টেকসই গ্রামীণ উন্নয়নে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব বিকাশ

· Prothom Alo

বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়নে তরুণদের অংশগ্রহণের রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা। তাঁদের সৃজনশীলতা, উদ্যম, শেখার আগ্রহ ও সামাজিক সম্পৃক্ততাকে কাজে লাগানো গেলে স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন কার্যক্রম আরও অংশগ্রহণমূলক ও কার্যকর হতে পারে। বিশেষ করে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলি, সামাজিক দায়িত্ববোধ ও নাগরিক সচেতনতা গড়ে তোলার মাধ্যমে ভবিষ্যতের দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরির সুযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাবে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর একটি অংশ বিভিন্ন সরকারি সেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুযোগ সম্পর্কে যথেষ্ট অবগত নন। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাসহায়তা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং অন্যান্য জনসেবার তথ্য সহজবোধ্যভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া তাই গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের পাশাপাশি প্রশিক্ষিত ও দায়িত্বশীল তরুণেরা সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারেন।

Visit newsbetsport.bond for more information.

এই বাস্তবতা সামনে রেখে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড) গ্রহণ করেছে রুরাল ইয়ুথ লিডারশিপ ইনিশিয়েটিভ (RYLI) নামে একটি প্রায়োগিক গবেষণা প্রকল্প। ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত বার্ড গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও প্রায়োগিক কার্যক্রমের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে গ্রামীণ উন্নয়নে অবদান রেখে আসছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মাঠপর্যায়ে উন্নয়ন ধারণার কার্যকারিতা যাচাইয়ে প্রতিষ্ঠানটির অভিজ্ঞতা রয়েছে।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

RYLI-এর পরিকল্পিত মডেলে নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, নির্বাচিত প্রতিটি গ্রাম থেকে তিনজন শিক্ষার্থীকে এ কার্যক্রমে যুক্ত করা হবে। দুই বছর মেয়াদি অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তাদের নেতৃত্বের গুণাবলি, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা হবে।

প্রকল্পের আওতায় নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের বাইসাইকেল, স্কুলব্যাগ ও অন্যান্য শিক্ষা উপকরণ দেওয়া হবে। দুই বছর মেয়াদি স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের বিশেষ সনদ দেওয়া হবে, যা তাদের পরবর্তী উচ্চশিক্ষা গ্রহণেও সহায়ক হতে পারে।

উদ্যোগটির আওতায় শিক্ষার্থীদের জন্য তিন দিনের প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে। বিদ্যালয়ের ছুটির সময়ে আয়োজিত এ প্রশিক্ষণে নেতৃত্বের মৌলিক ধারণা, যোগাযোগের দক্ষতা, দলগত কাজ, সামাজিক সমস্যা চিহ্নিতকরণ, জলবায়ু পরিবর্তন, গ্রামীণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সরকারি সেবা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও প্রচার এবং নৈতিক দায়িত্ববোধের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। প্রতিটি বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের মেন্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

প্রশিক্ষণ শেষে শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ গ্রামে নির্ধারিত নির্দেশনা অনুযায়ী স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে অংশ নেবে। তাদের কাজের মধ্যে থাকবে সরকারি সেবা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি, জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে তথ্য প্রচার, স্থানীয় জনগণের প্রয়োজন অনুধাবন এবং সংশ্লিষ্ট সেবাকেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে সহায়তা করা।

সরকারি সেবা ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধ—

বাংলাদেশে বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ও জনকল্যাণের সুযোগ সম্প্রসারিত হয়েছে। তবে এসব সেবার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে সঠিক তথ্য জানা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি। বিশেষ করে প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে তথ্যের ঘাটতি বিদ্যমান সুযোগ গ্রহণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

কোনো বয়স্ক ব্যক্তি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আবেদনপ্রক্রিয়া সম্পর্কে না-ও জানতে পারেন। কোনো শিক্ষার্থীর পরিবার শিক্ষাসহায়তার সুযোগ সম্পর্কে অবগত না-ও থাকতে পারে। আবার কোনো পরিবার স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা বা টিকাদান কর্মসূচির তথ্য সময়মতো না–ও পেতে পারে। RYLI-এর আওতায় প্রশিক্ষিত শিক্ষার্থীরা এসব ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারবে। তারা যাচাইকৃত তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে, সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর বা সেবাকেন্দ্রের পরিচিতি জানাতে এবং প্রয়োজনীয় যোগাযোগের পথ নির্দেশ করতে পারবে। এতে সরকারি সেবা সম্পর্কে স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বাড়বে এবং জনগণের তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ সম্প্রসারিত হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ভূমিকা হবে সহায়ক ও স্বেচ্ছাসেবামূলক। তারা সরকারি কর্মকর্তাদের বিকল্প হিসেবে কাজ করবে না কিংবা কাউকে কোনো সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নিশ্চয়তা দেবে না। সরকারি প্রতিষ্ঠান ও জনগণের মধ্যে তথ্যভিত্তিক যোগাযোগ সহজ করাই হবে তাদের প্রধান দায়িত্ব।

বিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা পরিবার ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও দিকনির্দেশনা পেলে তারা স্থানীয় সমস্যা সম্পর্কে জানতে, প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে, মানুষের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ গড়ে তুলতে এবং সামাজিক কল্যাণমূলক কাজে অংশ নিতে পারে। এ ধরনের অভিজ্ঞতা তাদের আত্মবিশ্বাস, যোগাযোগের দক্ষতা, সহমর্মিতা ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।

RYLI এই ধারণাকে বাস্তব কার্যক্রমের মাধ্যমে যাচাই করার একটি উদ্যোগ। এর মূল দর্শন হলো, নেতৃত্বের শিক্ষা শুধু শ্রেণিকক্ষ বা প্রশিক্ষণকেন্দ্রে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব সামাজিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করা। এর মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা নিজেদের এলাকার মানুষের প্রয়োজন সম্পর্কে জানবে, দায়িত্বশীলভাবে কাজ করতে শিখবে এবং স্থানীয় উন্নয়নে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা অর্জন করবে।

RYLI-এর পাইলট কার্যক্রম ২০২৬-২০২৯ মেয়াদে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এ পর্যায়ে উদ্যোগের কার্যকারিতা, সীমাবদ্ধতা, শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করা গুরুত্বপূর্ণ। এসব অভিজ্ঞতা ভবিষ্যৎ কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করার পাশাপাশি যুব নেতৃত্ব বিকাশ বিষয়ে জ্ঞান তৈরিতেও অবদান রাখতে পারে।

সেন্টার ফর ইয়ুথ লিডারশিপ ডেভেলপমেন্ট: যুব নেতৃত্ব বিকাশের প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানকেন্দ্র

যুব নেতৃত্ব বিকাশকে দীর্ঘ মেয়াদে এগিয়ে নিতে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পাশাপাশি গবেষণা, প্রশিক্ষণ, উদ্ভাবন ও নীতিগত আলোচনার সমন্বিত কাঠামো প্রয়োজন। এ বিবেচনা থেকেই বার্ড সেন্টার ফর ইয়ুথ লিডারশিপ ডেভেলপমেন্ট (CYLD) প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রস্তাবিত এ কেন্দ্রকে যুব নেতৃত্ব বিকাশের একটি জ্ঞানভিত্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।

CYLD-এর সম্ভাব্য কার্যক্রমের মধ্যে থাকবে যুব নেতৃত্ব বিষয়ে গবেষণা, নেতৃত্ব বিকাশের পাঠ্যক্রম ও প্রশিক্ষণ মডেল তৈরি, উদ্ভাবনী উদ্যোগের পরীক্ষণ, নীতিগত সংলাপ আয়োজন এবং দেশি-বিদেশি গবেষণা ও উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তোলা।

এর মূল লক্ষ্য হবে বিভিন্ন বয়স, সামাজিক প্রেক্ষাপট ও জনগোষ্ঠীর তরুণদের নেতৃত্ব বিকাশের প্রয়োজন অনুধাবন করা এবং প্রমাণভিত্তিক কার্যক্রমের মাধ্যমে তাঁদের সক্ষমতা বাড়ানোর পথ অনুসন্ধান করা। এ ক্ষেত্রে বিদ্যালয়পড়ুয়া ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, গ্রামীণ তরুণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন কার্যক্রমে যুক্ত যুবকদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশিক্ষণ ও কর্মসূচি তৈরি করা যেতে পারে।

একটি কার্যকর যুব নেতৃত্ব বিকাশকেন্দ্রের কাজ শুধু প্রশিক্ষণ আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। কোন পদ্ধতিতে নেতৃত্বের সক্ষমতা বাড়ে, কোন পরিস্থিতিতে তরুণেরা সামাজিক পরিবর্তনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন এবং কীভাবে তাঁদের অংশগ্রহণ টেকসই করা যায়, এসব বিষয়েও জ্ঞান তৈরি করা প্রয়োজন। CYLD–এ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রশিক্ষণ মডেল উন্নয়ন, গবেষণাপত্র ও নীতিপত্র প্রস্তুত, প্রশিক্ষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জ্ঞান বিনিময়ের উদ্যোগ নিতে পারে।

ভবিষ্যতে RYLI-এর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে যুব নেতৃত্ব বিকাশের আরও উন্নত পাঠ্যক্রম ও কর্মসূচি তৈরির সুযোগ রয়েছে। দুটি উদ্যোগকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া গেলে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হবে।

পাইলট প্রকল্পের ফলাফল ইতিবাচক হলে এবং প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিশ্চিত করা গেলে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য এলাকায় উদ্যোগটি সম্প্রসারণের সম্ভাবনা বিবেচনা করা যেতে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে CYLD গবেষক, প্রশিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সংস্থা ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে জ্ঞান বিনিময়ের একটি কার্যকর পরিসর তৈরিতেও ভূমিকা রাখতে পারে।

গ্রামের তরুণদের সম্ভাবনাকে দায়িত্বশীল নেতৃত্বে রূপান্তরিত করা এবং সেই নেতৃত্বকে গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও স্থানীয় উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করাই RYLI ও CYLD-এর সমন্বিত ভাবনার মূল তাৎপর্য।

  • লেখক: সহকারী পরিচালক, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড) ও প্রকল্প পরিচালক, রুরাল ইয়ুথ লিডারশিপ ইনিশিয়েটিভ (RYLI), [email protected]

Read full story at source