ঈদের ছুটিতে সন্তানদের জন্য অভিভাবকদের করণীয়
· Prothom Alo
শিশুদের গ্রামে কেন নেওয়া প্রয়োজন, কেন শিশুদের গ্রামীণ জীবন সম্পর্কে জানানো প্রয়োজন—এসব নিয়ে কথা বলতে একটি ঘটনা প্রায়ই উল্লেখ করে থাকি। ঘটনাটি ২০০৪ সালের দিকের। আমি তখন ঢাকার মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়াতাম।
অষ্টম শ্রেণির ফার্স্ট ছিল একটি ছেলে। ওর মেধার তারিফ করতে শিক্ষকেরা কেউ কেউ এমনও বলেছেন, সারা দেশে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়াদের মধ্যে ওই শিক্ষার্থী সেরা হতে পারে। ওর সঙ্গে আমার মাঝেমধ্যে নানা বিষয় নিয়ে কথা হতো। একবার ঈদের আগে ওকে জিজ্ঞেস করি ঈদ কোথায় করবে? সে জানাল ঈদে ঢাকায় থাকবে। গ্রাম সম্পর্কে আলোচনা করে দেখলাম ওর গ্রাম সম্পর্কে ধারণা খুব কম।
Visit xsportfeed.quest for more information.
জানলাম, ও মাঝেমধ্যে বাড়ি গেলেও ওর মা–বাবা গ্রামের শিশুদের সঙ্গে তেমন মিশতে দিতেন না। ওকে জিজ্ঞেস করলাম সে তুলসীগাছ দেখেছে কি না। তার সোজা উত্তর—দেখেছে, সিনেমায়। ওকে যখন জিজ্ঞেস করলাম আলু গাছের ডালে হয় নাকি মাটির নিচে হয়? ও জানাল, যেহেতু আলু দেখতে সবুজ নয়, তাই সেটি মাটির নিচে হওয়ার কথা। মরিচের গাছ দেখেছে কি না এ প্রশ্নের উত্তর হলো, দেখেছে। সে হাত দিয়ে যে রকম গাছ দেখাল, তা বড় আমগাছের সমান। বুঝলাম, সে মরিচগাছ দেখেনি।
আমাদের যে শিক্ষার্থীকে দেশের সবচেয়ে মেধাবী মনে করা হচ্ছিল সে তুলসীগাছ দেখে সিনেমায়, আলুর রং দেখে ডালে না মাটির নিচে হয় বুঝতে হয় সায়েন্স দিয়ে এবং মরিচের গাছ চেনে না। কৃষিনির্ভর এ দেশের জন্য শিক্ষার্থীর এই সামান্য বিষয় না জানা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটি। এই ত্রুটির সঙ্গে যোগ হয়েছে অভিভাবকদের সংকীর্ণ চিন্তা।
আমাদের সন্তানেরা গ্রামকে সমৃদ্ধ জেনে বেড়ে উঠুক। তাদের শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিতে গ্রাম থাকুক উজ্জ্বলতর রূপ নিয়ে। দেশ-বিদেশের যেখানে কর্মসূত্রে থিতু হোক না কেন, তার বোধের মধ্যে গ্রাম থাকুক সদা জাগরূক।
শিক্ষাদীক্ষায় আমাদের দেশের শহুরে অনেক শিশু বেড়ে উঠছে; কিন্তু নিজ দেশের গ্রামীণ জীবন সম্পর্কে তারা ভালোভাবে জানে না। একেবারে কেউ জানে না বলা ঠিক হবে না। জানলেও সংখ্যাটা নগণ্য। শহরে যারা বেড়ে উঠছে, তাদের অনেকেই গ্রামে গেলেও গ্রামের সঙ্গে তাদের প্রাণের যোগ থাকে না। ফলে বাবা-মায়েদের সঙ্গে গ্রামে গিয়ে তারা দিন হিসাব করে, কবে ফিরবে শহরে। হওয়ার কথা ছিল সন্তানেরা ছুটির অপেক্ষা করবে কবে গ্রামে যাওয়া যায় তার জন্য। তা না হয়ে উল্টো হয়েছে। অথচ গ্রাম বিচিত্র সৌন্দর্যে ভরপুর। সীমাহীন শেখার অনন্য ক্ষেত্র একচিলতে গ্রাম। গ্রামে সবটাই যেন শহরের বাচ্চাদের জন্য জীবনমুখী বাস্তব শিক্ষালয়।
