশে রাষ্ট্র রয়েছে এক অচেনা সম্পর্ক নিয়ে।

তবু মানুষকে বাঁচতে হয়, জীবন চালিয়ে নিতে নিতে। রাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে থাকলে তো তার জীবন চলে না। নিজের চেষ্টায় তাকে সক্রিয় থাকতে হয়, সামান্য অবলম্বন নিয়ে পথের খোঁজে নামতে হয়, জীবিকা অন্বেষণ করতে হয়। এ হলো এ দেশের মানুষদের এক অদম্য জীবনীশক্তি। তাঁরা অন্বেষী, আবিষ্কারপ্রবণ ও অজেয়। 

তাঁরা নিজের পথ নিজে বের করেন, পথ মৃসণ ও সমৃদ্ধ করেন। রচনা করেন অনন্য সব গল্প। এ পথচলায় হয়তো কখনো আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও পাড়া–প্রতিবেশীদের অবলম্বন হিসেবে পান। মানুষ ব্যক্তিগত সংকটে সেই অর্থে রাষ্ট্রকে পায় না, পায় মূলত প্রতিবেশ, আত্মীয়স্বজন ও সুহৃদ ও বন্ধুবান্ধবকে। ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক প্রান্তিক মানুষদের বাঁচিয়ে রেখেছে। তারা শোকে বিহ্বল হয় না, হাল ছেড়ে দেয় না। ঘোর অমানিশার ভেতর আশার বীজ বোনে। মানুষের এই জীবনীশক্তি চিনে নেওয়া খুব জরুরি।

সাধারণ মানুষের অদম্য শক্তি তাঁদের সাফল্যের ভিত্তি। রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে এ আরেক গতিশীল সত্তা। তাঁরা উদ্যমী, কর্মমুখর ও সৃজনশীল। বিশেষ কোনো অবলম্বন ছাড়া তাঁরা নিজেদের ভাগ্য বদলে দিতে পারেন। রাষ্ট্র যদি মানুষের সঙ্গে যথাযথভাবে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারত, তাহলে তা হতে পারত এক অসামান্য ব্যাপার। এই ক্রোড়পত্রে প্রকাশিত প্রতিটি গল্প অনন্য ও অনুপ্রেরণামূলক।

  • খান মো. রবিউল আলম: যোগাযোগবিশেষজ্ঞ ও শিক্ষক

Read full story at source