শীতকালীন, গ্রীষ্মকালীন ছুটি কিংবা বার্ষিক পরীক্ষা শেষে যে ছুটি পাওয়া যায়, সেই ছুটির সঙ্গে বাবা-মায়েরা ছুটি পান না। ফলে এই সময়ে ছুটি থাকলেও তারা বাড়িতে যেতে পারে না। মূলত শিশু-কিশোরদের ছুটি আর মা–বাবার ছুটি একসঙ্গে মেলে দুই ঈদে।
প্রতিবছর দুই ঈদে আমাদের যে শিশুরা শহর থেকে গ্রামে যায়, গ্রামের সঙ্গে তাদের বন্ধুত্ব গড়ে তোলা খুব জরুরি। গ্রামের সঙ্গে বন্ধুত্ব মানে গ্রামের মানুষ ও প্রকৃতির সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা। গ্রামের মানুষ মানে কেবল নিজ পরিবারের সদস্য নয়; প্রতিবেশী, নিকট-দূরের আত্মীয়, যারা গ্রামে বাস করে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করানো। গ্রামের সাধারণ মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া।
এ বছর যে সময়ে ঈদুল ফিতরের ছুটি, সে সময়ে গ্রামে অনেক স্থানে গ্রাম্য মেলা বসবে। এসব মেলায় সন্তানদের নিয়ে যেতে পারেন মা–বাবা। মার্চ মাস পুকুরে-নদীতে পানি খুব কম থাকে। এই কম পানিতে বাচ্চাদের ঈদের ছুটিতে সাঁতার শেখানো অত্যন্ত জরুরি। গ্রামের শিশুরা সারা দিন পানিতে খেলতে খেলতে সাঁতার শেখে। শহরের বাচ্চাদের সেই সুযোগ নেই। ঈদের ছুটি বাচ্চাদের সাঁতার শেখানোর অনন্য সময়।
মার্চ মাসে গাছ রোপণ করা সম্ভব। ঈদের ছুটিতে বাচ্চাদের গ্রামে নিজেদের বাড়িতে, পাশের বাড়িতে, আত্মীয়ের বাড়িতে কিংবা সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে নিজ হাতে গাছ লাগাতে উদ্বুদ্ধ করুন। যে কদিন বাড়িতে থাকবে, পারলে নিয়মিত এসব গাছে পানি দেবে। মাত্র কয়েক দিন পানি দিলেই চলবে। বর্ষা এলে আর পানি দিতে হবে না। গাছগুলো বর্ষায় বেড়ে উঠবে। গ্রামে নিজ হাতে রোপণ করা কয়েকটি গাছ বড় হলে সেই গাছকে কেন্দ্র করে গ্রামের সঙ্গে একটি আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে। বৃক্ষরোপণের প্রথামিক অভিজ্ঞতা এখানেই হোক।
বাচ্চাদের পাখি দেখান। আমাদের গ্রামগুলোয় অনেক ধরনের পাখি আছে। কোন পাখি কোথায় বাসা করে, এ ধারণাও দিন। আজকাল প্রযুক্তির সাহায্যে অনেক তথ্য জানা যায়। বাস্তবে পাখি দেখলে, সেই পাখি সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি হলে ইন্টারনেট থেকে জেনে নিতে পারবে।
বাড়ির পাশে কোনো লেখক-শিল্পী থাকলে তাঁর সঙ্গে পরিচয় করাতে পারেন। এলাকায় যেসব লোককাহিনি আছে, সেগুলো বাচ্চাদের শোনাতে পারেন। গ্রামে বাচ্চারা গেলে আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলা শেখান। আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে পারা লজ্জার নয়, আনন্দের। গুরুত্বপূর্ণ শব্দের আঞ্চলিক রূপ শেখান। আঞ্চলিক ভাষার প্রবাদ-প্রবচন-গীত থাকলে সেগুলো শেখান। আমাদের আঞ্চলিক ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের সন্তানেরা যদি এ ভাষার উত্তরাধিকার না হয়, তাহলে এ ভাষার মৃত্যু অনিবার্য। এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে, তা–ও জানান।
বাচ্চারা গ্রামে গেলে খালি পায়ে হাঁটার চর্চা থাকার প্রয়োজন আছে। তারা কাদাপানিতে নামুক। পারলে মাছ ধরুক। বড়শিতে হোক, জালে হোক আর হাত দিয়ে হোক। গ্রামীণ খেলায় অংশ নিক আমাদের শিশুরা। বাচ্চারা নিজ হাতে খেত থেকে সবজি তুলে আনুক। খড়ির চুলায় কীভাবে রান্না হয়, সেটিও দেখুক। গ্রামে এসে প্রাণশক্তি লাভ করুক। এখন নতুন পৃথিবী। গ্রামভাবনাকে পাশ কাটিয়ে এ প্রজন্মের অনেকে বেড়ে উঠছে। এটি হতে পারে না, হতে দেওয়া যায় না। গ্রামবিষয়ক পাঠ গ্রহণ আমাদের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে হবে না, এর জন্য পরিবারকে দায়দায়িত্ব নিতে হবে। তবেই সম্ভব হবে। এই পৃথিবীকে জয় করতে হলে কেবল শহুরে ভাবনা দিয়ে হবে না।
গ্রামে এখন ধান লাগানো আছে। কোথাও কোথাও লাগানো চলছে। ধান রোপণের পদ্ধতি জানা খুব প্রয়োজন। আমাদের প্রধান খাদ্য ভাত। ফলে ধানের বীজ থেকে শুরু করে ভাত হওয়া পর্যন্ত প্রক্রিয়াটি জানানো প্রয়োজন। তারা মাছ সম্পর্কে জানবে, শাকসবজি সম্পর্কে জানবে। গ্রাম সম্পর্কে সন্তানদের নেতিবাচক ধারণা দিলে সন্তানদের সঙ্গে আমাদের দূরত্ব বাড়তে থাকবে।
আমাদের দেশে গ্রামে শিক্ষার ভালো ব্যবস্থা নেই। তারপরও দেশে গ্রাম থেকে উঠে আসা মানুষেরা বড় বড় প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তি হয়ে আছেন। গ্রামের বাচ্চারা যত সহজে শহুরে জীবনে অভ্যস্ত হচ্ছে, গ্রামকে ততটা সহজে আপন করে নিতে পারছে কি আমাদের শহুরে সন্তানেরা?
স্বল্প ছুটিতে গ্রামে গিয়ে আমাদের সন্তানদের অভিভাবকেরাও ভীষণ ব্যস্ত থাকেন। তাঁদের অনেক কাজ থাকে, এ কথা অসত্য নয়। কিন্তু সন্তানদের কথা বিবেচনা করে উল্লিখিত কাজগুলো কীভাবে করা যায়, সেটি করতে হবে। যাঁদের গ্রামে বাড়ি নেই, সেসব অভিভাবকেরও দায়িত্ব আছে সন্তানদের গ্রামের সঙ্গে পরিচয় করানো।
আমাদের দেশের স্কুল-কলেজ পর্যায়ের শিক্ষা তাত্ত্বিক, অর্থাৎ থিওরিটিক্যাল। বাস্তবভিত্তিক বা প্র্যাকটিক্যাল শিক্ষা আমাদের হয় না। প্র্যাকটিক্যাল বলে যে অংশটুকু আছে মাধ্যমিক কিংবা উচ্চমাধ্যমিকে, সেই প্রাকটিক্যাল কার্যত শুভংকরের ফাঁকি। ফাঁকি দিয়ে নম্বর পাওয়ার এক ব্যবস্থাপনা। থিওরিতে অকৃতকার্য হয়েও প্রাকটিক্যালে পূর্ণ নম্বর পাওয়া যায়।
আমরা চাই আমাদের সন্তানেরা ঈদের ছুটির জন্য মুখিয়ে থাকুক। তারা গ্রামে থাকা সমবয়সীদের সঙ্গে ছুটি উদ্যাপনের নানা পরিকল্পনা করুক। গ্রামকে তারা চিনুক-জানুক-বুঝুক। আমাদের সন্তানেরা গ্রামকে সমৃদ্ধ জেনে বেড়ে উঠুক। তাদের শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিতে গ্রাম থাকুক উজ্জ্বলতর রূপ নিয়ে। দেশ-বিদেশের যেখানে কর্মসূত্রে থিতু হোক না কেন, তার বোধের মধ্যে গ্রাম থাকুক সদা জাগরূক।
● তুহিন ওয়াদুদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক
(মতামত লেখকের নিজস্ব)